kalerkantho


উনসত্তরের ২১ ফেব্রুয়ারি : খুলনায় হাদিসসহ কমপক্ষে ৫ জন শহীদ হন

গৌরাঙ্গ নন্দী   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২১:১০



উনসত্তরের ২১ ফেব্রুয়ারি : খুলনায় হাদিসসহ কমপক্ষে ৫ জন শহীদ হন

ফাগুনে আগুন আনে। ফাগুনে আগুন জ্বলে।

এই ফাগুনের পলাশ রাঙা লালের আভা ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির জাতীয় জীবনে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নানা ঘটনাই এই ফাগুনে সৃষ্টি। ভাষার লড়াই থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধকালের সূচনা ও পুষ্ট এই ফাগুনেই।  
মূলত: ২১ ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগের পথ ধরেই বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা পুষ্ট হয়। শুরু হয় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। এই লড়াইয়ে উনসত্তর সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। ১৯৬৯এর ২০ জানুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদ শহীদী মৃত্যুবরণ করেন। যা সারাদেশেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। খুলনাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ওই সময় বাগেরহাট ছিল খুলনা জেলার মহকুমা। সেখানেও ছাত্র আন্দোলন তীব্রতর রূপ নেয়। যার রেশ ধরে উনসত্তরের ২১ ফেব্রুয়ারি খুলনায় অনন্য ইতিহাস তৈরি হয়।  
তখন খুলনার এডিসি (জেনারেল) ছিলেন পাঞ্জাবি সিএসপি কর্মকর্তা আফজাল কাউত। তিনি খুলনা পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করতেন। থাকতেন হাজী মুহসীন রোডের পৌরসভা চেয়ারম্যানের জন্য নির্দিষ্ট বাড়িটিতে। তিনি ১৯৬৯এর ১ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট গিয়েছিলেন প্রশাসনিক কাজে। সেখানে ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেননি। গুলি করার হুকুম দেন। এতে কয়েকজন আহত হন। ঘটনাটি খুলনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আন্দোলনকারী ছাত্রদের কাছে তিনি অবাঞ্ছিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হন।  
বাগেরহাট শহরের সেদিনের পরিস্থিতি বর্ণনা করে ওই সময়ের ছাত্রলীগ নেতা, প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মোড়ল আব্দুস সালাম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ছাত্র নেতৃবৃন্দ বসে সিদ্ধান্ত নেয় ১ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট শহরে হরতাল ও স্কুল-কলেজে ধর্মঘট পালিত হবে; মিছিল বেরুবে সকাল দশটায়। প্রশাসন সেই কর্মসূচী প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। আগে থেকেই ঠিক হয় পিসি কলেজ থেকে মিছিল বেরুবে। এবং মিছিলটি সারা শহর প্রদক্ষিণ করবে। আগের রাতে শহরে কারফিউ ঘোষণা করা হয়।  
এডিসি কাউত খুলনা জেলা শহর থেকে বাগেরহাট মহকুমা শহরে কর্মসূচী পন্ড করতে সশরীরে উপস্থিত হন। সারা শহরে থমথমে অবস্থা। ব্যাপক উত্তেজনা। বেলা ১১টায় মিছিল বের হয়। মিছিলটি কলেজ ছাড়িয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের পূব পাশের ছোট্ট ব্রিজটি পার হতেই পুলিশের বাধা। শুরু হয় লাঠিপেটা, টিয়ার গ্যাসের সেল নিক্ষেপ, গুলিবর্ষণ। একদিকে সশস্ত্র পুলিশ-মিলিটারি, অন্যদিকে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা। প্রায় ঘন্টাখানেক উভয়পক্ষে সংঘর্ষ চলে। আহত হয় ছাত্রলীগ নেতা জাফর, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা গিয়াস সহ অনেকে। ছাত্রনেতা সালামসহ ৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
এই ঘটনায় সমগ্র খুলনা জেলায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ছাত্র-জনতা ছিল খুবই ক্ষুব্ধ। ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস পালনের জন্যে খুলনায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়। খুলনায় স্থায়ী কোন শহীদ মিনার ছিল না। পৌর পার্কে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতি বেদীতে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিবেদন করা হতো। ২১ ফেব্রুয়ারি দিনের শুরুতে শহরের নানা প্রান্ত থেকে মিছিল আসতে থাকে। সকাল ৯টার দিকে শিপইয়ার্ড থেকে শ্রমিকদের একটি মিছিল আসে।  
মিছিলটি রূপসা ফেরিঘাট থেকে খান জাহান আলী রোড হয়ে টুটপাড়া কবরখানার কাছ থেকে হাজি মুহসীন রোডে প্রবেশ করে। মিছিলটি কাউতের বাসার সামনে এসে ওই বাড়ির নামফলক তুলে ফেলার চেষ্টা করে। এতে ওই বাড়ির পাহারাদার পুলিশ সদস্যরা বাধা দেয় এবং মিছিলকারীদের ওপর গুলি ছোঁড়ে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ক্ষুব্ধ মিছিলকারীরা তখন কাউতের বাড়ি হামলা করে ভাঙচুর করে ও আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে এই ঘটনা গোটা খুলনায় ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে ক্ষুব্ধতা ছড়ায়। সারা খুলনা ভয়ানক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।  
ওই দিন খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে এক সভা চলছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দীকী। শ্রমিকদের কানে খুলনায় মিছিলে গুলির খবর পৌঁছালে তারাও ক্ষুব্ধ হন। সভা শেষ করে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা নূরে আলম সিদ্দিকী ও ইউনুস আলী ইনুর নেতৃত্বে একটি বিশাল মিছিল নিয়ে খুলনায় আসেন। মিছিলে কমপক্ষে ত্রিশ হাজার মানুষ যোগ দেন। বেলা দেড়টা নাগাদ মিছিলকারীরা খুলনা শহরে এসে পৌঁছান।  
খুলনা শহর সেদিন মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। শহীদ হাদিস পার্কে প্রাথমিকভাবে মানুষ জমায়েত হয়েছিল, কিন্তু মানুষের ঢল নামায় ওই জনশ্রোত খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে নামাজে জানাযা শেষে স্বত:স্ফূর্ত এক প্রতিবাদ সমাবেশে রূপ নেয়। সমাবেশ থেকে আবারও মিছিল বেরোয়। সার্কিট হাউসের কোণায় খান এ সবুরের বাড়ির সামনে তখন আবারও গোলাগুলি হয়। ক্ষুব্ধ জনতা সবুর খানের বাড়িতে আগুণ ধরিয়ে দেয়। এখানেও হতাহতের ঘটনা ঘটে। ওই দিন দুই দফা গোলাগুলিতে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। কারও মতে পাঁচ জন, কেউ বলেছেন সাতজন, আবার একটি পত্রিকায় বলা হয় ৮ জন। তবে মৃতের সংখ্যা পাঁচজন নিশ্চিত করা গেলেও চার জনের নাম-ঠিকানা, পরিচয় সুনির্দিষ্ট করে পাওয়া যায়।  
২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকা এ সংক্রান্ত খবরটি প্রথম পাতার মাঝ বরাবর পাঁচ কলামব্যাপী ছাপে। শিরোণাম ছিল, খুলনায় শহীদ দিবসের মিছিলে গুলিবর্ষণ, সান্ধ্য আইন জারি : জনতার হাতে পুলিশের মৃত্যু, ৮ জন নিহত ৫০ ব্যক্তি আহত। খবরে বলা হয়, খুলনায় অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার আফজাল কাউতের বাড়ির সামনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। শহীদ দিবসের এক বিরাট শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা জনাব কাউতের বাড়ির সামনের ইংরেজি নামফলক নামিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। এতে ওই বাড়ির লোকজন বাধা দেয় এবং বাক-বিতন্ডার সৃষ্টি হয়। এ সময়ে বাড়ির মধ্যে থেকে শোভাযাত্রাকারীদের ওপর বিষ্ফোরক নিক্ষেপ করা হয়। এতে মিছিলকারীরা ওই বাড়ি আক্রমণ করে। তখন প্রহরারত পুলিশ গুলি করলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।  
ইংরেজি দৈনিক অবজারভারেও এই খবরটি বিশদভাবে প্রকাশিত হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় শহীদ দিবসের খবরের পর খুলনার খবরটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। খবরের শিরোণাম ছিল ৮ শরষষবফ রহ কযঁষহধ, ঈঁৎভবি রসঢ়ড়ংবফ: অৎসু পধষষবফ ড়ঁঃ. প্রকাশিত খবরের বাংলা করলে দাঁড়ায়: ৮ ব্যক্তি নিহত ও অন্যান্য ২৭ জন বুলেটবিদ্ধ, পুলিশ আজ এখানে জনতার জঙ্গী মিছিলের ওপর তিন জায়গায় গুলিবর্ষণ করে। নিহত চার জনের লাশ খুলনা সদর হাসপাতালে আনা হয়। বাকিদের লাশ জনতা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।  
ওইদিন আটজনের শহিদী মুত্যুর কথা বলা হলেও ৫ জনের নাম-পরিচয় নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়। এই পাঁচজন হচ্ছেন : লোকনাথ, জহুরুল হক, প্রদীপ, হাদিসুর রহমান এবং পুলিশের কনস্টেবল জমিরুদ্দিন। বুলেটের আঘাতে আহতরা হচ্ছেন : আব্দুল খালেক, নজরুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, ইউনুস আলী, কাজী লতিফুদ্দিন, ইউসুফ আলী, লুৎফর রহমান, প্রভুদাস, বাহারুল আলম, এস এম বজলুর রহমান, শওকত হোসেন, মলয় কুমার ঘোষ, খলিলুর রহমান, সেকেন্দার আলী, রাজ্জাক আলী হাওলাদার, মাহবুবুর রহমান, খাদেম আলী, আব্দুল মজিদ, খবির ব্যপারি, ইসমাইল ও সাঈদ আলী।  
ওইদিন খুলনা শহরের দুটো জায়গায় পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। একটি অতিরিক্ত জেলা কমিশনার আফজাল কাউতের বাড়িতে আক্রমণ করলে এবং অন্যটি স্থানীয় এমএলএ খান এ সবুরের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে।  
প্রথম গুলিবর্ষণের ঘটনাটি ঘটে ২১ ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে দশটায়। তখন একটি বিশাল মিছিল এডিসি জনাব কাউতের বাড়ির সামনের দিক দিয়ে যাচ্ছিল। তখন জনতা ওই বাড়িতে আক্রমণ করে। তখন বাড়িতে পাহারারত ৬ জন রক্ষী জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে দুই জন নিহত এবং ১৩ জন আহত হয়। একজন স্কুল ছাত্রও গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিতে নিহত দুই জন হচ্ছেন খুলনা টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক আলতাফ এবং খুলনার একটি লন্ড্রির কর্মী হাদিসুর রহমান সংক্ষেপে হাদিস। আহতদের মধ্যে সেন্ট যোশেফস স্কুলের ছাত্র প্রভুদাসও ছিল।  
গুলিবর্ষণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ মিছিলকারীরা কাউতের বাড়ির রক্ষীদের আক্রমণ করে। এতে একজন রক্ষী মারা যায়। বাকী পাঁচজন রক্ষী গুরুতর আহত হয়। জনতা ওই বাড়িটিতে তখন আগুন ধরিয়ে দেয়। এই খবর শহরে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বেলা একটার দিকে খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা খুলনা শহরে সমবেত হয়। পৌর পার্কে জমায়েতের স্থান সংকুলান না হওয়ায় লাশ নিয়ে জনতা সার্কিট হাউস ময়দানের দিকে এগুতে থাকে। তখন সার্কিট হাউস ময়দানে ঢোকার পথে এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী খান এ সবুরের বাড়ির সামনে পুলিশের পাহারা ছিল। নেতৃবৃন্দ পুলিশকে সরে যেতে আহ্বান জানায়। পুলিশ সরে খুলনা ক্লাবের দিকে অবস্থান নেয়।  
নামাজে জানাযা শেষে বিকেল তিনটার দিকে মিছিলকারীরা ফিরে যাওয়ার সময় কতিপয় ব্যক্তি খান এ সবুরের বাড়ি আক্রমণ করে। ইপিআর বাহিনীর সদস্যরা তখন মিছিলকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে। এতে একজন নিহত হয়। আহত হন অনেকেই। এদের মধ্যে সাতজনকে হাপাতালে ভর্তি করা হয়।
এছাড়াও ওইদিন বিকেল চারটার দিকে দৌলতপুরে পুলিশের সাথে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ হয়। ক্ষুব্ধ জনতা দৌলতপুর তহশিল অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং খালিশপুরে প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী এস এম আমজাদ হোসেনের বাড়িটিও পুড়িয়ে দেয়।  
ইতিহাস গবেষক মেসবাহ কামাল তাঁর ‘আসাদ ও উনসত্তরের গণ-অভূত্থান’ গ্রন্থে ওই দিনের ঘটনায় সাত জন নিহতের কথা বলেছেন। এঁরা হচ্ছেন: ছাত্র মাহাতাব আলী ও আব্দুস সাত্তার, শ্রমিক ইসরাফিল বন্দ, আলতাফ, হাদিসুর রহমান, নাসির আলী এবং লোকনাথ।  
ওই দিনের ঘটনায় খবরের কাগজের প্রতিবেদনে ৮ জন শহীদের কথা বলা হলেও নাম বলা হয় ৫ জনের। আর মেসবাহ কামালের লেখায় সাত জনের নাম পাওয়া গেলেও নামের ভিন্নতা রয়েছে। অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ আব্দুল হালিম তাঁর ‘খূলনায় উনসত্তরের গণআন্দোলন’ শীর্ষক নিবন্ধে দাবি করেছেন, তিনি অনেক চেষ্টা করেও একজন পুলিশসহ চারজনের বেশী মৃতের সংখ্যা পাননি। এই চার জন মৃতের মধ্যে হাজি মুহসীন রোডে একজন পুলিশ, হাদিসুর রহমান ও প্রদীপ এবং খান এ সবুরের বাড়ির সামনে আলতাফ মারা যান। মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস আলী ইনু দাবি করেছেন, শ্রমিক নেতা ইসরাফিল বন্দও ওইদিন মারা যান।
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি! 
 

- সাংবাদিক


মন্তব্য