kalerkantho


বাংলাদেশের আদালত প্রাঙ্গণ কতটা নারীবান্ধব?

প্রমা ইশরাত   

২১ অক্টোবর, ২০১৭ ১৮:০৬



বাংলাদেশের আদালত প্রাঙ্গণ কতটা নারীবান্ধব?

প্রতীকী ছবি

আমি বরাবর আমার বাবার মতো হতে চেয়েছিলাম। আমার বাবা একজন আইনজীবী, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি আইন নিয়ে পড়ব ও আইনজীবী হব।

ছোটবেলায় আমার বাবা সাদা শার্ট, প্যান্টের ওপর কালো কোট, কালো টাই পরে কোর্টে যেতেন। সকালে তার কোর্টে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়া দেখতে আমার ভালো লাগতো। আবার বিকালে তিনি যখন বাড়ি ফিরে আসতেন, সেই দৃশ্য দেখতে আমার ভালো লাগতো। ঘরে ঢুকে তিনি তার কালো কোটটি গা থেকে খুলে আলনায় ঝুলিয়ে রাখতেন। সেই কালো কোট থেকে তখন ঘামের গন্ধ বের হতো। আমার সেই ঘামের গন্ধ ভালো লাগত।

বাবার প্রতি আবেগ আর ভালোবাসা থেকেই এবং সেই সঙ্গে তার মানুষের জন্য, মানবতার জন্য কাজ করা দেখেই আমি প্রেরণা পেয়েছিলাম আইনজীবী হওয়ার। কিন্তু খুব অবাক হয়েছিলাম যখন আমার বাবা এক সময় চাননি আমি আইন পেশায় আসি! বিশেষ করে আদালতে গিয়ে প্র্যাকটিস করি। এর পেছনের একটাই কারণ, আর তা হচ্ছে কাজ করার জন্য আদালত প্রাঙ্গণ নারী বান্ধব নয়।

এমনিতেই একজন তরুণ আইনজীবীকে অসম্ভব পরিশ্রম করে আদালতে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে হয়। যেহেতু আমাদের দেশের আইন ব্যবস্থা ব্রিটিশ সময়কার, এবং ব্রিটিশদের আদব কায়দায় আইন ও আদালত চলছে। সেই জন্য গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কালো কোট এবং এর উপর কালো সিল্কের গাউন চাপাতে হয়।

আইন পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে পারা বেশ সময় সাপেক্ষ। আইনে পড়াশোনা করে স্নাতক হলেই একজন আইনজীবী হতে পারে না। তাকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সার্টিফিকেট নিতে হবে। আর সেই সার্টিফিকেট নিতে হলে বার কাউন্সিল আয়োজিত সনদের পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এরপর ফিস দিয়ে একটি বারের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তবেই আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনা করা যাবে। কিন্তু একজন সদ্য পাস করা আইনজীবীর জন্য শুরুতেই মক্কেল পেয়ে মামলা পরিচালনা শুরু করে দেয়া এই দেশের প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই সহজ না।

এ ছাড়া আদালতে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শিক্ষানবিশ হিসেবে সময় পার না করলে কোনো কাজ শেখা হয়ে ওঠে না, কেননা আইন পেশায় মামলা পরিচালনা এবং কোর্ট মুভমেন্ট সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই বাস্তবতা সম্পর্কিত। শুধু বই থেকে পড়ে আইন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, কিন্তু আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে হলে আদালতে থেকেই তা শিখে নিতে হবে। আর এই শেখার ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয় একজন সিনিয়র আইনজীবীর উপর। আইন পেশায় সিনিয়র আইনজীবী একজন মেন্টরের ভূমিকা পালন করেন।

আইন পেশা নারী পুরুষ সবার জন্যই একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা, কারণ এই পেশার মূল ক্ষেত্র আদালত এবং মূল পুঁজি মক্কেলের মামলা। এখন এই চ্যালেঞ্জিং একটি পেশায় বেশি প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় নারীদের ক্ষেত্রে। এই সমস্যা বহুমুখী। যেমন,

- নারী অবান্ধব, ঠাসাঠাসি পূর্ণ কোর্ট পরিবেশ।

-নারীদের জন্য আলাদা কমন রুম, স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন সুবিধা, খাবার পানির সুবিধা না থাকা।

-আদালত প্রাঙ্গণে কক্ষ বরাদ্দকরণের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়ে পুরুষ পৃষ্ঠপোষকতা কাজ করে ।

-নিরাপত্তা, শারীরিক নিরাপত্তা এবং অপর্যাপ্ত  পরিবহন সুবিধা ।

-শারীরিক বা যৌন হয়রানি বিশেষ করে জুনিয়র আইনজীবীদের ক্ষেত্রে।

-হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে অনিচ্ছা, ভয়, এবং সুস্পষ্টতার অভাব।

-অভিযোগ করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে পেশাদার কর্মকাণ্ডে, এবং সহকর্মীদের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রভাবের ভয়।

-২০০৯ সালে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি বাধ্যতামূলক রাখার ব্যাপারে হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় ঘোষণা হওয়ার পরও, কোর্ট রুমে এবং চেম্বারে নারী আইনজীবীদের সঙ্গে হওয়া হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার কোনো ফোরাম বা স্থানের অস্তিত্ব না থাকা।

-অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার ভয়ে কাজ থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্য সামাজিক ও পারিবারিক চাপ।

-পুরুষদের তুলনায় নারী আইনজীবীদের কম ফিস প্রদান এবং লাভজনক কোনো মামলায় বা বিষয়ে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে নারী আইনজীবীদের বঞ্চিত রাখা।

-ক্লায়েন্টদের অভিব্যক্তিতে নারী আইনজীবীর তুলনায় পুরুষ আইনজীবীর ওপর বেশি আস্থা প্রকাশ পায়।

-আদালতের ক্লার্কদের তরুণ এবং নারী আইনজীবীদের প্রতি বিরূপ আচরণ।

আইন নিয়ে যারা পড়েছেন, তাদের আইন সম্পর্কিত অনেক জায়গায়ই কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন কম্পানিতে লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হতে পারেন কেউ, কেউ এনজিও কিংবা মানবাধিকার সংগঠনে কাজ করতে পারেন, কেউ জুডিশিয়াল সার্ভিসে পরীক্ষা দেয়ার মাধ্যমে বিচারক হতে পারেন, আইন মন্ত্রণালয়েও কাজের ক্ষেত্র রয়েছে। এই সকল ক্ষেত্র ‘আদালত অভিজ্ঞতা’র তুলনায় তূলনামূলক কম ভোগান্তিমূলক।

নারীরা সকল পেশায়, সকল ক্ষেত্রেই কাজ করতে পারে, যদি সেই পরিবেশ নারীবান্ধব হয়। আমাদের দেশে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়, নারীকে নানান বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে তবেই এগিয়ে যেতে হয়। বেশিরভাগ পুরুষ যেমন পুরুষতান্ত্রিক, তেমনি বেশিরভাগ নারীও পুরুষতান্ত্রিক। আর তাই একজন পুরুষ যখন বলে এই কাজ নারী তোমার জন্য না, তখন নারী সেই কথাটা বিশ্বাস করে বসে। এবং এই কাজ যে নারীর না সেটা প্রমাণ করার জন্য নানানভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে দেয় আমাদের সমাজ, সমাজের মানুষেরা।

পরিশ্রম করতে হবে সবাইকেই। নারী পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই সমাজ এগিয়ে যায়। কিন্তু সেই জন্য সকল কর্মক্ষেত্রে চাই নারীবান্ধব পরিবেশ। তাই আদালত প্রাঙ্গণ হোক নারীবান্ধব, জেন্ডার বৈষম্যহীন। নারী পুরুষের জেন্ডার সমতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সবার প্রথমে সমতার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাক আদালত প্রাঙ্গণে।

-লেখক তরুণ আইনজীবি


মন্তব্য