kalerkantho


মুহূর্তেই মেরাজের শরীরের ওপর তুলে দিল চাকা, ডান উরুর হাড় চুরমার হয়ে গেল

আহ্‌সান কবীর   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৭:০১



মুহূর্তেই মেরাজের শরীরের ওপর তুলে দিল চাকা, ডান উরুর হাড় চুরমার হয়ে গেল

ক্ষমা চাইছি এমন ছবি পোস্ট করার জন্য! কিন্তু ...

এমন ছবি শেয়ার করতে চাইনি। এজন্য ক্ষমা চাইছি। ঘটনা গত ৫ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকের। মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন ছবির এই যুবক যার নাম মেরাজ (এলাকার ছোটভাই)। আমি ছিলাম তার পেছনের সিটে। সাইনবোর্ড থেকে যাত্রাবাড়ী আসার পথে ফ্লাইওভারে ওঠার আগে দিয়ে তামিরুল মিল্লাত মহিলা মাদ্রাসা এলাকায় হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বামদিক থেকে একটি খালি ট্রাক আমাদের সামনে দিয়ে ডানে ইউটার্ন করতে যায়। মেরাজ গতি কমায় এবং বাধ্য হয়ে কিছুটা ডানে চাপে। এর ফলে ডানদিকে পেছনে থাকা প্রাইভেট কারটি আমাদের বাইকে আঘাত করে। তবে বাইক এবং গাড়ি দুটির চালকই সামলে নেয়। কিন্তু ট্রাক চালক থামলো না। ফের তার ধাক্কায় মোটরসাইকেল পড়ে যায় এবং আমরা দুজন ছিটকে পড়ি। আমি দুই হাঁটুতে আঘাত অনুভব করি। মেরাজও পায়ের গোড়ালির দিকে আঘাত পায়। লোকজন ছুটে আসতে থাকে আমাদের উদ্ধারে। ট্রাক পাশ দিয়ে চলে গেলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু ‘নির্বিশেষে খুনের লাইসেন্স পাওয়া’ ট্রাক ড্রাইভার হঠাৎ পুরো ডানে কেটে রোড ডিভাইডার ঘেঁসে আমাদের ওপর দিয়ে চলে যেতে চায়। আমরা দুজন কল্পনাও করতে পারিনি এমন কাণ্ড কোনো মানুষ (!) করতে পারে। 

ড্রাইভারের ও তার সঙ্গীদের পরিষ্কার বোঝার ও দেখার কথা আমরা চাকার তলে পড়ি নাই। কিন্তু ড্রাইভার অজ্ঞাত কারণে আমাদের দিকে চাপিয়ে গাড়ি টান দিল। একদম আমাদের পেছনে থাকা রিক্সা ও অন্যান্য গাড়ির যারা কাছে ছিলেন তারা হায় হায় করে উঠলেন। কিন্তু ড্রাইভারের কাঁধে তখন কার আশীর্বাদ কাজ করছিল কে জানে! সে আমাদের মারবেই! মুহূর্তেই মেরাজের শরীরের ওপর তুলে দিল সে চাকা- ওর ডান উরুর হাড় চুরমার হয়ে গেল। তবু এগিয়ে আসতে থাকলো চাকা। ওর বুকের পাশ চাপিয়ে মাথার ডান দিকে উঠে গেল। হেলমেট ভাঙ্গার পৈশাচিক শব্দ পেলাম। আমি তখনো মাটিতে একই সরল রেখায়, উপুড় হয়ে পড়ে আছি। ন্যানো সেকেন্ডে চাকার তলে পড়তে যাচ্ছি আমিও- পরিষ্কার। কোন এক অজানা অনুভূতি আমাকে যেন কিছুটা পাশে সড়িয়ে দিল। ট্রাকের চাকা আমার গায়ে হাওয়ার ঝটকা দিয়ে চলে গেল।

লোকজন এসে তুললো আমাকে- মেরাজ পড়ে আছে, সবাই ভাবছে ও আর নেই। এসময় দেখলাম ক্ষতবিক্ষত চোখের একটি পাতা একটু হিলছে। ওই অবস্থায় মোবাইল ফোনটা খুঁজে পেলাম দূরে পড়ে আছে, ট্রাকের চাকার নিচে এটাও যায়নি। তুলে ফোন করলাম বন্ধু 
Ali Azgar সহ দরকারি জায়গাগুলোতে। লোক মারফত খবর পেয়ে ছুটে এলেন Zikrul Ahsan ভাইও।

আমি ও উপস্থিত লোকজন ধরাধরি করে রাস্তার বামপাশে নিয়ে গেলাম মেরাজকে, স্কুটারে তুলে ছুটলাম ঢাকা মেডিকেল ইমার্জেন্সিতে।
আমারও চিকিৎসার কথা বলা হলো- কিন্তু আমার আঘাত মেরাজের তুলনায় কিছুই না। সেদিকে নজর না দিয়ে তার চিকিৎসায় মন দেই। খবর পেয়ে ছুটে আসেন আহতের স্বজনরা।

এসময় দেখা যায় ট্রাকের মালিকের ভাই পরিচয়ে দুজন উপস্থিত। তারা ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ‘মামলা ডিশমিশ’ করতে চায়। তারা কথা বলেছে হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জের সঙ্গে। কিন্তু ততক্ষণেই আমাদের খরচ হয়ে গেছে ওই পরিমাণ টাকা। মেরাজ বেঁচে (কায়মনোবাক্যে তাই প্রার্থণা করি) গেলে তার চিকিৎসায় কয়েক লাখ টাকা যাবে। তাদের বল্লাম, আমাদের কোনো অভিযোগ- প্রতিশোধ বাসনা নেই- শুধু ওর চিকিৎসার খরচটা দেন আপনারা। তার ভাই এই কথা বলতে ট্রাকওয়ালারা হেভি ভাব দেখিয়ে চলে গেল এবং অন্যদের জানিয়ে গেল এই টাকায় তারা থানা থেকে ট্রাক ছাড়িয়ে নিতে পারবে। তবে আমাদের বলে গেল পরদিন আসবে মিটমাট করতে।

... এ যাবত আসেনি। গতকাল যাত্রাবাড়ী থানা থেকে ফেন দেওয়া হয় মেরাজের ভাইয়ের নম্বরে। থানায় গিয়ে ট্রাকওয়ালা বসদের সঙ্গে বিষয়টির ফয়সালা করতে হবে। সন্ধ্যার পর আমাদের লোক থানায় গেলে দেখা যায় তাদের লোক আসছে না। পরে ফোনে তাজুল ইসলাম তাজু নামে নিজেকে পরিবহন নেতা দাবি করে একজন বললেন, ট্রাক স্ট্যান্ডে গিয়ে তাদের সঙ্গে ফয়সালা করতে। এ যেন মগের মুল্লুক!

থানায় উপস্থিত এসআই কামালও এর বিরোধিতা করলেন। আমরা কেন ওই বেপরোয়া খুনিদের আখরা ট্রাক স্ট্যান্ডে যাবো। মেরাজের ভাই ফেরত আসলেন। আজ ফের থানা থেকে ফোন দেওয়া হয়েছে- আগামীকাল গিয়ে ফয়সালা করতে। এবার তাদেরও তাড়া দেখা গেল। তারা চাচ্ছেন ট্রাকটা ছেড়ে দিতে তাড়াতাড়ি!

আহ্! ট্রাকসেবায় কতো সদিচ্ছা তাদের- অথচ তাদের হওয়া উচিৎ জনসেবক। হত্যাচেষ্টাকারী চালককে ধরে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করবে তারা। তা না... ওদিকে নিরপরাধ মেরাজ হাসপাতালে শুয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় ভুগছে, দিনরাত পাশে বসে তার স্ত্রী আর সন্তান অনিশ্চয়তায় আর আতঙ্কে। আর আমি তো করুণাময়ের বিশেষ মেহেরবাণিতে বেঁচে গেছি অলৌকিকভাবে- তবে মনোমস্তিষ্কে রয়ে গেছে সেই ভয়াল স্মৃতি।

এই কয়দিনে অনেক হ্যারেসমেন্টের শিকার হয়েও আমি ঢামেক হাসপাতালে বা কোথাও নিজের সাংবাদিক পরিচয় দেইনি, নিউজ হোক তাও চাইনি। দরকার মনে করিনি- দেখি আমরা আসলে কতোটা নিচে নেমেছি। তবে শুধু চেয়েছি মেরাজের চিকিৎসাটা যাতে চলে ঠিকমতো। আর এই দায়িত্বটা যাতে ট্রাকমালিক-চালক নেয়। হত্যাচেষ্টার বিচার কে চায়! এই কথা শোনার জন্য কেউ আছেন কী? সড়ক ও সেতু মন্ত্রী কী এমন অহেতুক দুর্ঘটনার সওদাগরদের বিরুদ্ধে কিছু করবেন? বা ক্ষমতাধর অন্য কেউ! 

(ছবিগুলো দুর্ঘটনার ছয় দিন পর তোলা)

- আহ্‌সান কবীরের ফেসবুক থেকে।


মন্তব্য