kalerkantho


জীবনের একমাত্র টিউশনি!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ২০:০৮



জীবনের একমাত্র টিউশনি!

জীবনে একবার মাত্র তিন মাসের জন্য টিউশনি করেছিলাম। তাও অন্যের টিউশনির প্রক্সি। আমার দুলা ভাইয়ের ভাই, অর্থ্যাৎ আমার বিয়াইয়ের ডিগ্রি পরীক্ষা ছিলো, তাই আমাকে তার ছাত্রীগুলোর পড়া লেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য তিন মাস পড়ানোর দায়িত্ব। আমি তখন এইচএসসি ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। দেখতে লাগে এইট নাইন। কিঞ্চিৎ লাজুক স্বভাবেরও ছিলাম। বিয়াইয়ের সম্মান রক্ষার্থে টিউশনিতে জয়েন করি।

শ্যামলীর বাবর রোডে ছিলো ছাত্রীদ্বয়ের বাসা। ঢাকার একটি নামকরা মিষ্টির দোকানের মালিকের দুই মেয়ে, একজন ক্লাশ ওয়ান, আরেকজন নার্সারি। বাচ্চার অভিভাবকের টাকার অভাব ছিলো না, তবে পরিবারের আত্মীয় স্বজন ছিলো ব্যবসাদার। বাসার মধ্যে আত্মীয় স্বজনের মেলা বসে থাকতো। ফলে পিচ্চিগুলোর পড়ালেখায় মন বসার কোনো চান্স ছিলো না।

প্রথমদিন যেদিন বেয়াই আমাকে ছাত্রীদের বাসায় পরিচয় করিয়ে দিয়ে আসে, তখন দেখি ছাত্রীদ্বয়ের মুখে মধুর হাসি, দেখে মনে হলো বেয়াইয়ের মতো কড়াপাকের টিচারের হাত থেকে একজন কমল হৃদয়ের টিচারের কাছে ওদের সমর্পন করা হচ্ছে দেখে ওরা বেশ খুশি। বেয়াই চলে যাওয়ার পরে আমি যখন পড়ানো শুরু করলাম, তখন ওদের ভুল ভাংলো, বিশেষত বাচ্চার মা এসে যখন এসে বললো, ওরা কিন্তু খুব দুষ্ট, একটু মাইরধোরের উপর রাইখেন। হালকা ঝাড়ি দিয়ে পড়ানো শুরু করার পর আমার সম্পর্কে ওদের ভুল ভাঙলো। বন্ধুরা সব ২০০ গজ দুরে জহুরী মহল্লাতে আড্ডা মারছে আর আমি ‘পাখি সব করে রব’ পড়াচ্ছি। আমার অন্ধকার মুখ দেখে ওদের মুখ শুকিয়ে গেলো।

দেখা গেল যে আমি কিছুদিনের মধ্যেই খুব সিরিয়াস টিচার হয়ে গেলাম। বাচ্চা দুইটা আমাকে বেশ সমীহ করা শুরু করলো, কিন্তু কিছু কিছু খালাম্মা গোছের আত্মীয় আমার প্রেস্টিজ পাংচার করে দিতো মাঝে মাঝে। একদিন এক মধ্য বয়সী মহিলা এসে বাচ্চার মাকে আমার সামনেই জিজ্ঞাসা করলো, এই ছুডু পোলাডা কে? আমার ছোট ছাত্রী তার মায়ের আগেই উত্তর দিলো, আমাদের ষাড়। ওই মহিলা হাসতে হাসতে বলে ওমা এতো ছুডু ছেলে কিছু পরাইতে পারেনি? বাচ্চার মা লজ্জা পেয়ে মহিলাকে ভিতরে নিয়ে গেলো আর ছাত্রীদয় ভয়ে ভয়ে আমার দিকে একবার তাকায় আর আরেকবার বেদনার্তো চোখে ওই মহিলার দিকে তাকায়। কারণ ততদিনে ওদের কাছে আমি একজন মহাজ্ঞ্যানী ও মহা কড়া শিক্ষকের ইমেজ তৈরি করে ফেলেছি।

বড়টা আমাকে স্যার বলতো, ছোটোটা বলতো ষাড়। আমি মনে মনে হাসতাম। রাজশাহীর কথা মনে হতো তখন। অপেক্ষা করতাম কবে বেয়াইয়ের পরীক্ষা শেষ হবে, আর আমিও এই মাসুম দুই বাচ্চার কাছে কঠিন মুখ করে বসে থাকার অভিনয় থেকে রক্ষা পাই। ওদের বকা বা ঝাড়ি মারার পরেই ওদের মুখের ভয় আর বেদনা দেখে খুব খারাপ লাগতো। কিন্ত দু’জনই ছিলো মহা ফাঁকিবাজ। যেদিন ই আমি একটু নরম গলায় কথা বলতাম, দেখতাম ছোটটা একটা গল্প বলা শুরু করতো, ‘ষার হইশে কি, কালকে আমরা শিষূ পার্কে গেসলাম’।

আমি যেহেতু সাব-কন্ট্রাক্টের টিচার আমার সাথে পরিবারের লোকজনের খাতির ছিলো না খুব একটা, কিন্তু বেয়াই হুরু ভাইয়ের সাথে ওদের ছিলো খুব খাতির। একদিন ছাত্রীদের বাসায় মিলাদের দাওয়াতে যাব না যাব না করেও গেছি। গিয়ে দেখি আমার ছোট ছাত্রী মুখ আলো করে হাসি হাসি মুখে আত্মীয় স্বজনদের কোলে কোলে খুব আনন্দে আছে। আমাকে দেখে মুখ অন্ধকার করে ফেললো। ড্রইংরুমে পড়ার টেবিল সরানো, আর আমিও পাঞ্জাবি পড়ে আছি দেখে আমাকে সাহস করে জিজ্ঞাসা করলো, ‘ষার আজকে পরাইবেন?” আমি বললাম, না, পড়াব না। মহা খুশিতে ‘ষার আজকে পরাইবেনা পরাইবেনা’ চিৎকার করতে করতে ভিতরে গিয়ে বড় বোনকে নিয়ে এসেছিলো বেচারী।

এক সময় তিন মাস শেষ হয়েছিলো। আমিও টিউশনির টাকা দিয়ে ঢাকা স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে বেশ সুন্দর একটা নানচাক্ক কিনে ব্রুসলির সাগরেদ হওয়ার জন্য কুংফু প্রাকটিস করতে লাগলাম।

এখনও মাঝে মাঝে পিচ্চিগুলোর কথা মনে হয় আর হাসি। একটু খারাপও লাগে, আমারও যে স্নেহমাখা হাসি মুখ আছে যেটা ওদের কখনও দেখানো হয়নি।

লেখক : কার্টুনিস্ট


মন্তব্য