kalerkantho


বাংলাদেশ আমার বাবা মায়ের দেশ

সম্পা পাল   

৩১ জানুয়ারি, ২০১৮ ২০:৫৮



বাংলাদেশ আমার বাবা মায়ের দেশ

আমি জন্মসুত্রে ভারতীয়, কর্মসূত্রেও ভারতীয়। কখনো বাংলাদেশে আসিনি। এ দেশকে ছুঁয়ে দেখিনি, এ দেশের গন্ধ নেইনি। এ দেশের মাটির রং কেমন তাও ঠিক জানি না। শুধু মানচিত্রেই দেখেছি। তবুও এদেশ আমাকে টানে, কোথাও একটা আত্মার টান অনুভব করি। কারণ এদেশ আমার বাবা মায়ের দেশ, আমার ঠাকুরদা ঠাম্মা , দাদু দিদুনের দেশ, তাদের পূর্বপুরুষেরও দেশ। সে অর্থে এ দেশ হয়তো আমারও। তবে আমার দেশ বললে হয়তো নাগরিকত্বে প্রশ্ন উঠবে।

পাবনা জেলার ঘুড়কা গ্রাম আমার বাবার জন্মস্থান। সেদিন এটা রীতিমতোই একটা গ্রাম। Electricity ছিল, তবে রাস্তায়। গ্রামের পূর্ব দিকে যমুনা নদী। ঠাকুরদা ছিলেন P.C Paul Primary School এর শিক্ষক। বাবার প্রাথমিক শিক্ষাও সেই স্কুলেই। ঠাকুরদার বাবা ঠাকুরদারা ছিলেন একপ্রকারের জমিদার। ইংরেজদের যাতায়াত ছিল তাদের বাড়িতে। তবে বিষয় সম্পত্তিতে ঠাকুরদার কোনো আসক্তি ছিল না। কারণ আমার ঠাম্মা খুব অল্প বয়সে মারা যান , বাবা কাকু , পিসি তখন ছোট। এরপর থেকেই ঠাকুরদা সবকিছু থেকে নিজেক দুরে সরিয়ে নেন।

ঘুড়কা গ্রামের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল এর শ্মশান ঘাট। বিরাট বড় এরিয়ার এই একটা শ্মশান ঘাট তাই অনেককেই জীবনের শেষ দিনে হলেও একবার এখানে আসতেই হতো।

বাবা যখন ছোট যমুনা তখন বাবার বাড়ি থেকে ৫ কিলোমিটার দুরে। বাবারও বড়ো হয়ে ওঠা আর ধীরে ধীরে যমুনারও বাবার বাড়ির দিকে এগিয়ে আসা। সালটা ১৯৭০ বাবার বিরাট বড়ো বাড়ি, ঘর , উঠোন যমুনায় তলিয়ে যায়। এজন্য সরকার অবশ্য compensation দিয়েছিল। একটা লঙ্কা গাছের compensation ও সেখানে  ছিল। তবে ক্ষতিপূরণের সেই যে বিপুল অর্থ সেটাও একদিন যমুনাতেই ভাষাতে হয়েছিল। কারন demonetization , নোটগুলো ব্যাংকে জমা পরেনি। তখন যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। জীবন যেখানে বিপন্ন সেখানে অর্থ কোনো মুল্য রাখে না। পাকিস্তানি সেনারা হাজারো সংখ্যায় প্রবেশ করেছে , তাদের নির্মম অত্যাচার বহু সাধারণ মানুষের জীবন কেড়েছে। এ সময়ে বাবাকেও দেশ ছেড়ে চলে আসতে হয় জীবন বাচাবার তাগিদে। স্বাধীনতার লড়াই সব দেশেই কঠিন সে বাংলাদেশ হোক বা ভারতবর্ষ বা আমেরিকা। তবে স্বাধীন হবার পর আমরা কতটুকু মনে রাখি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে । যদি সত্যিই মনে রাখতাম তাহলে স্বাধীনতার পর দেশগুলো সুখী হতো, দেশের মানুষও সুখী হতো। কিন্তু ultimately তা হয় না। 

১৯৪৭ এর ১৪ই আগষ্ট ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে পাকিস্তান হলো আর আজকের বাংলাদেশের নাম হলো পূর্ব পাকিস্তান। ইতিপূর্বে ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ই অক্টোবর লর্ড কার্জন বাংলাকে ভাগ করছিলেন পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ নামে। সেদিনও এ নিয়ে অনেক আন্দোলন আর অনেক প্রতিবাদ। এই আন্দোলনেরই একটা প্রতিবাদ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাখীবন্ধন উৎসব পালন ।তবে  অনেক আন্দোলন অনেক প্রতিবাদের পর ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দের ১২ ই ডিসেম্বর দুই বাংলা আবার এক হয়। দেশভাগের মধ্যে দিয়ে সত্যিই কি সুখ আসে! দেশভাগ যত কঠিন তার চেয়েও বেশী কঠিন ছিন্নমূল হয়ে বেচে থাকা আর সারা জীবন ধরে ফেলে আসা জন্মভূমির স্মৃতিচারণ করা। যেটা আমি আমার পরিবারে দেখেছি।

আমার মা ও ছিলেন পাবনা জেলার। দাদু স্বর্ণবনিক , জমি জমাও ছিল বিস্তর। কালিবাড়ি বাজারে এক ডাকেই তাকে চেনা যেত। অর্থ , সম্পত্তি , বৈভব কোনো কিছুরই অভাব ছিল না মার পরিবারে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মা সালেহা গার্লস হাই স্কুলের ছাত্রী ,সবে বড়ো হতে শুরু করেছে। আশেপাশে তখন অনেক ঘটনা আর দূর্ঘটনা। জীবনের চাইতেও সেদিন সন্মান রক্ষাই বড়ো তাই একদিন গভীর রাতে মায়ের পরিবারকেও  দেশ ছাড়তে হলো। সেটা ছিল জ‍্যোৎস্না রাত্রি , ভয়ে আম বাগান পেরোতে হয়েছিল কারন পাকিস্তানী সেনা দেখে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে মেরে ফেলবে।

বছর ছয় সাতেক আগে পযর্ন্ত দেখেছি দু মাস ছয় মাস অন্তর অন্তর আমাদের বাড়িতে বাংলাদেশ থেকে লোকজন এসেছে, গল্প হয়ছে বিস্তর। বাবা তখন রীতিমতো nostalgia আর কতো জিঙ্গাসা - যমুনার ভাঙ্গন কতদূর এগোলো? যমুনার ওপর সেতু কেমন হলো? দেশের জনসংখ্যা এখন কতো? দেশের উন্নতি কেমন? এরকম হাজারো প্রশ্ন আর তার উত্তর আমি পাশের ঘর থেকে শুনেছি। সেদিন থেকেই এ দেশ আমার কল্পনায়। একবার আমিও এদেশে আসবো, বাবা মায়ের সঙ্গেই আসবো। যমুনার কাছে দাঁড়াবো, দেখবো বাবার বাড়িটা এখন যমুনার কোনখানে। মার স্কুল যদি এখনো থেকে থাকে তবে সেখানেও যাবো। এখান থেকে যখন আমি আমার দেশে ফিরবো তখন আর কিছু না হোক এখানকার একটু মাটি নিয়ে ফিরবো। এটুকু অধিকার নিশ্চয়ই আমার বাবা মায়ের দেশ আমাকে দেবে। সবশেষে বলি যদি এটা ১৯৪৭ পূর্বের কোনো একটা সময় হতো তাহলে ইচ্ছে করলেই কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে এদেশ ঘুড়ে নেওয়া যেত। কিন্তু এটা ২০১৮, ইচ্ছে করলেও উপায় নেই, পাসপোর্ট ভিসা অনেক ব‍্যাপার। তবে আমি আসবো।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের কবি



মন্তব্য