kalerkantho


দেশভাগ ও আমরা

সম্পা পাল, শিলিগুড়ি   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১২:০৯



দেশভাগ ও আমরা

ছবি : সম্পা পাল

পৃথিবীতে যেদিন প্রথম প্রাণের আবির্ভাব হয়েছিল সেদিন দেশ বলে কিছু ছিল না, ছিল ভূখণ্ড। মানুষ  সেদিন আদিম আর বন‍্য। চাহিদা একটাই- লড়াই করে বেঁচে থাকা। লড়াইটা কখনো প্রকৃতির সঙ্গে, কখনো বা জীব-জন্তুর সঙ্গে। বাঁচার তাগিদেই মানুষ একদিন দলবদ্ধ আর গোষ্ঠীবদ্ধ হলো। এভাবেই দিন বদলালো সময় বদলালো। আদিম থেকে মানুষ আধুনিক রূপ নিল। সঙ্গে এলো রাষ্ট্রভাবনা, দেশ গঠন ।

দেশ গঠিত হলো। তবে ব্যক্তিস্বার্থ বা রাষ্ট্রস্বার্থের ঊর্ধ্বে পৌঁছতে পারলো না। নিজেরাই নিজেদের ভাগ করে নিলাম। কখনো বর্ণ, কখনো জাতি, কখনো ধর্মকে হাতিয়ার করে। আমরা শুধু ভাগ হলাম তাই নয়, টুকরোও হলাম। 

আরো পড়ুন: বাংলাদেশ আমার বাবা মায়ের দেশ

বেশি দিন নয় সময়টা যদি চারশো বছর পিছিয়ে নিয়ে যাই, অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির প্রাচ‍্য দেশে আগমনকাল, সেদিন কিন্তু প্রাচ‍্য দেশে এত ভাগ ছিল না। প্রাচ্যের এই দেশগুলো ভাগ হলো। এক্ষেত্রে অনকাংশেই দায়ি ইংরেজদের 'divide and rule policy' বা ভাগ করো এবং শাসন করো। বছরের পর বছর ধরে ওরা আমাদের শাসন করলো, শোষণ করলো, দেশের বিপুল সম্পদ নিয়ে গেল। তারপরও ওরা শেষ পর্যন্ত যা চাইলো তাই হলো। দেশ ভাগ হলো। আমরাও সেটাই মেনে নিলাম। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দুটো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বাংলা ও পাঞ্জাব। যাদের অবদান ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন কখনোই অস্বীকার করবে না। তবে স্বাধীনতার মূল্য হিসেবে তাদের ভাগ হতে হলো। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিম পাঞ্জাব চলে গেল নব গঠিত পাকিস্তানে। অগনিত মানুষ তখন গৃহহারা আর আশ্রয়হারা। 

দেশভাগ আমি দেখিনি। আমার  বাবার জন্মেরও  অনেক আগে দেশ ভাগ হয়েছে। তাই প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়তো নেই। তবে ইতিহাস বলে, সাহিত্য বলে, দেশভাগের সময় কতটা কঠিন। আর সেই সময়ে যারা বেঁচে গেছেন, সেটা তাদের দুঃস্বপ্নের বেঁচে থাকা ছিল। একটা ভূখণ্ড দেখিয়ে বলা হলো এপাশ আমার, ওপাশ তোমার আর এই রইলো মাঝখানে একটা কাঁটাতার। এটাই কি দেশভাগ? হয়তো 'হ্যাঁ', হয়তো 'না'। তবে দেশভাগের আসল সমস্যা দুটো ভূখণ্ডের মধ্যে কোনো একটাকে বেছে নেওয়া আর আজন্মের লালিত পালিত জন্মভূমিকে ছেড়ে দিয়ে নতুন করে নতুন জায়গায় জীবন শুরু করা এবং নতুন জীবিকা বেছে নেওয়া। এটা যতটা কঠিন ব্যক্তি জীবনের পক্ষে, রাষ্ট্রীয় জীবনের পক্ষেও ততটাই কঠিন এদের পুনর্বাসন দেওয়া। আমি বলবো, রাষ্ট্রীয় জীবনের চেয়ে এখানে ব‍্যক্তি জীবন অনেক বেশি কঠিন। নতুন দেশ ও পরিবেশে নতুন করে জীবন শুরু করতে যুগ পেরিয়ে যায়। আর ফেলে আসা দেশও জীবন থেকে মুছে ফেলা যায় না। সে স্মৃতিও জীবনের সঙ্গেই থেকে যায়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমার নিজের পরিবার। তবে আমার পরিবার দেশ ভাগের সাক্ষী নয়, দেশ ত‍্যাগের সাক্ষী।

১৯০ বছর শাসন করে ইংরেজরা আমাদের স্বাধীনতা দিল আর উপহার হিসেবে দিয়ে গেল দেশভাগ। ভারত ভেঙে তৈরি হলো নতুন রাষ্ট্র- পাকিস্তান আর আজ যে দেশ বাংলাদেশ নামে পরিচিত সেদিন তার নাম হলো পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু তার আগ মুহূর্ত? অর্থাৎ দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দাঙ্গা । একই জলবায়ুতে লালিত পালিত হিন্দু-মুসলমান ভাই তখন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত। সালটা ১৯৪৬ এর ১৬-২০ আগষ্ট। কলকাতার বুকে চলল চার দিনব‍্যাপি এক রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। স্টেটসম্যান পত্রিকা যাকে নাম দিল 'the great calcutta killing'। বাংলা তখন সুরাবর্দির শাসনাধীন। বাংলার গভর্নর বা ভারতের বড়লাট কেউই এর দায় নিল না। বিষয় সম্পত্তি, নারীর সন্মান সবই সেদিন ভূলুণ্ঠিত। প্রবাসী পত্রিকার মতে, ছয় থেকে আট হাজার লোক এ ঘটনায় মারা যায়। পনেরো থেকে কুড়ি হাজার আহত এবং ছয় থেকে সাত কোটির সম্পত্তি লুণ্ঠিত হয়।

দেশভাগ  হলো আর সব সমস্যার সমাধান হলো তা নয়। সমস্যা তখন আরো জটিল আরো কঠিন। শুধু প্রাচ‍্য নয় মধ্যপ্রাচ‍্য হোক বা পাশ্চাত্য সব ক্ষেত্রেই সমস্যা সমান। দেশভাগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উদ্বাস্তু সমস্যা। এটা তখন শুধু একটা দেশের নয়, অগনিত ছিন্নমূল মানুষের দেশান্তর গমন উভয় রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই এক চরম সমস্যা। ফাঁকা মাঠগুলো তখন ভরে ওঠে নিরন্ন মানুষের ভীড়ে। জীবন তখন  রীতিমতো বিপন্ন। জীবনের প্রাথমিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান সবকিছুর জন্যেই তাকিয়ে থাকতে হয় নতুন রাষ্ট্রের দিকে। 

শিক্ষা বা শিল্পভাবনা এখানে আসে না। সৃষ্টি হয় না কোনো নতুন সাহিত্য। জীবনের উন্নতি তখন স্তব্ধ। খোলা আকাশের নিচে বেঁচে ওঠা এই মানুষগুলো তখন কীভাবে? তাদের কাছে দেশভাগ কি দুঃস্বপ্ন নয়? প্রতি মুহূর্তে কি তাদের চেতনায় আসেনা কেন এই দেশভাগ? ইচ্ছে কি তাদের করে না রাষ্ট্রের নির্দেশ অমান্য করে পূর্বপুরুষের ভিটেতে ফিরে গিয়ে আবার প্রাণ খুলে বেঁচে ওঠা আর বুক ভরে মাটির গন্ধ নেওয়া। কিন্তু তা হয় না। হিংসে আর বিদ্বেষ যে তখন সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। মানুষ তখন ভয়ার্ত,  প্রাণে বাঁচাই প্রধান শর্ত। তা না হলে হয়তো শরণার্থী শিবির তৈরি হতো না, রিলিফ ফান্ড গঠিত হতো না।  এদের জীবন, জীবিকা ,পূনর্বাসন রাষ্ট্রের পক্ষে তখন বিরাট চ্যালেঞ্জ। অগণিত মানুষের ভীড় রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রকেই স্পর্শ করে এই উদ্বাস্তু সমস্যা। তৈরি হয় বিপুল সংখ্যায় বেকার সমস্যা তার সঙ্গে তৈরি হয় খাদ্য সঙ্কট।

পাকিস্তানী লেখক মহসিন হামিদের লেখা 'এক্সিট ওয়েষ্ট' উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়েই লেখা একটি উপন্যাস । কাল্পনিক এই উপন্যাস বেশ সাড়া জাগিয়েছে বর্তমান বিশ্বকে। রোহিঙ্গা সমস্যাও বর্তমান বিশ্বের একটা বড় সমস্যা। অগনিত রোহিঙ্গা মায়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে বেঁচে আছে।

এ তো গেল দেশ! কিন্তু পরিবার? পারিবারিক জীবনেও আজ অনেক ভাগ। অতীতের একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে এখন অনেক টুকরো হয়েছে। তাতে কিন্তু সুখ আসেনি। এসেছে অবসাদ আর একাকীত্ব, বেড়েছে হিংসা। পরিবার ভাগ বা দেশভাগ কোনো ভাগেই জীবনের সুখ আসে না। মিলেমিশে থাকার মধ্যেই জীবনের আসল সুখ। হতেই পারে সেখানে গণ্ডগোল হতেই পারে অশান্তি তবু দিনের শেষে সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকাই সত্যিকারের বেঁচে থাকা। যেদিন আমরা এ সত্যিটা উপলব্ধি করবো সেদিন আমরা সুখী হবো। সেটা হয়তো আগামী ৫০০ বছর বা ১০০০ বছরে সম্ভব হবে না। হতে হতে হয়তো আবার সেই নতুন সূচনা, নতুন পৃথিবী, মানুষ আবার আদিম আর বন‍্য।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের কবি



মন্তব্য