kalerkantho

Reporterer Diary

কঙ্গোর ডায়েরি

মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভ ও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাশা

কাজী হাফিজ    

১৬ মে, ২০১৭ ২০:১৭



মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভ ও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাশা

মধ্য আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ কবলিত দেশ ডি আর কঙ্গো যাওয়ার পথে উগান্ডার এনতেবে শহরে যাত্রা বিরতি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষিদের প্রায় অবধারিত একটি বিষয়। এটি রাজধানী কাম্পালা থেকে ৩৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশুদ্ধ পানির আধার লেক ভিক্টোরিয়া উপ-দ্বীপের শহর। এখানে দু'য়েকদিন অবস্থানের পর জাতিসংঘের বিমানে ডি আর কঙ্গো যাওয়ার সুযোগ মেলে। এই দু'য়েকদিনে অনেকে ঘুরে আসেন জিনজাতে। জিনজা বিশ্বের দীর্ঘতম নদ নাইল (নীলনদ) -এর বহির্গামী উৎসস্থল। এখান থেকে যাত্রা শুরু করে রিভার নাইল ছয় হাজার ৬৫০ কিলোমিটার (৪,১৩০ মাইল) পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ভূমধ্যসাগরে মিশেছে। দেখা হয় বুজাগালি জলপ্রপাত আর বিস্মিত হতে হয় নাইলের উৎসের কাছেই ভারতের জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মূর্তি ও স্মৃতিস্তম্ভ দেখে।  

উগান্ডায় বসবাসকারী ভারতীয়দের উদ্যোগ আর ভারত সরকারের সহযোগিতায় ১৯৯৭ সালে জিনজাতে গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দর কুমার গুজরাল এর উদ্বোধন করেন। একজন শিক্ষিত ব্রিটিশ আইনজীবী হিসেবে মহাত্মা গান্ধী প্রথম তাঁর অহিংস শান্তিপূর্ণ নাগরিক আন্দোলনের মতাদর্শ প্রয়োগ করেন দক্ষিণ আফ্রিকায় নিপীড়িত ভারতীয় সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। এই ঘটনা গান্ধী ও ভারতীয়দের সাথে আফ্রিকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।

উগান্ডার জিনজাতে গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভে লেখা রয়েছে সে সম্পর্কের কথাটিই। এই স্মৃতিস্তম্ভ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক ব্যংক, ‘ব্যাংক অফ বারোদা। '

ভারতের বাইরের মহাত্মা গান্ধী’র  ১০টি স্মৃতিসৌধের মধ্যে আফ্রিকাতেই রয়েছে দুটি। এর একটি উগান্ডার এই পর্যটনকেন্দ্রে  আর অন্যটি দক্ষিণ আফ্রিকার পিটারম্যারিজবার্গ-এ।  

জিনজায় মোহনদাস করমচাাঁদ গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাাঁড়িয়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষিদের অনেকেই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেন, প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের জন্য আফ্রিকাতে এমন কিছু করা যায় না? এই উগান্ডাতে না হোক, পাশের দেশ ডি আর কঙ্গোতে?  

গত মাসের প্রথম দিকে সেনাবাহিনীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নেতৃত্বে  এ প্রতিবেদকসহ ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে ডি আর কঙ্গোতে শুভেচ্ছা সফরে যাওয়ার পথে প্রায় দুই দিন অবস্থান করতে হয় উগান্ডার এনতেবেতে। স্বাভাবিকভাবে সুযোগ মেলে জিনজাতে ঘুরে আসার। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় 'সোর্স অফ রিভার নাইল' -এর কাছে যাওয়া ও ফিরে আসার পথে অন্যসব পর্যটকের মতই থামতে হয় গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভের কাছে।

এর দু'দিন পরেই গত ৩ এপ্রিল রাতে ডি আর কঙ্গোর অন্যতম প্রদেশ ইতুরির রাজধানী বুনিয়ার দ্রোমোতে ইতুরি ব্রিগেডের হেড কোয়ার্টারে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠেন। সে রাতে এ প্রতিনিধিদলের সম্মানে ইতুরি ব্রিগেডের পক্ষ থেকে আয়োজিত নৈশভোজে ইতুরির গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, বুনিয়ার ডেপুটি মেয়র, ডি আর কঙ্গোর সেনাবাহিনীর কমান্ডার, বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষী দলের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিতিত ছিলেন। এ মিলন মেলায় ইতুরির গভর্নর ড. আবদুল্লাহ পেনে এমবাকা জেফারসনের হাতে তুলে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর একটি পোট্রেট।  

ইতুরির গভর্নর ড. আব্দুল্লাহর হাতে বঙ্গবন্ধুর পোট্রেট তুলে দিচ্ছেন সেনাবাহিনীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও ইতুরির শান্তিরক্ষী বিগ্রেডের কমান্ডার ব্রি. জে. কাজী মোহাম্মদ কায়সার হোসেন।

জানা যায়, বিদ্যান এ মানুষটির রয়েছে ইতহাস ও শিল্পকলার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ। এর কয়েকমাস আগে শান্তিরক্ষীদের ইতুরি ব্রিগেডে যখন বাংলাদেশের বিজয় দিবস উদযাপন হচ্ছিল তখন ড. আব্দুল্লাহ বাঙালরি মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিজের শ্রদ্ধা ব্যক্ত করেন। ইতুরি ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রি. জে. কাজী মোহাম্মদ কায়সার হোসেনকে তিনি বলেন, 'আমি বঙ্গবন্ধুর একটি ভালো পোট্রেট আমার গভর্নর অফিসে রেখে দিতে চাই। ' তাঁর সেই চাহিদা অনুযায়ী ৩ এপ্রিল রাতে মেজর জেনারেল ওয়কার-উজ-জামান ড. আব্দুল্লাহর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ উপহার তুলে দেন।  

ওই রাতেই আবারও কয়েকজন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কর্মকর্তার মধ্যে একান্ত আলোচনায় উঠে আসে জিনজায় গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভের বিষয়টি। আবারও প্রশ্ন ওঠে এই খানে কি বাংলাদেশের জন্য তেমন কিছু করা যায় না? প্রশ্নটি করা হয়, ব্রি. জে. কাজী মোহাম্মদ কায়সার হোসেনকে। তিনি কিছুটা সময় নেন। হয়তো কিছুক্ষণ কঙ্গোতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে চ্যালেঞ্জগুলো, এ পর্যন্ত সেদেশে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ, স্থানীয় সাধারণ শান্তিপ্রিয় জনগণের কতটা আস্থা অর্জন সম্ভব হয়েছে-এসব নিয়ে ভাবনায় নিমগ্ন হন। এরপর বলেন, ডি আর কঙ্গোর শান্তিপ্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ত্যাগ, আত্মোৎসর্গ কঙ্গোলিজরা নিশ্চয় মনে রাখবে। মনে রাখবে বাংলাদেশের পরিচয়কে। এদেশের অনেক সচেতন মানুষের কাছে আমাদের জাতির জনক এবং মুক্তিযুদ্ধ যে প্রেরণার বিষয়, তার প্রমাণ ড. আব্দুল্লাহর ওই চাহিদা। এটা শুরু মাত্র। আমরা আশা করতে পারি আরো অনেক কিছু।

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ


মন্তব্য