kalerkantho

Reporterer Diary

কঙ্গোর ডায়েরি

চুকুডু

কাজী হাফিজ    

২০ মে, ২০১৭ ২০:৫৩



চুকুডু

ডি আর কঙ্গোর নর্থ কিভু প্রদেশের রাজধানী গোমার রাস্তায় কাঠের বাইসাইেকল বা স্কুটার সবার নজর কাড়ে। চুকুডু নামের এই বাহনে স্থানীয় কঙ্গোলিরা পাহাড়ি রাস্তায় ১৩শ’ পাউন্ড পর্যন্ত ওজনের মালামাল বহন করে থাকে।

আয় করে থাকে সাধারণ শ্রমিকের তুলনায় ১০ গুণ। বলা হয়ে থাকে যে কঙ্গোলি পুরুষের একটি চুকুডু নেই তার বিয়ে করার যোগ্যতা নেই।  

কঙ্গোলিদের পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবে গোমা শহরের কেন্দ্রে ২০০৯ সালে স্থাপন করা হয়েছে সোনালী রঙের একটি চুকুডু স্ট্যাচু। এর উপরে স্থাপন করা হয়েছে পৃথিবী। এতে বোঝানো হয়েছে, দেখো, তৃতীয় বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ কীভাবে অনুন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর ভার বহন করে চলেছে।  

চুকুডুতে মনোযোগী হওয়ার আগে যে এলাকায় এই বাহনটি চলে সে এলাকা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া দরকার।  

গোমা শহরে দাঁড়ালে নজর কাড়বে বিশাল এক পাহাড় নাইরোগঙ্গো। এটি একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। শহর থেকে ১৮ কিলোমাটার দূরে এর অবস্থান।

রাতে এর জ্বালামূখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০২ সালে এই আগ্নেয়গিরি থেকে ক্ষীপ্ত লাভার স্রোত প্রায় ৬ ফুট উঁচু হয়ে বয়ে যায় গোমা শহরজুড়ে। গোমা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের রানওয়ের ঢেকে যায় লাভায়। প্রায় সাড়ে চার হাজার বাড়ি-ঘরসহ শহরের ৪০ শতাংশ ধংস হয়ে যায়। শহরটির সর্বত্র সেই তরল আগুন এখন কালো পাথর হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এগুলো এখন এই এলাকার ঘর-বাড়ির অন্যতম নির্মাণ সামগ্রী। বাড়ির প্রাচীর তৈরি হচ্ছে ইটের বদলে ওই লাভা পাথরের খণ্ডাংশ দিয়ে। এরপরও যে কোনো সময় আবারও সেই ভয়ংকর ঘটনার আশঙ্কার মধ্যেই চলছে এ শহরের জীবন যাপন। বলা হয়, এটম বোমার সাথে বসবাস এই শহরের বাসিন্দাদের।  

শহরের একপাশে রয়েছে আফ্রিকার বৃহত্তম হ্রদগুলোর অন্যতম লেক কিভু। শহরের একপাশে এই হ্রদের নীল জল আর অন্য পাশে নাইরোগঙ্গোর জ্বালামুখ সূর্যাস্তের সময় এক বর্ণালী পরিবেশ তৈরি করে। এই লেক কিভুর স্বচ্ছ জলের তলদেশও নাইরোগঙ্গোর লাভাস্রোতের কারণে মিথেনে ভরপুর। মাছেরা এই লেকে বড় হতে পারে না।  

গোমার প্রতিবেশি হিসেবে রয়েছে বিশ্বে বিরল পাহাড়ি গোরিলারা। এই শহরের কাছে রয়েছে বিখ্যাত ভিরুঙ্গা ন্যাশনাল পার্ক। এই পার্কে সহজেই দর্শন মেলে শিম্পাঞ্জিদের পরে মানুষের নিকটতম সমগোত্রীয় এ প্রাণীদের। আর আছে রুয়ান্ডা সীমান্ত এবং ১৯৯৬ সাল থেকে  ২০০৩ সাল পর্যন্ত চলা কঙ্গোর প্রথম দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতার স্মৃতি। তাঁর আগে ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যাও এখানে ব্যাপক প্রভাব ফলে। ২০১২ সালের এই শহর দখল করে নেয় রুয়ান্ডার সমর্থনপুষ্ট বিদ্রাহী দল ‘এম ২৩’। বর্তমানে এ শহর এখন সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের ফোর্স হেডকোয়ার্টারও এই শহরে।  

মূলত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রম এই শহরটিকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে। লেক কিভুর পাড়ে আভিজাত রেস্টুরেন্টগুলোতে রাতে যারা ভীড় জমান তাদের সাথে স্থানীয়দের দূরুত্ব অনেক। রেস্টুরেন্ট প্রাঙ্গনে আলো-আধারিতে দেখা মেলে বেশ কয়েকটি ধূসর মুকুটের সারসের। এই মনোরম পরিবেশেই হয়তো ওদের মানায়। রেস্টুরেন্ট থেকে দূরে গোমার লাভা পাথরের রাস্তায়, কালো কর্মঠ মানুষগুলোর সাথে যেমন মানায় চুকুডুকে।  

গত মাসের প্রথম দিকে সেনাবাহিনীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নেতৃত্বে এ প্রতিবেদকসহ ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল যখন গোমাতে অবস্থান করছিল, তখন এ দলের সদস্যদের বেশিরভাগই চুকুডু স্ট্যাচুর কাছে পৌঁছে ছবি তোলার সুযোগ ছাড়েননি। অনেকে স্মরণ করেছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত চিত্রকর্ম কাদায় আটকানো কাঠ বোঝাই গরুর গাড়ির চাকা ঠেলার সেই দৃশ্যকে।

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ


মন্তব্য