kalerkantho

Reporterer Diary

কঙ্গোর ডায়েরি

'সুইজারল্যান্ড অব আফ্রিকা'

কাজী হাফিজ    

২৯ জুন, ২০১৭ ২০:৩৬



'সুইজারল্যান্ড অব আফ্রিকা'

সবুজ ঘাসে মোড়া পাহাড় মিসিসি পর্বতমালা। ডি আর কঙ্গোর এই এলাকাটিই সুইজারল্যান্ড অফ আফ্রিকা নামে পরিচিত।

জায়গাটির নাম মুশাকি। ডি আর কঙ্গোর নর্থ কিভু প্রদেশের রাজধানী শহর গোমা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের একটি সবুজ পাহাড়ী এলাকা।

মাসিসি পর্বতমালার এই এলাকাটি ‘সুইজারল্যান্ড অব আফ্রিকা’ হিসেবেও পরিচিত। সুইজারল্যান্ডে তৈরি গুড়ো দুধের ক্যানগুলোতে যে ধরণের সবুজ ঘাসে ঢাকা পাহাড়ের পটভুমিতে উন্নত জাতের গাভির ছবি ছাপা থকে, এখানেও  সেই দৃশ্য। সবুজ ঘাসে মোড়া পাহাড়ের ঢালে চরছে গরুর পাল। কঙ্গোর বিশাল শিং-এর দেশি গরু নয়। সুইজারল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা উন্নতজাতের গরু। গো-পালের সাথে কিছু ঘোড়াও চোখে পড়ে। এখানেই ডেইরিফার্মগুলো পনির উত্পাদনে ডি আর কঙ্গোর ভিন্ন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। সমুদ্রপিষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার ফুট উঁচু এ এলাকার পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মেঘের গড়াগড়ি। এই বৃষ্টি, এই রোদ্দুর। প্রবল বাতাসে শীতের আমেজ। বজ্রমেঘের দাপট বাড়লে পাহাড়ে প্রতিধ্বনী তোলো গো-পালের আর্তস্বর।  

সড়কের বেহাল দশা না হলে গোমা থেকে জাতিসংঘ মিশনের গাড়িতে এক ঘণ্টায় এস্থানে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু লাগলো আড়াই ঘণ্টা। এখানে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী সেনা প্রকৌশলীদের ক্যাম্প। যাকে বলা হয় ব্যান-ইঞ্জিনিয়ার। আগেই বলা হয়েছিল, আপনাদের ডি আর কঙ্গো ভ্রমণের শেষ রাত্রিটা এমন এক জায়াগায় কাটবে যেখানকার আবহাওয়া দেশটির অন্যান্য এলাকার চাইতে একেবারে আলাদা। শীত বস্ত্রও সঙ্গে নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। গত ৬ এপ্রিল বেলা ১২টার দিকে ব্যান-ইঞ্জিনিয়ার ক্যাম্পে পৌঁছে স্বাদ নিতে হলো কঙ্গোলিজ পনিরের- যার অবদান চারপাশের পাহাড়ের ঢালে বিচরণরত ‘ব্রাউন সুইজ কাও’সহ নানা জাতের গাভীদের।  

পনির অবশ্য কঙ্গোর ঐতিহ্যবাহী খাবারের অংশ নয়। এতে অভ্যস্থও নয় সাধারণ মানুষ। এদের অনেকের সকালের নাস্তা জোটে না। কিন্তু তারপরেও মুশাকিতে এর উত্পাদন কেনো এবং কাদের জন্য? জানা যায়, কঙ্গো যখন বেলজিয়ামের উপনিবেশ তখন বেলজিয়াম সন্ন্যাসীদের রসনা নিবৃত্তের জন্যই এখানে সুইজারল্যান্ড থেকে উন্নত জাতের গরু আসে এবং পনির উত্পাদন শুরু হয়। এখন সারা কঙ্গো জুড়ে স্থানীয়দের মাঝেও এর ব্যবহার বাড়ছে। গোমার আভিজাত রেস্ট্ররেন্টগুলোসহ অন্যান্য এলকার চাহিদা  মেটাচ্ছে মুশাকির পনির।  

মুশাকি পাহাড়ে ইতুরি ব্রিগেডের কমান্ডার বাংলাদেশ সেনাবাহনীর ব্রি. জে. কাজী মোহাম্মদ কায়সারের সাথে লেখক।  

মুশাকির এই সবুজ নির্মল পরিবেশে ডি আর কঙ্গোর জটিল রাজনীতি, গৃহযুদ্ধ- এসবের আলোচনা, বিশ্লেষণ  থেকে একটা দিন মুক্তি পেলেই ভালো হতো। কিন্তু এখানেও এক মাদাম রিকার শৈল নিবাস আলোচনায় নিয়ে আসে কঙ্গোর সাবেক প্রেসিডেন্ট লরেন্স কাবিলার নিজ প্রসাদে রহস্যময় খুনের  ঘটনা, তাঁর পুত্র বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলার জন্ম নিয়ে বিতর্কসহ নানা অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ।  

আমাদের বিকেলের কর্মসূচি ছিল ‘হাইকিং’। মুশাকি ক্যাম্পটি যে পাহাড়ের পাদদেশে সেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চুড়ায় উঠা। এ পাহাড়ের চুড়াতেই মাদাম রিকার বাসা। সেখানেই আমাদের বৈকালিক নাস্তার আয়োজন। অতএব না উঠার বিকল্প নেই। সবার হাতে একটা করে লাঠি। এটিই ভারসাম্য রক্ষার অবলম্বন। সবুজ ঘাসের কার্পেটে লাঠির ভর রেখে উপরে উঠার সময় নিচে তাকালে মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা। আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল, ভারসাম্য না রাখতে পারলেও অসুবিধা নেই। গড়াতে গড়াতে নীচের ক্যাম্পেই পৌঁছে যাবেন। দলের অন্যদের অবস্থা কি তা জানতে এক পাশে তাকাতে দেখি  মেজর পদবীর দুই নারী সেনা কর্মকর্তা তরতরিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছেন। দলের নেতা সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে ঘিরে রেখে অন্যরাও উঠছেন। যেহেতু আমি ছাড়া দলের আর সবাই সেনাকর্মকর্তা, তাই বোধ হয় কারো হূদরোগ বা শ্বাসকষ্ট রয়েছে কিনা তা  এই পাহাড়ে উঠার কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগে জানার কোন প্রয়োজন হয় নি।  

রিকা সম্পর্কে আগেই জানানো হয়েছিল, তিনি খুবই প্রভাবশালী নারী। তাঁর স্বামী ডিআর কঙ্গোর সাবেক প্রেসিডেন্ট লরেন্ট কাবিলার গেরিলা জীবনের  বন্ধু ও সহযোদ্ধা ছিলেন। রিকার বাসার পৌঁছনোর পর লরেন্ট কাবিলার বহুগামী জীবনের গল্পগুলোও মনে পড়ে। সেসব গল্প জানার জন্য আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সরাসরি  ডিআর  কঙ্গোতেও যাওয়া লাগে না। অনলাইনে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।  

মুশাকি পাহাড়ে সেনাবাহনীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাথে প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্য ও বাংলাদেশী শান্তরক্ষিদের সাথে লেখক।  

প্রচার রয়েছে লরেন্ট কাবিলা যখন আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে জায়ারের (ডি আর কঙ্গোর আগের নাম) প্রেসিডেন্ট মুবুতো সেসে সেকোর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত তখন তাঁর ১৩টিরও বেশি পত্নি, উপপত্নি ছিল। সন্তান ছিল ২৫টিরও বেশি। তবে এসব স্ত্রী, সন্তানের অনেকেরই স্বীকৃতি মেলেনি। ডিআর কঙ্গোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা নিজেকে লরেন্ট  কাবিলার সন্তান ও উত্তারাধিকার দাবি করলেও ভিন্ন তথ্যের প্রচারণাও রয়েছে। একটি পক্ষের দাবি, জোসেফ কাবিলার আসল নাম ‘হাইপোলিটে কানাম্বে কাজেমবারোম্বি’। তার আসল বাবা রুয়ান্ডার নাগরিক ক্রিস্টোফার কানাম্বে। আসল মায়ের নাম মারকেলিন মুকাম্বুগুজে। তিনিও রুয়ান্ডানিয়ান। হাইপোলিটে কানাম্বোর বাবা  রুয়ান্ডার সাবেক প্রেসিডেন্ট জুভেনাল  হ্যাবেইয়ারিমানা বিরোধী  এবং লরেন্ট কাবিলার আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের মিত্র ও সহযোদ্ধা ছিলেন। ১৯৭৭ সালে ক্রিস্টোফার কানাম্বে মারা যাওয়ার পর লরেন্ট কাবিলা তার স্ত্রীকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের দুই যমজ সন্তান জেনি কানাম্বে ও হাইপোলিটে কানাম্বেকে দত্তক নেন। হাইপোলিটে কানাম্বে এখন জোসেফ কাবিলা আর জেনি কানাম্বে হচ্ছে জায়নেত কাবিলা। তিনি  ডি আর কঙ্গোর পার্লামেন্টের একজন নির্বাচিত সদস্য এবং বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অংশীদার।  

‘কঙ্গোলিজ কোয়লিশন ব্লগ’  নামের একটি অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর প্রকাশিত ‘ কঙ্গো আই ওপেনার শক: ‘ জোসেফ কাবিলা’ ইজ নট কঙ্গোলিজ নর এ ‘ কাবিলা’!’ শিরোনামে  একটি নিবন্ধে এসব কথা লেখা হয়েছে। ওই নিবন্ধে লরেন্ট কাবিলা ও ক্রিস্টোফার কানাম্বের মাঝে জোসেফ কাবিলার ছবি রেখে প্রশ্ন করা হয়েছে, ‘হুজ সন ইজ দ্য গাই ইন দ্য মিডল?’ ছবিতে দেখা যায় ক্রিস্টোফার কানাম্বের চেহারার সাথে, বিশেষ করে তাঁর চোখের সাথে জোসেফ কাবিলার যথেষ্ট মিল রয়েছে।  

বিশ্বের দায়িত্বশীল বিভিন্ন  গণমাধ্যমেও জোসেফ কাবিলার জন্মস্থান, পড়াশোনা, শৈশব- এসব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।  বিভিন্ন  গণমাধ্যমে  জানা যায়, জোসেফ কাবিলার  শৈশব কাটে তানজানিয়ায় এবং তিনি সোহেলি ও ইরেজি ভালো জানলেও নিজে রাজধানী কিনসাসার ভাষা ফ্রেন্স ও নিংগালাতে পারঙ্গম নন।  

নিজ প্রাসাদে কিশোর দেহরক্ষীর গুলিতে  লরেন্ট কাবিলা নিহত হওয়ার ঘটনায় জোসফ কাবিলার ভূমিকাও রহস্যজনক বলে একটি পক্ষের দাবি।  

দক্ষিণ আফ্রিকার অনলাইন নিউজ পেপার ডেইলি মাভেরিক-এ ২০১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ‘কঙ্গো রেবলস, এ কাবিলা ফ্যামিলি অ্যাফেয়ার’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে জানায়, ডি আর কঙ্গোর ২০০৬ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোও এই অভিযোগ করে যে, জোসেফ কাবিলা লরেন্ট কাবিলার বৈধ সন্তান না।  

মাদাম রিকার শৈলনিবাসের কাছে স্থানীয় কঙ্গোলিজ শিশুরা ও লেখক।  

তবে দায়িত্বশীল সংবাদ মাধ্যমগুলোতে জোসেফ কাবিলা লরেন্ট কাবিলারই সন্তান এবং তাঁর ভাইবোনের সংখ্যা ৮ জন বলে প্রচার রয়েছে। তাঁর চার বোন হচ্ছে জেসেফিন, গ্লোরিয়া, মাকোলো ও সেসাইরিয়া। দুই ভাই হচ্ছে জো ও সেলেমানি। এদের মধ্যে জো পার্লামেন্ট মেম্বার।  
জোসফ কাবিলার বিয়েটাও একটি চমক। ২০০৬ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি ৩৫ বছর বয়সে  বিয়ে করেন তাঁর দীর্ঘদিনের মেয়েবন্ধু অলিভ লেম্বে ডি সিটাকে। সিটার বয়স তখন ৩০ বছর। বিয়ের ৬ বছর আগেই এ দম্পতি এক কন্যা সন্তান লাভ করে। ওই কন্যার নাম রাখা হয়  জোসেফ কাবিলার মা ( আসল কিনা সে বিষয়ে  অনেকের সন্দেহ রয়েছে) সিফা মাহান্যার নাম অনুসারে সিফা। পরে এ দম্পতি একটি পুত্র সন্তান লাভ করে তার নাম রাখা হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট লরেন্ট কবিলার নামে লরেন্ট।  

প্রেসিডেন্ট লরেন্ট কাবিলার স্ত্রী, দুই সন্তান ও আট ভাইবোনের নামে দেশটির ১২০টিরও বেশি স্বর্ণ, হীরক, কপার, কোবাল্ট ও আরো কিছু খনিজ দ্রব্য উত্তলনের পারমিট রয়েছে। বিদেশী অনেক  কোম্পানির অংশীদারিত্বও রয়েছে জোসেফ কাবিলার পরিবারের।  দেশে রয়েছে  টেলিকম, ব্যাংক, জ্বালানী তেল সরবরাহ, এয়ার লাইনস, রাস্তা নির্মান, হোটেল, ঔষধ সরকরাহ, ট্রাভেল এজেন্সি ও  নাইট ক্লাবসহ হরেক রকমের ব্যবসা। কিছু সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ- মুশাকিতেও রয়েছে জোসেফ কাবিলার স্ত্রীর অলিভের  একটি ক্যাটল ফার্ম । ২০১৫ সালে সে ফার্মে তিনি আসেন রিপাবলিকান গার্ড পরিবেশিত অবস্থায়। এই বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য। ডিআর আর কঙ্গোর সংবিধান অনুসারে কোন ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ২০ ডিসেম্বর। ওই বছরের নভেম্বরে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি। ভোটার তালিকা তৈরিসহ নির্বাচনের বিপুল ব্যয়ের সামর্থ এখন সরকারের নেই এই অজুহাতে এখনও প্রেসিডেন্ট পদ দখলে রেখেছেন জোসেফ কাবিলা। পর্যবেক্ষক মহলের বিশ্লেষণ, প্রেসিডেন্টের পদের সাথে যদি দেশ জুড়ে কাবিলা পরিবারের বিশাল ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের বিষয়টি না থাকতো তাহলে ক্ষমতা বদলের গণতান্ত্রিক পথে এ ধরণের জটিলতা সৃষ্টি হতো না।  

প্রসঙ্গত, পৃথীবির অর্ধেকের বেশি কোবাল্ট, ৩০ শতাংশ ডায়মন্ড বা হীরক, ৭০ শতাংশ কলটন (মোবাইল ফোন তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান) এবং আরো অনেক খনিজে সমৃদ্ধ  ডি আর কঙ্গো। কিন্তু জাতিসংঘের উন্নয়ন সূচকে পৃথীবির ১৮০টি দেশের নীচে অবস্থান এ দেশটির।  
মুশাকির সবুজ ঘাসে ঢাকা পাহাড়ের চূড়ায় মাদাম রিকার বাসার কাছেই খালি পায়ের  হতদরিদ্র ৫/৬ জন কঙ্গোলিজ শিশুর দেখা মেলে। ওরা ওপর থেকে  হয়তো আমাদের পাহাড়ের উঠার কসরত উপভোগ করছিল। ভাষাগত সমস্যার জন্য ওদের সাথে কথা হয় না। তবে ছবি তুলতে চাইলে সহাস্যে সম্মতি জানায়। চারপাশে সাধারণ মানুষের কোন ঘরবাড়ি চোখে পড়ে না। শুধু সবুজ পাহাড়ের সারি।  

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ


মন্তব্য