kalerkantho


প্রধানমন্ত্রীকে যে কথা বলা হলো না অগ্নিদগ্ধ রোহিঙ্গা নারীর

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০২:২০



প্রধানমন্ত্রীকে যে কথা বলা হলো না অগ্নিদগ্ধ রোহিঙ্গা নারীর

মাত্র মিনিট-দুয়েক সময়ের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ পাননি হতভাগী রোহিঙ্গা নারী শাহজাহান বেগম (৩৫)। সারা শরীর আগুনে দগ্ধ এই নারী।

মিয়ানমারের রাশিদং জেলার সুয়ার প্রাং গ্রাম থেকে টানা ১২ দিন হেঁটে সোমবার রাতে পৌঁছেছেন উখিয়ার কুতুপালং গ্রামে। রাতে এখানে পৌঁছে ক্লান্ত দেহ নিয়ে স্বস্তির ঘুম দিয়েছিলেন নির্যাতিত নারী শাহজাহান বেগম।

পোড়া শরীর নিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে কুতপালং রোহিঙ্গা শিবিরের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের নির্ধারিত স্থানে আসতে বিলম্ব হয়ে যায় তার। প্রধানমন্ত্রী সভাস্থল ত্যাগ করার পর অঝোরে কাঁদেন তিনি। কালের কণ্ঠ প্রতিবেদকের দেখা পেয়েই তিনি বলতে থাকেন, আঁইতো বাংলাদেশের রাজারে (প্রধানমন্ত্রী) আঁর কষ্টর কথা কইত ন পারি। আঁই আইতে আইতে রাজা গেইয়ই। ’ অর্থাৎ আমিতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমার কষ্টের কথা বলতে পারলাম না। আমি আসতে আসতে প্রধানমন্ত্রী চলে গেছেন।

মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে হাত-পাসহ সারা শরীর অগ্নিদগ্ধ।

তবুও বলতে পারেন। একটানা ১২ দিন ধরে হেঁটে হেঁটে পাহাড়ী রাস্তা কিভাবে পাড়ি দিয়েছেন এই নারী তা শুনলে যে কোন কেউ আঁৎকে উঠবেন। পোড়া দেহ নিয়ে কিভাবে একজন নারী এত দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে পারে তাও রীতিমত অবাক হবার মত ব্যাপার।  

যেদিন মিয়ানমারের সেনা ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা সকাল বেলায় পুরো পাড়া ঘিরে ফেলে আগুন না দিয়েও চলে গিয়েছিল সেদিনই ঘটে বিপত্তিটি। ১২ দিন আগের কথা। সেদিন সেনা ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা সকাল বেলায় এসে তাদের পাড়াটি ঘিরে ফেলেছিল। তখন পাড়ার অনেক লোকজন ছিল ঘরের বাইরে। এ সময় আগুন দিলে এত লোকের প্রাণহানী ঘটত না। তিনিও হারাতেন না বুকের দু’টি ধন এবং নিজের স্বামীকে।

চোখের সামনে একে একে তিনজন স্বজনকে হারিয়েছেন তিনি। নিজেও পুড়েছেন নিজ ঘরের আগুনে। ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। সাথে দুই পুত্র ও এক কন্যা এবং কন্যার স্বামীকে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে স্থান হয়েছে কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে।

শাহজাহান বেগম কালের কণ্ঠকে জানান, সেদিন হায়েনার দল দুপুর বেলায় দ্বিতীয়বার এসে আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় আমার কপালটা পুড়ে গেলে। আগুন লাগার সাথে সাথে ঘরের ভিতর আমার দুই শিশু পুত্র সন্তানকে খুঁজতে গিয়েই আমি নিজেই দগ্ধ হয়েছি। ’ তিনি বলেন, মরার আগুন এতই শক্তিশালী যে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই আগুনে আমার স্বামী শফিউল্লাহ, পুত্র সন্তান জহুরুল্লাহ ও অজিউল্লাহ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে।

আগুনের লেলিহান শিখা যতক্ষণ ছিল ততক্ষণই চোখে দেখেছি। দেখেছি আমার স্বামী পুড়ছে। পুড়ছে আমার দুই শিশু সন্তান। শাহজাহান বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, এখনো পেছনে ফিরে তাকাই। ওই মরার আগুন তুই আমার স্বামী ও দুই সন্তানকে পুড়ে মারলি। আগুন তুই আমাকেও পুড়লি।

রোহিঙ্গা শিবিরে শাহজাহান বেগম এসব বলে বলে বিলাপ করছিলেন। দেখতে পেলাম আন্তর্জাতিক অভিভাসন সংস্থা (আইওএম) এর লোকজন এসে চিকিৎসা দিতে শাহজাহান বেগমকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

এদিকে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের ধরে তিনি কেঁদে ফেলেন। মঙ্গলবার উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় এ দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাও ছিলেন।

মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে রেজিস্টার্ড ও আনরেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী ও রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনকারী সফর সঙ্গিরা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কাছে পেয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গারা আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে থাকেন।

রোহিঙ্গারা তাকে কাছে পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মা মা বলে উচ্চস্বরে কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারা বলতে থাকেন, আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী আমাদের চায় না। আমাদের রোহিঙ্গা জাতি হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছেনা। অথচ ভিনদেশি প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেখতে এসেছেন। আশ্রয় দিয়েছেন, খাদ্য দিচ্ছেন। কাছে এসে বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন নিজের সন্তানের মত করে। আদর আর ভালবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন নির্যাতিত রোহিঙ্গা শিশুদের। আল্লাহ তার মঙ্গল করুন।

প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষের সঙ্গে কথা বলার সময় মিয়ানমারের সেনা ও রাখাইনদের নির্যাতন এবং গুলিতে আহতদের খোঁজ খবরও নেন। ঘর-বাড়ি, প্রিয় জন্মভূমি দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা সহায় সম্বল হারানো রোহিঙ্গারা জানায়, প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিকভাবে যোগাযোগ করে তাদের ভিটেতে ফিরে যেতে সহায়তা করবেন। মিয়ানমারও তাদের হাত বাড়াবে বলে আশাবাদি নাগরীকত্ব হারানু রোহিঙ্গাদের। অনেকেই আশায় বুক বেধেছে ফিরে পাবে তাদের দেশ ও নাগরিকত্ব।


মন্তব্য