kalerkantho


উখিয়া সীমান্তে ও রোহিঙ্গা শিবিরে বিদেশিদের ছড়াছড়ি

# আটক ৫ বিদেশির ৪ জনই পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত বৃটিশ # জিরো লাইনে ঘুরাঘুরির সময় আরো এক বিদেশি উদ্ধার # আটক ১১ জনকে আদালতে প্রেরণ # জঙ্গিবাদ উত্থানের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার    

৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০১:২২



উখিয়া সীমান্তে ও রোহিঙ্গা শিবিরে বিদেশিদের ছড়াছড়ি

রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে সন্দেহভাজন দেশি-বিদেশি লোকজনের এখন ছড়াছড়ি। এসব বিদেশিরা যদি কোন এনজিও বা আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মরত কর্মী হন তাহলে তাদের নির্দ্দিষ্ট অফিসে থাকার কথা।

অথবা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া অনুমতি সাপেক্ষেই ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করার নিয়ম। কিন্তু এসব নিয়ম-কানুনের ধার ধারছে না কিছু দেশি-বিদেশি লোকজন-এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।  

তবে এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন সরেজমিন এলাকা পরিদর্শন করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন-এমন পরিস্থিতির উদ্ভব কোনভাবেই হতে দেওয়া হবে না। এদেশে যারাই যতক্ষণ অবস্থান করবেন তাদের জন্য ততক্ষণই দেশের প্রচলিত আইন প্রযোজ্য হবে। সুতরাং সীমান্তের জিরো লাইনে আসা-যাওয়া থেকে শুরু করে সবই নিষিদ্ধ।

এমনকি সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এনজিও ছদ্মাবরণে দেশি-বিদেশি লোকজন এখন সীমান্তের জিরো লাইন সংলগ্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস পর্যন্ত শুরু করেছেন। শুধু তাই নয়- জিরো লাইনে বিদেশি নাগরিকের অহেতুক ঘুরাঘুরিও বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। মঙ্গলবারও ফ্রান্সের এক নাগরিক জিরো লাইনে ঘুরাঘুরি করার সময় উদ্ধার করেছে স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার। এসব ঘটনা কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমান পাড়া জিরো লাইন এলাকার।

সীমান্তে এমনিতেই এক অস্বস্থিকর অবস্থা। সময় গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টা। ওপারে চলছিল মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের আনাগোনা। এমন সময়েই এক বিদেশির সাথে কুতপালং শিবিরের একজন রোহিঙ্গা যান জিরো পয়েন্টে। এই পয়েন্ট দিয়েই সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইন থেকে অনুপ্রবেশ করছে রোহিঙ্গার ঢল। এই বিদেশি ফ্রান্সের নাগরিক। খবর পেয়ে পালংখালী ইউপি মেম্বার সুলতান আহমদ এই বিদেশিকে জিরো লাইন থেকে নিয়ে আসেন।

পরে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নিকট খবর পেয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নিকারুজ্জামান সীমান্তের এমন অবস্থায় সেখানে ছুটে যান। তিনি একাকী এই ভিনদেশী নাগরিকের সন্দেহজনক উপস্থিতির খবর পেয়ে সীমান্ত এলাকায় গিয়ে তাকে (বিদেশিকে) নিয়ে আসেন। ইউএনও জানান, ফ্রান্সের এই নাগরিক মূলত ভারত থেকে রোহিঙ্গা শিবির দেখতে এসেছেন বলে জানিয়েছেন তাকে।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, ‘দেখুন মাত্র একদিন আগে গত সোমবার আমি এবং পুলিশ সুপার এক সাথে ওই সীমান্তে গিয়ে বিনানুমতিতে অহেতুক বিদেশি নাগরিকদের উপস্থিতি থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করে আসি। কিন্তু আজ (গতকাল) সেখানেই বিদেশি নাগরিকের উপস্থিতি মানেই হচ্ছে এদেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। ’

পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন এ বিষয়ে বলেন, বিদেশিরা সরকারের যথাযথ অনুমতি ব্যতিরেকে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান ও বসবাস করতে পারেননা। তাছাড়া রাতের বেলায় রোহিঙ্গা শিবিরে সন্দেহজনক ঘুরাফিরাও বিপদজনক।

প্রসঙ্গত সোমবার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার পালংখালী এলাকার রহমতের বিল নামক স্থানে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার লোকজন কর্তৃক বিনানুমতিতে রোহিঙ্গাদের চলাচলের সুবিধার্থে নির্মাণাধীন সেতুর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেন।

পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় একটা-দু’টা নয়, আরো অনেক দেশি-বিদেশি নাগরিক এনজিও’র ছদ্মাবরণে সীমান্ত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছেন। এলাকার লোকজনও বেশী টাকার বিনিময়ে ঘরভাড়া দিতে পেরে নিজেরা অন্যত্র সরে যাচ্ছেন।

চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আমাকে এ বিষয়ে নজরদারি করতে বলেছেন। তাই আমি নজরদারি করার কাজ শুরু করেছি। ’ ইউপি চেয়ারম্যান জানান, রোহিঙ্গা শিবিরে রাত-বিরাতে অনেক লোকজনের বিচরণ রয়েছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা লোকজন রোহিঙ্গাদের মাঝে নগদ টাকা পয়সা দেয়ার মত খবরও রয়েছে।

এদিকে সীমান্তে এনজিও’র ছদ্মাবরণে সন্দেহভাজন দেশি-বিদেশি লোকজনের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা শিবিরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির গোপন সংবাদে সোমবার রাতে উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে। এ অভিযানে যে ৫ বিদেশি নাগরিক সহ ২৬ জনকে আটক করে তাদের নিয়েও উঠেছে নানা কথা। দুই নারীসহ এই ৫ বিদেশির মধ্যে ৪ জনই পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ নাগরিক।

বিদেশিরা পুলিশকে জানিয়েছেন, তারা এখানাকার আইন-কানুন সর্ম্পকে ওয়াকিবহাল নন। একারণেই তারা রাতের বেলায়ও রোহিঙ্গা শিবিরে অবস্থান নিয়েছিলেন। বিদেশি নাগরিক হওয়ায় তাদের মুচলেকা সহকারে পাসপোর্টের ফটোকপি জমা নিয়ে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। প্রসঙ্গত গেল বছর টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে চীন থেকে আসা কিছু লোক রোহিঙ্গাদের নগদ টাকা দেয়ার সময় কয়েক লাখ টাকা নিয়ে পুলিশ-বিজিবি সদস্যদের হাতে ধরা পড়েছিলেন।

অপরদিকে ৫ বিদেশি ছাড়া আটক হওয়া ২১ জনের মধ্যে ১১ জনের বিরুদ্ধে উখিয়া থানা পুলিশ ৫৪ ধারায় সন্দেহজনক অভিযোগ এনে গতকাল তাদের আদালতে প্রেরণ করেছেন। পুলিশ তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিম্যান্ডের আবেদনও জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, পুলিশী অভিযানে কুতুপালং শিবিরে যে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে ৫ জনকে নানা কারনে সন্দেহ করা হচ্ছে।  

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে জানিয়েছে, গত দুই মাস সময়ে তারা একাধিকবার শিবিরে এসেছিলেন। কুতুপালং শিবিরের মধুরছড়া পাহাড়ি এলাকায় মদীনা পাহাড় নাম দিয়ে এসব লোক কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া মাদ্রাসা ও মক্তব স্থাপন করেছে। তারা তাদের অর্থের উৎস সর্ম্পকে পুলিশকে কিছুই জানাতে পারেনি। পুলিশ জানিয়েছে, এ ৫ ব্যক্তির মধ্যে টঙ্গির আল আমিন নামের একজন ভারতীয় দূতাবাসের ভিসা সংক্রান্ত কাজে জড়িত বলেও তিনি দাবি করেছেন।

সোমবার রাতের পুলিশী অভিযানে ৫ বিদেশিসহ আটক ২৬ জনের মধ্যে অপর ১০ জনকে সোমবার রাতেই ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। সাজা প্রাপ্তদের ৭ জনই রোহিঙ্গা এবং অপর ৩ জন স্থানীয় বাসিন্দা।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বহু সংখ্যক দেশি –বিদেশি নাগরিক গোপনে রোহিঙ্গা শিবিরে এবং শিবির ও সীমান্তবর্তী এলাকায় কাজ করছেন। এসবের মধ্যে ‘মোয়াস’ নামের একটি এনজিও রয়েছে। ইতালীয় নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক এই এনজিওটি রোহিঙ্গা ইস্যুতে কাজ করার অনুমতি পাযনি এনজিও ব্যুরো থেকে। তবুও টেকনাফ উপকুলের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকায় মোয়াস হাসাপাতাল নামের একটি চিকিৎসা কেন্দ্র খুলে কাজ করছে। এনজিওটি ইনানী সেকত তীরে মাসিক ৩ লক্ষাধিক টাকায় একটি রিসোর্ট ভাড়া নিয়েছে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বিষযে জানান, তিনি বিষয়টি দেখছেন।  


মন্তব্য