kalerkantho


রোহিঙ্গা সংকট

খালেদা কি কখনো দেশে ফিরতে পারবেন?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৯:২৪



খালেদা কি কখনো দেশে ফিরতে পারবেন?

'সেনাবাহিনী আমাদের ধর্ষণ করেছে, আমার বাচ্চাকে নিয়ে গিয়ে জবাই করেছে, বাবা-মাকে গুলি করে মেরেছে,' সাহস করে এক নিঃশ্বাসে বলেছেন খালেদা। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন এই রোহিঙ্গা শরণার্থী।

 

কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে কোথাও দাঁড়ালেই জটলা সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকদের ক্যামেরা, ট্রাইপড দেখলেই সেখানকার বাসিন্দারা আন্দাজ করে নেন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

এই জটলার বড় অসুবিধা হচ্ছে ছবি বা ভিডিও ঠিকভাবে করা যায় না। আবার কাউকে সরে যেতে বললে তিনি মোলায়েম হাসি দিয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনুভূতি বোঝাও মাঝে মাঝে একটু কষ্টকর। এক শরণার্থীকে যখন জিজ্ঞাসা করলাম আপনার বাবামা কোথায়, তিনি হাসতে হাসতে জানালেন তাদের মেরে ফেলেছে মগরা (উগ্রপন্থী বৌদ্ধ)।

সেই শরণার্থীর হাসি নিয়ে ভেবেছি অনেকক্ষণ। সম্ভবত ক্যামেরার সামনে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ হাসি চলে এসেছিল তাঁর, কিংবা এখন আর ভালোমন্দের অনুভূতি কাজ করছে না চরম আতঙ্ক পেরিয়ে আসা মানুষটির।

খালেদার সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা ভিন্ন।

কুতুপালং ক্যাম্পে হঠাৎ করে দেখা হয়ে যায় তাঁর সঙ্গে। নাম জিজ্ঞাসা করতেই কেঁদে ফেলেন তিনি। তারপর একটু সময় নিয়ে বলে যান তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো। অল্পসময়ের ব্যবধানে নিজের সম্ভ্রম, সন্তান এবং বাবা-মাকে খুইয়েছেন তিনি। ১০ দিন ধরে পালিয়ে পালিয়ে কোনোক্রমে বাংলাদেশে পৌঁছেছেন এই নারী।

খালেদা আর ফিরে যেতে চান না সেই নরকে। চোখের সামনে মৃত্যু দেখে আসা এই নারী এখন থাকেন আরো আটজন মানুষের সঙ্গে ছোট এক তাঁবুতে। খাবার মেলে না নিয়মিত। তবুও আর ফিরবেন না তিনি।

কুতুপালং ক্যাম্পে খালেদার মতো নির্যাতনের শিকার মানুষ আরো আছেন। তবে ধর্ষিত হওয়ার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে চান না অনেকেই। কিন্তু খালেদা করেছেন, তিনি তাঁর বাবা-মায়ের হত্যাকারীর, তাঁর সন্তানকে জবাইকারীর, তাঁর ইজ্জত লুটেরাদের বিচার চান মানুষের কাছে, সাংবাদিকদের কাছে।

তবে বাস্তবতা যে বড় নির্মম। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাওয়া, পরা আর চিকিৎসার জোগান দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যতটা তৎপর, যাদের কারণে তাদের এই দশা, সেই মিয়ানমার সরকার আর সেনাবাহিনী সম্পর্কে ততটাই নীরব।

কুতুপালং ক্যাম্পে তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। সাংবাদিক, বিদেশিদের রাতের বেলা ক্যাম্পে থাকা বারণ। তাই ফিরে আসার যখন প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন দেখা হলো মোহাম্মদ ইলিয়াসের সঙ্গে। সাত বছর আগে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তিনি। ইতেিমধ্যে ভাষাও কিছুটা রপ্ত করে ফেলেছেন। কিন্তু সারাদিন করার মতো কোনো কাজ নেই তাঁর। বিদেশি সংস্থার দেওয়া ত্রাণে পেট চলে যায় ঠিকই তবে নগদ টাকা মেলে না। আগে শিবিরের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারতেন, এখন তাও পারেন না কেননা নিরাপত্তা বেড়ে গেছে। ইলিয়াস জানালেন, দেশে ফিরে যেতে চান, তবে নিজের দেশে গিয়ে শরণার্থী হিসেবে থাকতে নয়। শুধুমাত্র তখনই যাবেন যখন মিয়ানমার সরকার তাদের রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নাগরিকত্ব দেবে।

ইলিয়াসের কথায় গলা মিলিয়েছেন আরো কয়েকজন শরণার্থী। তাদেরও দাবি, নাগরিকত্ব ছাড়া মিয়ানমারে ফিরবেন না তারা। বাংলাদেশে হয়তো লেখাপাড়া বা কাজের সুযোগ নেই, থাকতে হয় মানবেতর পরিবেশে, নোংরা নালার পাশে। কিন্তু জীবন তো নিরাপদ। নিজের দেশে যে সবচেয়ে অনিরাপদ তারা!

ডিডাব্লিউ'র প্রতিবেদন


মন্তব্য