kalerkantho


সুযোগই আমার কাছে এসেছে

‘সেরাকণ্ঠ’ প্রতিযোগিতার চলতি আসরের প্রধান চার বিচারকের একজন মিতালী মুখার্জি। বাংলাদেশ থেকে নতুন গানের কাজ করছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন রবিউল ইসলাম জীবন। ছবি তুলেছেন মোহসীন আহমেদ

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সুযোগই আমার কাছে এসেছে

‘সেরাকণ্ঠ’ প্রতিযোগীদের কেমন দেখলেন?

এই প্রথম সেরাকণ্ঠে আসা। এর আগে জি-বাংলার ‘সারেগামাপা’র বিচারকাজ করেছি। মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশের আপকামিং শিল্পীদের জন্য একটা গ্রুমিংয়ের দরকার। সেরাকণ্ঠে এসে যে গ্রুমিং দেখলাম তা অনেক প্রশংসনীয়। প্রত্যেক প্রতিযোগীর মধ্যে দারুণ পটেনশিয়ালিটি আছে। গয়না করতে গেলে সোনাকে যেমন আগুনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, ঠিক তেমনি করে তাদের এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। সবার মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে তা অনবদ্য। এ জন্য চ্যানেল আই এবং ‘সেরাকণ্ঠ’র পরিচালক ইজাজ খান স্বপনকে ধন্যবাদ দিতে চাই।

সত্যিকারের শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে এ ধরনের প্রতিযোগিতা কতটা ভূমিকা রাখে?

অনেকখানি। আমরা যখন গান করতাম তখন এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম ছিল না। আজকে যেমন দেশ-বিদেশের সবাই এই প্রতিযোগীদের চিনছে। তবে দায়িত্ব শুধু প্রতিযোগিতা আর চ্যানেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। পরের জার্নিটায় নিজেদের সংযত রাখা, কাউন্সেলিং, কোথায় যেতে হবে, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে—এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল দুনিয়াটা এত বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে গেছে—সমালোচনা, নিন্দা শুনেই শক্তিশালী হয়ে সামনে যেতে হবে।

শুনেছি বাংলাদেশ থেকে নতুন গান করছেন?

কিছু রেকর্ডিংয়ের কাজ আসছে, করছিও। নতুন কয়েকজন রাইটার খুব ভালো লিখছেন। সুরও দিচ্ছেন অনেকে। খুব ভালো লাগছে, তাঁরা এত সুন্দর সুর করছেন, কথা লিখছেন। এটা খুব আশার কথা বাংলা গানের জন্য। কাজগুলো শেষ হলে তবেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব।

শোও তো করেছেন—

গুলশান ক্লাবে গেছি। আরো কিছু জায়গায় করেছি। সবাই আমাকে মনে রাখছে, আমার গান শুনছে দেখেই ভালো লাগে।

গত অক্টোবরে মুম্বাই থেকে ‘দিল ফির হে’ শিরোনামে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন।

অ্যালবামটির জন্য ভালো রেসপন্স পেয়েছিলাম। টাইটেল গানটি গুলজার সাহেব লিখেছেন। সংগীতায়োজন করেছেন আমার স্বামী। ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই গান। দুটি গুজরাটি মেয়ে আর সনু নিগমও আমার সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছে। ভিডিওটি সবাই পছন্দ করেছে। 

গানের বাইরে সারা দিন কী করেন?

সিনেমা দেখি। বাড়িতে ছোট ছোট গাছপালা আছে। এগুলো ভালোবাসি, গান শুনি। বন্ধু সার্কেল আছে। তাদের সঙ্গে দেখা করি, আড্ডা দিই।

১৯৮০ সাল থেকে গান করছেন। ক্যারিয়ারের তিন যুগের বেশি সময় পার করে ফেলেছেন।

আমি খুবই ভাগ্যবান একজন গায়িকা। আমাকে সুযোগ খুঁজতে যেতে হয়নি। সুযোগই আমার কাছে এসেছে। ঈশ্বর আমাকে দিয়েছেন। টিভিতে গান করলাম, তারপর সিনেমায় সুযোগ এলো। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলাম। সব শিল্পীর জীবনে একটা গোল্ডেন সময় থাকে, সেটা ঈশ্বর আমাকে দিয়েছেন। এখনো গেয়ে যাচ্ছি। মনেই হচ্ছে না যে ৩৭-৩৮ বছর হয়ে গেছে। আরো অনেক কিছু শেখার আছে, অনেক কিছু করার আছে।

নিজের গানের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় কোনটি? সেই গানটি তৈরির গল্প শুনতে চাই।

এটা খুব কঠিন প্রশ্ন। জীবনে কত গান গেয়েছি! একটার কথা বলা খুব মুশকিল। ‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই’—গানটির সুর আমার খুব প্রিয়। গানটির জন্য মানুষের অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। অথচ গানটি আমার করার কথা ছিল না। আটটি গান করার কথা ছিল বিটিভির সেই অনুষ্ঠানে। পরে আরো দুটি বাড়ানো হয়। এর মধ্যে একটি এটি। তখন মুসা ভাই বিটিভির ডিরেক্টর। সাবিনা আপার ‘কেউ কোনো দিন আমারে তো কথা দিল না’ চারদিকে খুব জনপ্রিয়। আলাউদ্দিন ভাই যখনই আমাকে রিহার্সেলে বসাতেন, আমি সেই গানটি গাইতাম। আলাউদ্দিন ভাই বলতেন, গানটি এত গাইছি কেন? আমি তখন আবদারের মতো করে বলতাম, ‘যতক্ষণ না আমাকে এমন একটি গান করে দেবেন, এটা গাইতেই থাকব।’ তিনি হাসতেন। শেষ দিন গানটি করে নিয়ে এলেন। আমার বাবাও সঙ্গে ছিলেন। রেকর্ডিং হয়েছিল সন্ধ্যায়। এরপর রেকর্ডিংটা নিয়ে আমরা টিভি স্টেশনে গিয়েছি চিত্রায়ণের জন্য। বিটিভিতে পৌঁছেছি রাত ১০টার দিকে। সময়স্বল্পতার কারণে মুসা ভাই বারবার রেগে যাচ্ছিলেন। বলছিলেন এটা বাদ দাও। থাক ৯টাই করি। শেষতক গানটি বাজার সময় মুসা ভাই সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেম। শুনেই কাছে এসে বললেন, ‘আলাউদ্দিন তুই এটা কী করলি।’ কথাটি বলতে বলতে কেঁদে দিলেন। গানটির অনেক প্রশংসা করেছিলেন তিনি। ‘মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই’ লাইনটির সঙ্গে উপস্থিত সবাই যেন একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন।

স্মরণীয় ঘটনা—

২০০০ সালে টরন্টোর এক অনুষ্ঠানের শেষ গান হিসেবে একটি গজল করি—‘শাম্মা জালায়ে রাখনা জাব তাক কে ম্যায় না হো’। গাওয়ার পর একটি কাপল আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমার হাত ধরে কেঁদে ফেললেন দুজন। তারপর বললেন, ‘জানেন মিতালী, ডিভোর্স হওয়ার জন্য আমরা কোর্টে ফাইল পাঠিয়েছি। আমাদের ছয় মাসের একটা সময় দেওয়া হয়েছে ভাবার জন্য। কিন্তু আজকের অনুষ্ঠানে আপনার এই গানটি শোনার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা আলাদা হব না।’ এই অনুভূতির কথা সারা জীবন মনে থাকবে।

সংগীতজীবনে কোনো আক্ষেপ—

শিল্পীরা সব সময় ইনকমপ্লিট। যতই কাজ করি না কেন মনে হয় আরো করা উচিত। এই আরোর তৃষ্ণাটাই মনে হয় শিল্পীমনের সত্তায় থেকে যায়। এখনো অনেক গান নিয়ে ভাবি। এই ভাবনার শেষ নেই।
 


মন্তব্য