kalerkantho


স্ম র ণ

‘ভাই, আপনি যা বলেছিলেন তা-ই হয়েছে’

তাঁর হাত ধরেই বেতারে প্রথম গান করেছিলেন শাম্মী আক্তার। তাঁর করা গান গেয়েই পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সদ্যঃপ্রয়াত গায়িকা শাম্মী আক্তারকে স্মরণ করেছেন শেখ সাদী খান

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘ভাই, আপনি যা বলেছিলেন তা-ই হয়েছে’

শাম্মী আক্তার, জন্ম ১৯৫৭, মৃত্যু ২০১৮

১৯৭৬ সালের কথা। শাম্মী তখন খুলনা থেকে মাত্র ঢাকায় এসেছে। বাংলাদেশ বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস থেকে আমাকে বলা হলো বাইরে থেকে ওঠে আসা উঠতি শিল্পীদের জন্য কিছু গান করতে। তখনই আমার সুরে প্রথমবারের মতো বেতারে গান করে শাম্মী। গানটি হলো—‘আমার এ মন বুঝি মন নয়’। লিখেছিলেন মুন্শী ওয়াদুদ। এরপর বেতারে আমার সুরে আরো বেশ কিছু গানে কণ্ঠ দেয় ও। আমার সুরে তার গাওয়া গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘আমি বৃষ্টিতে ভেজা রজনীগন্ধা নাকি’, ‘ভালোবাসলেই সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না’, ‘মনে হয় হাজার বছর দেখি না তোমায়’, ‘নোলক হারালে’, ‘যদি মনটা একটা ছোট্ট নদীর মতো হতো’ প্রভৃতি। এই গানগুলোই শাম্মীকে শিল্পী হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। তবে শাম্মী প্রথম প্লেব্যাক করে সত্য সাহার সুরে ‘অশিক্ষিত’ ছবিতে। সেই ছবির ‘ঢাকা শহর আইসা আমার’ এবং ‘আমি যেমন আছি তেমন রবো’ গান দুটি দারুণভাবে শ্রোতার মন জয় করে। তারপর চারদিকে আরো ছড়াতে থাকে তার নাম।

আশির দশকে আমার সুরে প্লেব্যাক করে ‘কলমীলতা’ ছবিতে। শহীদুল হক খানের লেখা সেই গানের শিরোনাম ‘লেখাপড়া করলে গুরুজনকে মানলে’। আরো দু-তিনটি ছবিতে তার জন্য গান করি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের কয়েকটি গানেও আমার সুরে কণ্ঠ দিয়েছে।

আমাকে সাদী ভাই বলে ডাকত। সম্মানও করত ভাইয়ের মতোই। মানুষ হিসেবে খুবই ভালো মনের ছিল। অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করত। যত্ন দিয়ে প্রতিটি গান গাওয়ার চেষ্টা করত। কখনোই কারো সাতেপাঁচে থাকত না। গান করে অনেক কিছু করে ফেলবে, বিরাট কিছু হয়ে যাবে—এ ধরনের লোভ তার মধ্যে কখনোই ছিল না। গান ভালোবাসত, গান গাইত। যে-ই ডাকতেন তাঁর সঙ্গেই গান করত।

আমার সঙ্গে সব সময়ই যোগাযোগ ছিল। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর তার কাছে যেতে খুব কষ্ট হতো। ছোট বোনের মতো দেখতাম বলে খুব খারাপ লাগত। যখনই বাসায় যেতাম খুব আগ্রহ দেখাত। খুব ভালো একটা মানুষ ছিল।

২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না’ ছবির জন্য যখন আবার ‘ভালোবাসলেই সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না’ গানটি গাওয়ার কথা হচ্ছিল আমাকে বলেছিল, ‘সাদী ভাই, এত বছর পর গানটি কি ঠিকমতো গাইতে পারব।’ বলেছিলাম, ‘পারবি, আমি গাওয়াব।’ গাওয়ানোর পর বললাম, ‘দেখ, আমি তোর জীবনের শেষ সময়ে এই গানটি আবার করে দিলাম। আশা করি গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবি।’ শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে। পুরস্কার পাওয়ার পর প্রথমেই আমাকে টেলিফোন করে, ‘ভাই আপনি যা বলেছিলেন তাই হয়েছে। আপনার জন্যই আমি পুরস্কারটি পেয়েছি।’ পুরস্কারটি নিয়ে অত্যন্ত খুশি ছিল। সব চ্যানেলে গিয়ে বলত, সাদী ভাইয়ের জন্যই পুরস্কারটি পেয়েছি। নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে সম্মান করত। ফোনে কথা হলে আমাকে প্রায়ই বলত, ‘ভাই, আপনার জন্য আমরা প্রার্থনা করি। আপনি দীর্ঘজীবী হোন।’ আজ সে নিজেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এটা মানতেই খুব কষ্ট হচ্ছে। পরপারে সে শান্তিতে থাকুক—এটাই কামনা করি।’


মন্তব্য