kalerkantho


চলচ্চিত্র বিচার: চিন্তালোকে দ্যোতনা জাগায়

লেখক, সুফল কুমার রায়   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০৪:৩০



চলচ্চিত্র বিচার: চিন্তালোকে দ্যোতনা জাগায়

ছবি : কালের কণ্ঠ

১৯৭১ সালে বিজয় অর্জনের পর কয়েক দশকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনই শুধু হয়নি, হয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তনও। অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতটা সম্ভব হয়েছে, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন তার কাছাকাছিও যেতে পারেনি।

একই রকম চিত্র দেখা যায় চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও। তারপরও চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের দেশে লেখালেখি হচ্ছে। আর এই লেখকদের অনেকের রচনাই আমাদের আশান্বিত করে তুলছে।

বিধান রিবেরু এমনই একজন চলচ্চিত্র বোদ্ধা ও বিশ্লেষক যিনি চলচ্চিত্রের অতীত, বর্তমান প্রসঙ্গ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেছেন এবং বিভিন্নভাবে লেখালেখির মাধ্যমে মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে খুব বেশি বই নেই। চলচ্চিত্রের আলোচনা বা সমালোচনাও সে অর্থে কম। যারা এ পর্যন্ত চলচ্চিত্র নিয়ে ভেবেছেন তাঁদের মধ্যে বিধান রিবেরু অন্যতম।  

তাঁর চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রথম প্রকাশিত বই চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা। যেখানে তিনি চিহ্নবিদ্যা, রিপ্রেজেনটেশন, মনোবিশ্লেষণ, হেজিমেনি, ডিসকোর্স কেন্দ্রিক ক্ষমতা ইত্যাদি জ্ঞানতাত্ত্বিক বিষয়ের মাধ্যমে পাঠ করার প্রয়াস পেয়েছেন।

এছাড়া তিনি আরো অনেক প্রবন্ধ সংকলন ও রচনা করেছেন; তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের বইয়ের মধ্যে রয়েছে  ‘বিবিধ অভাব: লিওনার্দো লালন লাঁকা’ (২০১৫), ‘শাহবাগ: রাজনীতি, ধর্ম, চেতনা’ (২০১৪), ‘অনুভূতিতে আঘাতের রাজনীতি ও অন্যান্য’ (২০১৭), ‘বলিউড বাহাস’ (২০১৫), ‘চলচ্চিত্র বিচার’ (২০১৪) প্রভৃতি।

‘চলচ্চিত্র বিচার’ বইটি বর্তমান চলচ্চিত্রের সমস্যা ও সমাধান কী হতে পারে তা নিয়ে রচিত। স্বল্প পরিসরে খুব তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন এই প্রাবন্ধিক। সর্বমোট চারটি অধ্যায় তথা প্রেক্ষাপট নিয়ে ২৪ টি প্রবন্ধ রচনা করেছেন তিনি। চারটি বিষয় হিসেবে তিনি প্রথম যেটি দাঁড় করিয়েছেন সেটা হলো মুক্তিযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বিচার; পর্যায়ক্রমে রয়েছে— বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিচার, বিদেশী চলচ্চিত্র বিচার ও সংস্কৃতি কারখানা বিচার। এর মধ্যে ‘চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ প্রবন্ধদ্বয় চিন্তার উদ্রেককারী এবং এগুলোর গুরুত্ব বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ভাবনার জায়গাকে প্রসারিত করে। এছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বাকি যে লেখাগুলো আছে, সেগুলো মূলত নারীচিন্তা এবং রাজনৈতিক আখ্যানে প্রতীকায়িত।

নারী কেন্দ্রিক প্রবন্ধগুলির মধ্যে ‘মেহেরজান: যুদ্ধ ও হিংস্রতার বিরুদ্ধে নান্দনিক ব্যবস্থাপত্র’ প্রবন্ধে বিধান রিবেরু যেভাবে সমালোচনা করেছেন, তা সত্যিই প্রাসঙ্গিক। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে গৌণ বিষয় আর পাকিস্তানী সেনার সাথে মেহেরজানের প্রণয় হয়েছে মূখ্য বিষয়। যা পাকিস্তান প্রীতিরই আরেক নমুনা।  

‘স্বাধীনতার চল্লিশতম বর্ষে তিন নারী: মেহেরজান, অরুও বিলকিস’ প্রবন্ধে প্রবন্ধকার চলচ্চিত্রে নারীদের উপস্থাপনা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক এবং লালসানির্ভর বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি এটাও উপলব্ধি করেছেন যে, ‘মেহেরজান’ ছবিতে নতুন করে দুই দেশের সম্পর্ক নির্ণয় করা নিরর্থক। লেখক বলছেন, 'রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের তেমন বৈরী সম্পর্ক এখন নেই বললেই চলে। তাহলে হঠাৎ করে কেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে ‘গন্ডগোল’ সাব্যস্থ করে মিটমাট করে ফেলার ইঙ্গিত?'

ভিন্ন প্রবন্ধে চলচ্চিত্রের দিন দিন জনপ্রিয়তা হারানোর প্রধান কারণ হিসেবে লেখক চিহ্নিত করেছেন দুটি বিষয়কে— এক. চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য যেখানে শিল্পের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই। দুই. চলচ্চিত্রের মৌলিক ব্যাকারণ না মেনে চলচ্চিত্র নির্মাণ। লেখক সঠিকভাবেই এই দুটি পয়েন্টকে যথাযথভাবে চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করেছেন ‘চলচ্চিত্র বিচার’ বইয়ের বিভিন্ন প্রবন্ধে।

অন্যদিকে, ‘হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে: নতুন কি বলেছেন’ প্রবন্ধের মধ্যে ভাবনাকে উসকে দেওয়ার মতই কিছু কথা রয়েছে। সেখানে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন মৌলবিও অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছে, যেটা হুমায়ূনের ছবি ‘শ্যামল ছায়া’তে উঠে এসেছে। বিধান রিবেরুর এই অনুসন্ধান নতুন করে ভাবতে শেখায়, চলচ্চিত্র আলোচনায় নতুন পথ প্রদর্শন করে।

সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক এমনকি আইজেনস্টাইনও বাদ পড়েনি তাঁর আলোচনা থেকে। বিনির্মাণের প্রসঙ্গ এনেছেন প্রবন্ধের মধ্যে। গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্রে লালনের সাথে নারীর যে সঙ্গ, সে বিষয়েও কঠোর সমালোচনা করেছেন লেখক।

সবশেষে বিধান রিবেরু ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং পণ্যসামগ্রীর আগ্রাসনকে আলোচনায় এনেছেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ভারতীয় পণ্যেরও যেন এক শপিং মল তৈরি হচ্ছে এদেশে। আর দেশীয় চলচ্চিত্রের সাথে পণ্যেরও কদর বাড়তে শুরু করেছে ভোক্তার কাছে। এই বাজার দখলের চিত্রটি লেখক দেখিয়েছেন একটি তাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতর থেকে।

২০১৪ সালে কথা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত বিধান রিবেরুর এই ‘চলচ্চিত্র বিচার’ বইটি একজন বোদ্ধা পাঠকের কাছে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বা এরইমধ্যে করেছে। প্রয়োজনীয় তথ্য এবং নির্ঘণ্ট প্রদান সাপেক্ষে বইটির ইতি টেনেছেন তিনি। ফলে পাঠক খুব সহজেই বইয়ের তথ্যসূত্র যাচাই করে নিতে পারবেন। বর্তমান বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চলচ্চিত্রের যে চালচিত্র প্রতিনিয়ত আমরা দেখতে পাই সেটারই একটি নাতিদীর্ঘ কিন্তু তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ বিধান রিবেরুর ‘চলচ্চিত্র বিচার’ বইটিতে উপস্থিত। এই বই চিন্তালোকে দ্যোতনা সৃষ্টি করতে সক্ষম।

লেখক : সুফল কুমার রায়


মন্তব্য