kalerkantho


প্রকৃতি সাধক ও সাহিত্যবিদ দ্বিজেন শর্মা

নিখিলেশ ঘোষ   

২৬ অক্টোবর, ২০১৭ ২৩:০৪



প্রকৃতি সাধক ও সাহিত্যবিদ দ্বিজেন শর্মা

ছবি : প্রয়াত ডিজেন শর্মা

প্রকৃতির পুত্র নামে খ্যাত দ্বিজেন শর্মা প্রকৃতির সাথেই মিশে গেলেন ৮৮ বছর বয়সে। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ প্রকৃতিবিদ ও বিজ্ঞান লেখক অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা ফুসফুসে সংক্রমিত হয়ে শুক্রবার ভোর পৌঁনে ৪টার দিনি রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নি:শ্বাসত্যাগ করেন।

১৯৬৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত নটর ডেম কলেজে অধ্যাপনা করে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে অনুবাদকের কাজ নিয়ে দিশ ত্যাগ করেন। কর্মজীবনের এই দশ (১০ বছর) দ্বিজেন শর্মা নটর ডেম কলেজ ক্যাম্পাসের নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রচুর গাছ লাগানোর বিশেষ ভূমিকা অবলম্বন করেন।

২৯মে ১৯২৯ সালে মৌলভী বাজার জেলার শিমুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন দ্বিজেন শর্মা। পিতা চন্দ্রকান্ত শর্মা এবং মাতা মগ্নময়ী দেবী। একাধারে নিসর্গবিদ, বৃক্ষ প্রেমিক, অনুবাদক, শিশু সাহিত্যিক, বিজ্ঞান লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ দ্বিজেন শর্মা (১৯২৯-২০১৭) অসামান্য, তুলনারহিত একজন প্রকৃতিসাধক। প্রকৃতির কোলে জীবনকে বিকশিত করেছেন এবং প্রকৃতি বন্দনায় নিরবচ্ছিন্ন থেকে মৃত্যুবরণ করেন গত ১৫ সেপ্টেম্বর। প্রকৃতির ভুবনে পরিব্রাজক ছিলেন দ্বিজেন শর্মা। ফলে, তাঁকে সহজেই চিহ্নিত করা যায় তিনি কে এবং কী কাজ করেছেন।  

তাঁকে বিভিন্ন অভিধায় বিশেষায়িত করা হয়েছে।

যেমন: প্রকৃতিপুত্র, নিসর্গবান্ধব, নিসর্গসখা ইত্যাদি। প্রকৃতি-পরিবেশ আর শুভবোধ নিয়ে তিনি লেখালেখি করেছেন ও কথা বলেছেন সারাজীবন। নাগরিক পরিবেশে অধিবাস সত্ত্বেও মনে-মননে নিসর্গ ধারণ, তাঁর বেড়ে ওঠা ও কর্মপরিধির বিস্তার। তিনি লেখাপড়া করেছেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়লেখা পিসি হাইস্কুল ও করিমগঞ্জ (অসম) পাবলিক হাইস্কুল, আগরতলা মহারাজা বীরবিক্রম কলেজ, কলকাতা সিটি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ থেকে বোঝা যায় তাঁর মানস গঠন ও পরভ্রমণের ভিত্তি। শিক্ষকতা করেছেন বরিশাল বিএম কলেজ ও ঢাকার নটর ডেম কলেজে। ১৯৭৪ সালে মস্কোর প্রগতি প্রকাশনে অনুবাদক হিসেবে যোগদান করেন। এর বাইরে তাঁর লেখালেখির পরিধি উল্লেখযোগ্য ও বৈচিত্র্যময়।
 
তাঁর রচনাপঞ্জি হলো: শ্যামলী নিসর্গ (১৯৮০), সপুষ্পক উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস (১৯৮০), ফুলগুলো যেন কথা (১৯৮৮), মমদু:খের সাধন (১৯৯৪), গহন কোন বনের ধারে (১৯৯৪), চার্লস ডারউইন ও প্রজাতির উৎপাত্ত (১৯৯৭), সমাজতন্ত্রে বসবাস (১৯৯৯), গাছের কথা ফুলের কথা (১৯৯৯), সতীর্থ বলয়ে ডারউইন (১৯৯৯), ডারউইন : বিগলযাত্রীর ভ্রমণকথা (১৯৯৯), নিসর্গ, নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা (২০০০), জীবনের শেষ নেই (২০০০), বাংলার বৃক্ষ (২০০১), বিজ্ঞান ও শিক্ষা : দায়বদ্ধতা নিরিখ (২০০৩), হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ডাল্টন হুকার (২০০৪), এমি নামের দুরন্ত মেয়েটি (২০০৫), কুরচি তোমার লাগি (২০০৭), আমার একাত্তর ও অন্যান্য (২০০৮), প্রকৃতিমঙ্গল (২০০৯), প্রকৃতিসমগ্র ১ (২০১৩), প্রকৃতিসমগ্র ২ (২০১৩), প্রকৃতিসমগ্র ৩ (২০১৫), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৪), চার্লস ডারউইন : দ্বিশতজন্মবার্ষিকী শ্রদ্ধার্ঘ্য (২০১৪), গাছ (২০১৫)।  

সম্পাদনা ও অনুবাদ করেছেন পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থ ও পুস্তিকা। এ ছাড়াও এশিয়াটিকে সোসাইটির বাংলাপিডিয়ার সম্পাদক এবং উদ্ভিদ ও প্রাণি জ্ঞানকোষ প্রকল্পের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, একুশে পদকসহ ১৩টি পদক।

পারিবারিক পরিবেশেই তিনি গ্রন্থপাঠ ও প্রকৃতিপ্রেমে প্রভাবিত হয়েছিলেন। মা মগ্নময়ী ছিলেন একজন বোদ্ধা পাঠক। যিনি স্বল্পশিক্ষিত হয়েও রামায়ণ, মহাভারত এবং উপন্যাস পাঠ করতেন। তার কবি পিতা চন্দ্রকান্ত শর্মার হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির অংশবিশেষ দেখার সুযোগ হয়েছিল। এর অধিকাংশই একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পড়ে যায়। কবি চন্দ্রকান্ত শর্মার কয়েকটি কবিতা মীজানুর রহমান সম্পাদিত ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেই সময় তাঁর বাবা কলকাতা থেকে বিখ্যাত পত্রিকা ও বই সংগ্রহ করতেন। বাবার ব্যক্তিগত পাঠাগারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পাঠ করেছেন। তাঁর মনোজগত সাহিত্যের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। আমরা পরবর্তীতে তাঁর লেখায় এর স্বাক্ষর পেয়েছি।

আকর্ষণীয় বলা বাহুল্য যে, তাঁর দৃষ্টিতে প্রকৃতি ও সাহিত্যের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতি যেমন নির্মুখ, সাহিত্যও তেমনি। ফলত, তাঁর প্রকৃতি বন্দনায় অনুষঙ্গী হলো সাহিত্য। বৃক্ষসন্ধান ও শ্রেণীবিন্যাসতত্ত্বের আলোকে শ্যামলী নিসর্গে তিনি তুলে ধরেছেন আমাদের চেনা অথচ অজানা বিভিন্ন বৃক্ষ ও লতাগুল্মের পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য।  

বলা বাহুল্য যে, বাঙালী লেখকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জসীমউদ্দীন, বিভূতিভূষণ ও জীবনানন্দ দাশকে সবচেয়ে বেশি প্রকৃতিঘনিষ্ঠ লেখক হিসেবে তিনি শনাক্ত করেছেন। এ আলোকে তাঁর অসামান্য গবেষণা হলো- বিভূতিভূষণের গাছগাছালি : আরণ্যক (প্রকৃতিসমগ্র ২ : পৃ. ৯১) আরণ্যক উপন্যাসে উল্লিখিত বৃক্ষসমূহের বৈজ্ঞানিক পরিচিতিসহ তিনি একটি তালিকা ও বিবরণ দিয়েছেন। এর গুরুত্ব প্রসঙ্গে দ্বিজেন শর্মা বলেছেন, বিশ্বসব্যতায় দু-টি বিষয়-প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম অখণ্ড বাস্তবতা ও পরস্পর অবিচ্ছিন্ন।  

তাঁর এ লিখনরীতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃতি ও সাহিত্যের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। আর কোন করণে নয়, শুধু বিষয়কে পাঠ্যকের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এটা কৌশল মাত্র। কেননা, সাধারণ পাঠকের কাছে প্রকৃতি-পরিবেশের গুরুত্ব বোঝাতেই তাঁর এমন স্বতন্ত্র ভাষাশৈলী। বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রত্যয় ও ব্যাখ্যা নিছক বিজ্ঞানের ভাষায় বলে সাধারণের কাছে পৌঁছানো যাবে না।

তিনি পরিবেশ, রাজনীতি ও মানবকল্যাণের মধ্যে আন্ত:সম্পর্ক বিবেচনা করেন। তিনি মনে করেন, প্রকৃতিকে জয় ও নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষ। তবে প্রকৃতির উপাদানের মাধ্যমেই মানুষের বেঁচে থাকা। কিন্তু এ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ ভালবাসার সম্পর্ক তৈরি করেনি। তা হয়ে উঠেছে সাংঘর্ষিক। টেকসহ উন্নয়নের প্রচার করা হচ্ছে।  

আমরা সকলেই জানি যে, জনসংখ্যার বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও পুঁজির অবাধ প্রবাহে পরিবেশ ও প্রকৃতির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। শিল্পায়ন ও মানব অস্তিত্বের কল্যাণ কিভাবে হতে পারে-এ সম্পর্কে দ্বিজেন শর্মার কথার-সারার্থ হলো: শিল্পায়নে মানুষের অস্থিরতা থামানো যাবে না। শিল্পায়ন বন্ধ হলে দুনিয়া অচল হয়ে যাবে। উন্নয়নের পূর্বশর্তই হলো শিল্পায়ন। এক্ষেত্রে অপরিকল্পিত এ উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে।  

তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সভ্যতা মানুষকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে খাঁচায় বন্দী করে রেখেছে এবং তিনটি বিষয়-Space, Light, Window থেকে বঞ্চিত করেছে। ’ এবং ‘বন মানুষ সৃষ্টি করে না কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ করে। বন মহাকালের সৃষ্টি ও পৃকৃতির দান। মানুষের যে কোনো হস্তক্ষেপ তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।  

দ্বিজেন শর্মা তাঁর উদ্ভিদ উদ্যান ঐতিহ্য প্রবন্ধে হারিয়ে যাওয়া ঢাকার স্মৃতি উল্লেখ করে দুঃখের সঙ্গে বলেন, শহরের আকাশচুম্বী প্রাসাদ, উজ্জ্বল রং ও কর্কশ শব্দপুঞ্জ, মানুষের ভিড়, দ্রুতগতি, কৃত্রিম আলো, নিয়ন্ত্রিত উত্তাপ ইত্যাদি অজস্র ভালমন্দের ভিড়ে স্বাচ্ছন্দ্য ও হতাশায় দোদুল্যমান আজ মানুষের ত্রিশঙ্কু অস্তিত্ব। প্রকৃতির ওপর বিজয় অর্জনের গৌরব সর্বস্তরের মানুষকে কতদুর স্পর্শ করেছে বলা কঠিন। কিন্তু স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে আত্যন্তিক কৃত্রিমতার ভিড়ে এসে অতীত অপেক্ষা সে কম অসহায় নয়।  

নিসর্গের মতোই সরল ও নির্জন জীবন যাপন করেছেন তিনি। মফিদুল হক মূল্যায়ণ করেছেন যেভাবে, তাঁর অবলম্বন হৃদয় ও মনন, মননের চর্চায় তার পরিবর্তনময়তার বিরাম নেই, আর হৃদয়বৃত্তিতে তিনি সর্বত্র সতত অপরিবর্তনীয়, একইভাবে উদার ও ভালবাসায় আপ্লুত। তাই তো দ্বিজেন শর্মা থাকতে পারেন বৃক্ষসম চিরসবুজ। ’ আমরা মনে করি তিনি আপন বৈশিষ্ট্যে ও মহিমায় সমুউজ্জ্বল।

 

লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক


মন্তব্য