kalerkantho


নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক সত্তা পপের পরশে প্রাণিত

মেহেদী উল্লাহ    

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১২:৫২



নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক সত্তা পপের পরশে প্রাণিত

ছবি: মেহেদী উল্লাহ

আশির দশকের শেষভাগেই মিশ্র বা সামগ্রিক সংস্কৃতির প্রবাহ আন্দাজ করা গিয়েছিল। সব কিছু মিলিয়ে এক সামগ্রিক কালচারের ঢেউ, বাংলাদেশে। আলাদা করে ট্রাডিশনাল, মডার্ন, ফোক ও পপ কালচার নয় বরং সংস্কৃতির এই চতুরঙ্গ মিলিয়ে এক অদ্ভুত সংমিশ্রিত সত্তার আগমন ঘটতে শুরু করেছিল।

মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংস্কৃতিবান মানুষের আচরণের এমন পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি বিষয় দায়ী থাকতে পারে। যেমন, বিশ্বায়নের প্রভাব, রাষ্ট্রিক পরিস্থিতি, ট্রাডিশনাল ও ফোক কালচারের বনিবনার মধ্যে মডার্ন কালচারের মিশ্রণ বা হতে পারে দ্বান্দ্বিক অবস্থান। এ ক্ষেত্রে বলে নেওয়া প্রয়োজন, ট্রাডিশনাল আর ক্লাসিক্যাল কালচারের সাধারণীকরণ হয়ে অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো ফোক কালচারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মডার্ন কালচার ও পপ কালচার ভিন্ন জিনিস।

আমরা জানি, মডার্ন কালচার ট্রাডিশনাল কালচারকে অস্বীকার করতে চায়। আর পপ কালচার সবকিছু থেকেই আলাদা। মডার্ন কালচারের গ্র্যান্ড ন্যারেশন ধারণার বাইরের একটি বিষয় পপ বা  পপুলার কালচার। এই চারটি মিলে সামগ্রিক কালচারের প্রভাবে এদেশের মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক সত্তার অবস্থা কেমন হয়েছিল তার উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে অন্নদাশঙ্কর রায়ের 'সংস্কৃতির বিবর্তন' বই থেকে। সেখানকার দৃষ্টান্তটি এ রকম: পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, হিন্দি সিনেমা দেখেন, কি বই পড়েন? ডিটেকটিভ নভেল।

এই প্রবণতাকে সংস্কৃতির সংকট না বলে বিবর্তনকালীন দশা বলাই যুক্তিসংগত। কারণ সব কালেই এই অঞ্চলে সংস্কৃতি এমন মিশ্র বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন সত্তা গঠন করে নিয়েছে।

নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মিশ্র ধারা প্রবহমান ছিল। একটা ভারসাম্যও বজায় ছিল। নাগরিক আবহে অনুষ্ঠিত একটি বিয়েতে এই ভারসাম্য টের পাওয়া যেত। গায়ে হলুদে বা বিয়ের দিন লোকাচারগুলো যেমন ছিল, তেমনি ছিল নানা আধুনিক অনুষঙ্গের উপস্থিতি। আসরে আনন্দের জন্য হিন্দি গান, আলোকসজ্জা ইত্যাদি। অবশ্য এর বহু আগেই গ্রামের বিয়েতে পালকির রেওয়াজ উঠে যায়। নৌপথের বদলে সড়কপথ প্রাধান্য পেতে শুরু করে।

এরপরই দেখা গেল পপ কালচারের আধিপত্য। অন্য কালচারগুলো বিরাজ করলেও মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিবান মানুষের সাংস্কৃতিক সত্তা গঠিত হতে থাকল মডার্ন ও পপ কালচারের মানদণ্ডে। এরপর নব্বই দশকের শেষভাগ থেকে একুশ শতকের শুরু পর্যন্ত  শিল্প-সাহিত্য, ফিল্মসহ অনেক কিছুতেই পপ কালচার যে প্রাধান্য পাবে তার বিবর্তন শুরু হয়। পরবর্তীকালে পপ কালচারের পরশেই সবকিছু যেন প্রাণিত।

ক্লাসিক্যাল যা হয়েছে হয়ে গেছে, নতুন আর হওয়ার নাই। ফোক (আমি একে এদেশীয় সংস্কৃতিই বলতে আগ্রহী) পরির্তনের মধ্য দিয়ে টিকে আছে। অনেক ক্ষেত্রে লুপ্ত হয়েছে। নানা ঔপনিবেশিক আর পাশ্চাত্য সংস্কৃতিই এখানে সংস্কৃতি হিসেবে সাহিত্য হিসেবে পরিচিত। নিজস্ব কালচার আজ ফোক কালচার, নিজস্ব সাহিত্য আঙ্গিকগুলোই লোক-আঙ্গিক, তাহলে আমাদের কালচার বা সাহিত্য কোনগুলো।

ইউরোপের ট্র্যাজেডিই এখানে নাটক আর পালা হচ্ছে লোকনাট্য। 'লোক' শব্দটির প্রয়োগ দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বোঝানো হচ্ছে প্রান্তিক, পল্লীর অশিক্ষিত মানুষকে। ছোটগল্প মেইনস্ট্রিম, কিন্তু ঠাকুরমার ঝুলি লোকগল্প! লোকগল্প বা কিচ্ছা গল্পের মর্যাদা পায়নি। নিজের দেশের নিজস্ব গল্পকেই আমরা বলছি লোকগল্প। আর এটি বলার মানে হলো, লোকগল্প নাগরিক মানুষের গল্প নয়। মহাকাব্যও অনেক মানুষ মিলে লিখেছে তাহলে তা লোকমহাকাব্য নয় কেন, অনেক মানুষ মৌখিকভাবে চর্চা করেছেন যুক্তিতে বলা হচ্ছে লোকসাহিত্য। বরং ভাগটি এভাবে হতে পারে, ব্যক্তিগত লিখিত সাহিত্য এবং সামষ্টিক মৌখিক সাহিত্যের লিখিত রূপ।

এবার আসি পপ কালচারে। কেন এই সময়ে নতুন প্রজন্ম পপ কালচারের পরশে প্রাণিত? অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতে, পপ কালচারের মূল্য অন্যত্র। একে সংস্কৃতি বলতেও তিনি নারাজ। তিনি সন্দেহ পোষণ করে বলেন, 'এর কিছুই বেশিদিন টেকে না।' মানে এর মূল্য সাময়িক।

পপ কালচার সবসময় জনপ্রিয় বিষয় নিয়ে কাজ করে। সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারার নাম আজ 'জনপ্রিয়ধারা'। আমরা দেখে আসছি 'জনপ্রিয়' উপাধিপ্রাপ্ত লেখক হুমায়ূন আহমেদের পাঠকের আশি ভাগ আজকের এই নতুন প্রজন্ম। এই বিতর্কও উঠছে, এই লেখকের প্রায় আশি ভাগ লেখা নাকি টিকবে না।  এ ছাড়া, এফডিসি ফিল্ম হচ্ছে কিন্তু আমরা দেখছি আর ভুলছি, একটিরও নাম মনে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বেশিরভাগ ছবি আর গান পপ কালচার ছাড়া কিছুই নয়।

মেলায় বই প্রকাশিত হয় হাজার হাজার। তার কয়টিই পরবর্তীকালে সাহিত্যে টিকছে? ফেসবুকে হাজার হাজার লাইক জুটছে, পড়ার আগেই জনপ্রিয় হচ্ছে শত শত বইয়ের নাম, সেগুলো নিয়ে এই অভিযোগও আছে, নাম নির্বাচনও নাকি করা হচ্ছে পপুলার ওয়েতে, নতুন প্রজন্ম পপুলার এই মিডিয়া ফেসবুক দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। আবার পরের বছর সেই ধরনের লেখা আর লেখককে ভুলেও যাচ্ছে। 'লাভ গুরু', 'ভূত এফএম' লাভের হিসাব ধরে রাখতে পারছে না। জনপ্রিয় হচ্ছে কিন্তু টিকছে কই? অনেকেই আজ ফেসবুক সেলিব্রেটি কিন্তু সমাজের নানা সংকটে তাঁদের দেখি না। ফেসবুকে লোক হাসিয়ে জনপ্রিয় হচ্ছেন বা যে ধরনের পোস্ট দিলে জনপ্রিয় হওয়া যাবে তাই করছেন নতুন প্রজন্ম।

ইউটিউবেও একই দশা। রাজত্ব করছে সেই কন্টেন্টগুলো যেগুলো পপুলার হয়েই আছে। হাসিয়ে মন পাওয়ার চেষ্টা। আমরা আবিষ্কার করছি নতুন নতুন 'হিরো আলম'। ভুলতেও দেরি নাই। জনপ্রিয় হচ্ছেন কিন্তু স্থায়ী প্রভাব নাই। শর্ট ফিল্ম বানানো হচ্ছে সস্তাদরের গল্পের। গতানুগতিক প্রেমের গল্পের। যেগুলো আমাদের সাহিত্যেও কেউ লেখেননি, অথচ সেই নিম্নমানের গল্পকে আটকানো হচ্ছে উঁচুদরের ফ্রেমে। এ কেবলই উন্নততর ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরার দৃষ্টির অপচয়।

এও দেখছি, অতিকায় প্রতিভা ফেসবুকে ফুরোচ্ছে। সমবয়সী কেউ জনপ্রিয় কায়দায় ফেসবুকে ফলোয়ার বাড়িয়ে পপুলার হচ্ছেন দেখে তিনি কি বসে থাকবেন! তাঁরও আছে কিবোর্ড! ফলে তিনিও দেখিয়ে দেন জনপ্রিয় হয়ে। পপ কালচার গঠিত এই হীনম্মন্যতা অনেক জনপ্রিয়করণ করে চলেছে কিন্তু কালের কাছে প্রিয়তা কি পাচ্ছে? একই তরুণ, ফেসবুকে স্ক্রল করতে গিয়ে দুই-তিন সেকেন্ডের ব্যবধানে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুটি বিষয়েই লাইক দিয়ে যাচ্ছে। আহ্বানে 'আমিন' লিখছে, একটু পরে আবার সানি লিওনের পেইজেও ঘুরে আসছে। কী তার আদর্শ! যে বিষয় নিয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়- তা নিয়েও দুই পক্ষ। কেউ রাস্তায় নারীকে যৌন হয়রানি করলে একপক্ষ প্রতিবাদ করলে অন্য পক্ষ বলছে, ঠিকই আছে, পর্দা না করার পরিণাম। ধর্ষণের বেলায়ও তাই! একদিন বলছে, ওমুকে সায়েন্স ফিকশন তো নকল। পরের দিন ঠিক কিনতে যাচ্ছে!

অথচ স্বাধীন দেশে 'যুদ্ধোত্তর মুক্তি'তে এই নতুন প্রজন্মের দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। আসছে দিনে ট্রাডিশনাল আর ফোক কালচারের সত্তায় গঠিত সংস্কৃতিবান আগের প্রজন্ম থাকবে না, যিনি মডার্ন কালচারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। থাকবে পপের পরশে প্রাণিত এই নতুন প্রজন্ম। অবস্থা এখনই অনুমান করা যাচ্ছে। ভয়াবহ। অন্য তিনটি কালচারকে বাদ দিয়ে শুধু পপ কালচার দিয়ে সব মানদণ্ড ঠিক করলে যে ফল আসবে তা স্থায়ী হবে না। এটি পপ কালচারের ধর্ম।

এমনিতে মডার্ন কালচারের সঙ্গে এই প্রজন্মের পরিচয় রয়েছে। হয়তো চর্চাতেও আছে, কিন্তু মননে পপ। ট্রাডিশনাল, ফোক ও মডার্ন কালচারের মূল্য না দিয়ে শুধু পপ কালচার দিয়ে বুঝলে জাতি মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। জনপ্রিয় সাময়িক, প্রিয় চিরদিনের। সংস্কৃতির চতুরঙ্গের সংমিশ্রণে আমাদের সাংস্কৃতিক সত্তা প্রবহমান থাকলে সেটাই বরং স্বাভাবিক চর্চা।


মন্তব্য