kalerkantho


কারাগারেও 'রাজার হালে' তুফান, কাশিমপুরে স্থানান্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

২০ আগস্ট, ২০১৭ ০৯:৩২



কারাগারেও 'রাজার হালে' তুফান, কাশিমপুরে স্থানান্তর

বগুড়ায় ছাত্রী ধর্ষণ ও মা-মেয়েকে ন্যাড়া করার ঘটনায় আলোচিত নারী নির্যাতন মামলায় বহিষ্কৃত শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকারকে বগুড়া থেকে কাশিমপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। জেলখানার মধ্যে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নেওয়া, মাদক সেবনসহ আরো নানা অভিযোগ ওঠায় কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে বগুড়া থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বগুড়া জেলখানার সুপার (তত্ত্বাবধায়ক) মোকাম্মেল হোসেন জানান, গতকাল শনিবার দুপুর দেড়টায় ছয় সদস্যের এক দল পুলিশ কড়া নিরাপত্তা দিয়ে তুফান সরকারকে একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসে করে কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যায়। এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আসামিরা বগুড়া জেলেই রয়েছে। এর আগে তুফানসহ অন্য আসামিরা টাকার বিনিময়ে বগুড়া জেলে রাজকীয় জীবন যাপন করছে বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকি মাদকাসক্ত তুফান জেলে বসেই ফেনসিডিল পাচ্ছে- এমন অভিযোগও শোনা যায়।

জানা যায়, এক সপ্তাহ ধরে দর্শনার্থী কক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলেছে তুফান ও তার পরিবারের সদস্যরা। তুফানসহ অন্য আসামিরা জেলের মেডিক্যালে থাকছে, বাড়ি থেকে দেওয়া খাবার খাচ্ছে।

বগুড়ার জেল সুপার মোকাম্মেল হোসেন তুফানের কাছে ফেনসিডিল পৌঁছে যাওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন। জেল সুপার মোকাম্মেল হোসেন বলেন, 'দর্শনার্থী কক্ষে পাইপ দিয়ে তুফানকে ফেনসিডিল খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ছাড়া প্রাচীরের বাইরে থেকে ফেনসিডিল ভেতরে নিক্ষেপ করা হলেও সেটা কার জন্য তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

' বগুড়া কারাগারের চারপাশে সিকিউরিটি ক্যামেরা থাকার পরেও এমন ঘটনা কী করে ঘটল, সেই তথ্য জানাতে পারেননি জেল সুপার।

সম্প্রতি বগুড়া জেল থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়া কয়েকজন হাজতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, জেলে আসার পর থেকেই তুফান, রুমকিসহ অন্য আসামিদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাদের জন্য কয়েকজন কারারক্ষী নিয়োগ করা হয়। প্রথম দুই-চার দিন তারা জেলের খাবার খেলেও পরবর্তী সময়ে বাড়ি থেকে পাঠানো খাবার খায়। জেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় তুফান সরকার ও অন্যরা দর্শনার্থী কক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার সুযোগ পায়। ওই সুযোগে দর্শনার্থী কক্ষে স্যালাইনের পাইপের মাধ্যমে তুফানকে ফেনসিডিল খাওয়ানো হয়। এ সময় সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত রক্ষীরা পাহারা দেয়।

জানা যায়, গত ১২ আগস্ট দর্শনার্থী কক্ষে তুফানকে ফেনসিডিল খাওয়ানোর সময় রওশন আরা নামে এক নারী কারারক্ষী বিষয়টি হাতেনাতে ধরে ফেলেন। পরে জেল সুপারকে তিনি বিষয়টি জানান। এর পর থেকেই প্রাচীরের ওপার থেকে (জেলখানার সামনের সড়ক) ফেনসিডিলের বোতল নিক্ষেপ শুরু হয়। কারারক্ষীদের সহায়তায় পছন্দের লোকজন বোতলটি তুফানের কাছে পৌঁছে দিতে থাকে।

সর্বশেষ ১৬ আগস্ট বিকেলের দিকে দক্ষিণ পাশ থেকে এক বোতল ফেনসিডিল জেলের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় বাবুল নামের এক হাজতি সেটা তুফানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সময় এক কারারক্ষী তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। এ অভিযোগে শহরের ঠনঠনিয়া এলাকার মাদক মামলার হাজতি বাবুলকে সেলে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেল সুপার।

ছাড়া পাওয়া একজন কয়েদি আরো অভিযোগ করে, গত ৭ আগস্ট নির্যাতিত ছাত্রী ও তার মাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। সেদিনই তুফানকে লকআপ থেকে এনে সুপারের কক্ষে ছাত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করানো হয়েছে। তুফান নিজেই সাক্ষাতের বিষয়টি জেলের কয়েকজন রক্ষীর কাছে স্বীকার করেছে। তুফান তাদের বলে, ছাত্রী মামলা তুলে নেবে এবং বিনিময়ে সে তাকে বিয়ে করবে। তবে এই অভিযোগ একেবারেই মিথ্যা বলে দাবি করে জেল সুপার মোকাম্মেল জানান, দেখা করানো ও জেল মেডিক্যালে রাখার প্রশ্নই ওঠে না। প্রয়োজনে যেকোনো তদন্ত করে এর সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আসলাম আলী জানান, তিনি রাত সাড়ে ১০টার দিকে ছাত্রী ও তার মাকে কারাগার থেকে থেকে বুঝে নিয়েছিলেন। সেদিন রাতে ডিবি অফিসে রাখার পরদিন সকালে তাদের রাজশাহীতে নিয়ে যান। তবে হাসপাতাল থেকে কেন তাদের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো, সে বিষয়ে তিনি বলেন, আদালত থেকে নির্দেশনা ছিল জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মা ও মেয়েকে সেফ হাউসে পাঠাতে হবে। সেই মোতাবেক কাজ করা হয়েছে।

 

 


মন্তব্য