kalerkantho


মনোহরগঞ্জ

দুর্নীতি ২৬ প্রকার!

আবদুর রহমান, কুমিল্লা (দক্ষিণ)   

২২ আগস্ট, ২০১৭ ১৩:১৮



দুর্নীতি ২৬ প্রকার!

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল মতিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ২৬টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি পরিচালনা কমিটির সদস্যরা এ বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে পাঁচ পৃষ্ঠার একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন।

মতিন একই সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক এবং শিক্ষক সমিতির সভাপতিও। লিখিত অভিযোগটি শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অঞ্চল-কুমিল্লার পরিচালক ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগকারীরা হলেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য ও সাবেক সভাপতি মো. আবুল হাসেম ভূঁইয়া, অভিভাবক সদস্য মো. বাবুল মিয়া, মো. বাহার উদ্দিন ও সাবেক সদস্য হারুনুর রশিদ। কালের কণ্ঠের কাছে এ অভিযোগের একটি কপি এসেছে। অভিযোগের কাগজপত্র ঘেঁটে এবং কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন মতিন।

লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৩ সালে এক বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবদুল মতিন স্কুল শাখার সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ লাভ করেন। এর এক বছর পর তিনি প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। পরে অনিয়মের মাধ্যমে অধ্যক্ষের পদ দখল করেন।

আগে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও এখন তিনি আওয়ামী লীগ নেতা। কলেজের অফিস কক্ষে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দেন। অভিযোগ ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি কর্তৃক গঠিত নিরীক্ষা কমিটি স্কুল শাখায় ২০১৩ সালে ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৮০ টাকা গরমিল পায়। এ সময় কমিটিকে ম্যানেজ করে অধ্যক্ষ পার পেয়ে যান। কলেজের দুই শিক্ষক চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ করার আগে তাঁরা সাত মাস কলেজে অনুপস্থিত ছিলেন। অধ্যক্ষ দুই শিক্ষকের সঙ্গে আঁতাত করে সাত মাসের বেতন-ভাতার সরকারি এক লাখ ১২ হাজার ৩২৭ টাকা আত্মসাৎ করেন।

২০১৬ সালের ৩ জুলাই কলেজের অফিসের আলমারি থেকে ৬৫ হাজার টাকা চুরি হয়। ওই দিন কলেজের গেট ও অফিসের চাবি অধ্যক্ষের বাসায় ছিল। তিনি বিষয়টি পুলিশকে না জানিয়ে ধামাচাপা দেন। স্কুলের পরিত্যক্ত মালামাল বাড়িতে নিয়ে আত্মসাৎ করেন। ২০০৬ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. মোতালেবের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা ঘুষ নেন। শর্ত ছিল, তাঁর এক আত্মীয়কে চাকরি দেওয়া। পরে চাকরি না দিতে পেরে সরকারিভাবে প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার মোতালেবকে দিয়ে দেন। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ভর্তির আবেদন বাবদ ৫২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। স্কুল অ্যান্ড কলেজ একই প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও অধ্যক্ষ নিয়মবহির্ভূতভাবে ২০১৬ সাল পর্যন্ত উভয় শাখা থেকে বেসরকারি সব ভাতা নিয়েছেন, যার পরিমাণ প্রায় চার লাখ ৬০ হাজার টাকা।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ প্রায় ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ফেল করা ৩০০ জনকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ফরম ফিলাপ করান। যার ফলে চলতি বছরে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ১৭.৮ শতাংশ। এ ফরম ফিলাপ করা বাবদ অধ্যক্ষ প্রায় তিন লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। কলেজের পেছনের দুটি ডোবা তিনি বিগত ১৩ বছর ধরে ভোগ করছেন। এর বার্ষিক গড় ইজারা মূল্য আট হাজার টাকা করে। এ হিসাবে প্রায় এক লাখ ১২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

নাম প্রকাশ না শর্তে মনোহরগঞ্জ কলেজের পাঁচজন সিনিয়র শিক্ষক জানান, প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে আবদুল মতিন কলেজের সামনে তিন তলাবিশিষ্ট অট্টালিকার মালিক হয়েছেন। অথচ কলেজের কোনো উন্নতি হয়নি। পরিচালনা কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য ও সাবেক সভাপতি মো. আবুল হাসেম ভূঁইয়া এবং সাবেক অভিভাবক সদস্য হারুনুর রশিদ বলেন, অধ্যক্ষের দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণসহ আমরা অভিযোগ করেছি। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাঁর বিচার দাবি করছি।

মনোহরগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল মতিন বলেন, আমাকে উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং শিক্ষক সমিতির সভাপতি বানানো হয়েছে। যারা বিরোধী দল, তারাই এসব ভুয়া কথা ছড়াচ্ছে। এসব অভিযোগের উত্তর নেওয়ার জন্য প্রতিবেদককে কলেজে যেতে বলেন তিনি। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আবদুল খালেকের মুঠোফোনে শনিবার বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। কুমিল্লা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল মজিদ বলেন, অধ্যক্ষ আবদুল মতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি। এই অভিযোগের তদন্ত চলছে। তদন্তে সতত্যা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 


মন্তব্য