kalerkantho


শিশু ওয়ার্ডে আবর্জনা তেলাপোকার বসবাস

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৪ আগস্ট, ২০১৭ ১১:১২



শিশু ওয়ার্ডে আবর্জনা তেলাপোকার বসবাস

মাগুরা সদর হাসপাতালে ঢুকতেই এখন সবার আগে চোখে পড়ে ছয়তলা নতুন একটি ভবন। গত ২১ মার্চ এ ভবনের উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এরপর পেরিয়ে গেছে আরো পাঁচ মাস। জনবল নিয়োগসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুমোদন না পাওয়ায় ১০০ শয্যার মাগুরা সদর হাসপাতালটি এখনো ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা যায়নি। যদিও সরকারি সব চিঠিপত্রে এটিকে এখন ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

ভবনটি নির্মাণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান মাগুরা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার ঘোষ জানান, ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এ ভবনের ভৌত অবকাঠামোগত সব কাজই শেষ হয়েছে। বাকি আছে লিফট স্থাপনসহ আরো কিছু কাজ। এ কারণে এটি এখনো সদর হাসপাতাল কর্তৃক্ষের কাছে হস্তান্তর করা যায়নি। তবে এক মাসের মধ্যে সব কাজই শেষ হবে বলে জানান তিনি।

প্রদীপ ঘোষ আরো জানান, ভবনের সব কাজই চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লিফটসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে দেরি হওয়ায় এ কাজে সময় বাড়ানো হয়েছে।

গতকাল বুধবার হাসপাতালের আন্তবিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে চিকিৎসাসেবার নানা সংকটের কথা জানা গেছে। গতকাল সকাল ৮টার মধ্যেই খুলে যায় হাসপাতালের নিচতলার প্যাথলজি বিভাগ। এখানে মূল দায়িত্বে আছেন রামপ্রসাদ কুণ্ডু নামের একজন টেকনিশিয়ান। সঙ্গে আছেন আরো দুজন।

রামপ্রসাদ জানান, প্যাথলজি বিভাগে রক্তের ৩০ ধরনের পরীক্ষা করা হয়। অ্যানালাইজার মেশিন থাকলে লিভারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা সম্ভব হতো। মেশিনটি না থাকায় যা এখন সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া ইলেকট্রোলাইট মেশিনের অভাবে সম্ভব হচ্ছে না মানবদেহের সোডিয়াম ও পটাসিয়ামের পরিমাণ নির্ধারণ জাতীয় পরীক্ষা করা। প্যাথলজি বিভাগে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী পরীক্ষার জন্য আসে। সরকারি মূল্য অনুযায়ী সর্বনিম্ন ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকার মধ্যে রক্ত ও মূত্রের বিভিন্ন পরীক্ষা এখানে করা যায়।

জানা গেছে, হাসপাতালের চারদিকে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক বেসরকারি রোগ পরীক্ষাকেন্দ্রের দালালরা হাসপাতালের রোগীদের সেখানে ভাগিয়ে নিয়ে যায়। পাশাপাশি সব ধরনের পরীক্ষা হাসপাতালে করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা এক জায়গায় সব পরীক্ষা করার সুবিধা নিতে নিজেরাই বেসরকারি রোগ পরীক্ষাকেন্দ্রে চলে যায় বলে জানান রামপ্রসাদ।

এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে এলো সদর হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগের দুর্দশার নানা চিত্র। এখানে কর্মরত মেডিক্যাল টেকনলজিস্ট তোফাজ্জেল হোসেন জানান, সদর হাসপাতালের পাঁচটি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে চালু আছে মাত্র একটি। যেটিতে কেবল দাঁতের এক্স-রে করার কথা। কিন্তু বিকল্প না থাকায় এ মেশিন দিয়েই দাঁতের পাশাপাশি হাত-পায়ের কবজিসহ ছোটখাটো বিভিন্ন এক্স-রে করা হচ্ছে। বিকল চারটি মেশিনের মধ্যে একটি প্রায় ৬০ বছরের পুরনো। অন্যগুলোর বয়স দুই থেকে তিন যুগ পেরিয়ে গেছে। দাঁতের যে মেশিনটি সচল আছে সেটি মাত্র ১০ মিলি অ্যাম্পিয়ারের। এক্স-রে বিভাগের সব ধরনের কাজ করার জন্য কমপক্ষে ১০০ মিলি অ্যাম্পিয়ারের ডিজিটাল মেশিন দরকার। সদর হাসপাতালের আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের অবস্থা আরো ভয়াবহ। গত দশকের প্রথমদিকে এ মেশিনটি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই-এক দিন চালু থাকার পরই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেটি অচল হয়ে যায়, যা পরে মেরামত করা হয়নি। এমনকি প্রতিস্থাপিত হয়নি নতুন মেশিন। এসব কারণে হাসপাতাল ঘিরে গড়ে ওঠা বেসরকারি রোগ পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে রোগীদের ভিড় বাড়ছে প্রতিদিন।

মাগুরা সদর হাসপাতালের আন্তবিভাগের প্রধানতম সংকটগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শয্যা সংকট। ১৯৪৪ সালে স্থাপিত এই হাসপাতালে বর্তমান শয্যাসংখ্যা ১০০টি। কিন্তু প্রতিদিন ভর্তি রোগীর সংখ্যা থাকে কমপক্ষে ৩০০। যা কোনো কোনো দিন প্রায় ৪০০ জনে পৌঁছায়। গতকাল হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা ছিল ২৯৪ জন। এ কারণে নিচ থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত মেডিসিন, অর্থোপেডিক, সার্জারি—এ তিনটি বিভাগের পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই রোগীদের উপচে পড়া অবস্থা। নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডের বারান্দা ও মেঝেতে নিজেদের মতো শয্যা বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে রোগীরা। এ কারণে সর্বত্রই দেখা দিচ্ছে সংকট ও জটিলতা। একই অবস্থা তৃতীয় তলার শিশু ওয়ার্ডে। এখানে মাত্র ১০টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন অর্ধশতাধিক শিশু রোগী ভর্তি থাকে।

শিশু বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সর্দিজ্বরে আক্রান্ত শিশু মৃন্ময়ীর বাবা স্কুলশিক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, এখানে শিশুদের নিয়ে অবস্থানের কোনো পরিবেশই নেই। শিশু ওয়ার্ড জুড়ে ময়লা-আবর্জনা ও তেলাপোকার বসবাস। এ কারণে তিনি তাঁর মেয়েকে এখানে ভর্তি দেখিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের রাউন্ড শেষ হলে প্রতিদিন বাড়িতে নিয়ে যান। পরদিন সকালে আবার চিকিৎসকের রাউন্ডের আগে শিশুকে এখানে নিয়ে আসেন। আনিসুর রহমানের অভিযোগ, শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে আর কোনো সুবিধা পাওয়া যায় না।

শিশু ওয়ার্ডের বিষয়ে কথা হয় সদর হাসপাতালের শিশু বিষয়ক কনসালট্যান্ট জয়ন্ত কুমার কুণ্ডুর সঙ্গে। তিনি বলেন, এ বিভাগে শয্যার তুলনায় ৮ থেকে ১০ গুণ রোগী সব সময় ভর্তি থাকে। এসব রোগীর মধ্যে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। হাসপাতালে সেফট্রাকজন জাতীয় ইঞ্জেকশনসহ কিছু ওষুধের স্বল্পতা আছে। এ ছাড়া সব ধরনের ওষুধের সরবরাহই এখানে নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু শয্যাসংখ্যা অনুযায়ী রোগী ভর্তির হার বেশি হওয়ায় বরাদ্দ সাপেক্ষে ক্ষেত্রবিশেষে গরিব রোগীদের ওষুধ পেতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ ছাড়া শিশু ওয়ার্ডে শতভাগ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

শিশু ওয়ার্ডের পরিবেশ বিষয়ে ডা. জয়ন্ত বলেন, এখানে শুধু শিশু ওয়ার্ড নয়, প্রতিটি ওয়ার্ডেই রোগীদের সঙ্গে অধিকসংখ্যক দর্শনার্থী থাকে। তাদের কারণেই হাসপাতালের পরিবেশ যথাযথভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে প্রত্যেকেরই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পশ্চিম দিকে পাশাপাশি দুটি কক্ষ। যার একটি অর্থোপেডিক ও ট্রমা বিভাগের নারীদের জন্য। অন্যটি নারীদের সার্জারি ইউনিট। সার্জারি বিভাগে মোট শয্যার সংখ্যা আটটি। অর্থোপেডিক বিভাগে মাত্র চারটি। কিন্তু এই ১২ শয্যার বিপরীতে গতকাল ভর্তীকৃত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৭ জন, যার মধ্যে ১৮ জন সার্জারি বিভাগের, বাকি ১৯ জন অর্থোপেডিক বিভাগের। দুটি ওয়ার্ডেই সিলিং ফ্যান আছে আটটি। এর মধ্যে চালু আছে ছয়টি।

অর্থোপেডিক বিভাগের রোগী মাগুরা সদর উপজেলার সাজিয়াড়া গ্রামের শাহিনা বেগম জানান, গত ১৩ আগস্ট একটি দুর্ঘটনায় বাঁ পা ভেঙে তিনি এখানে ভর্তি হয়েছেন। প্রথম তিন দিন চিকিৎসার সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনেছেন। পরে হাসপাতাল থেকেই সব ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে।

সার্জারি বিভাগে ভর্তি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার শাপখোলা গ্রামের রোগী মনোয়ারা বেগম জানান, আট দিন আগে বাঁ হাতের আঙুল কেটে যাওয়ায় এখানে ভর্তি হয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার তাঁর হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। তবে অধিকাংশই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ মেডিসিন, অর্থোপেডিক ও সার্জারি বিভাগের রোগী শামসেল মোল্যা, আবু বাতেনসহ অন্য রোগীদের।

হাসপাতালের নিচতলার উত্তর দিকে যেতেই উৎকট গন্ধ এসে নাকে লাগে। পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে থাকা বৈদ্যনাথ কাঞ্চন বলেন, ‘এটি পাকিস্তানি, মানে পাকিস্তান আমলের গন্ধ। এ কারণে যায় না। তত্ত্বাবধায়ক স্যার প্রতিদিন তিন বেলা আমাদের দিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ড পরিষ্কার করান। গোটা হাসপাতালে কোনোখানে গন্ধ নেই। কিন্তু এখানকার গন্ধ যায় না। ’ ঘটনাস্থল গিয়ে দেখা গেল, বেশ কিছু জায়গা জুড়ে উন্মুক্ত নালা ও ম্যানহোল। সেখানে পানি জমেই ছড়াচ্ছে এ দুর্গন্ধ।

এ বিষয়ে অন্য রকম অভিযোগ শহরের সুইপার কলোনির সঞ্জয় দাস নামের এক যুবকের। তিনি জানান, হাসপাতালে এখন ৩০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন, যাঁদের মধ্যে ১০ জনের ক্ষেত্রেই হরিজনদের জন্য সংরক্ষিত কোটা মানা হয়নি। টাকার বিনিময়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ রকম চলতে থাকলে হরিজন সম্প্রদায়ভুক্ত প্রকৃত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাঁদের মূল পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।

এসব বিষয়ে মাগুরা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনসহ সব ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা নিরসনে মহাপরিচালকের দপ্তরে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। আমি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত হাসপাতালে অবস্থান করি। এ ছাড়া পরবর্তী সময়ে একাধিকবার এখানে এসে সব কিছু সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখি। হাসপাতালের গোটা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে চিকিৎসকদের ইতিবাচক মনোভাবের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। তবু সার্বিক অবস্থা অতীতের তুলনায় অনেকটাই ভালো অবস্থার দিকে যাচ্ছে।

ডা. সুশান্ত বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে অতিরিক্ত ১৫০ শয্যার নতুন অবকাঠামো প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। সেটি সম্পন্ন হলে এখানে সব ধরনের চিকিৎসা সুবিধাই শতভাগ নিশ্চিত করা যাবে। দুর্গন্ধের বিষয়টি একাধিকবার গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

 


মন্তব্য