kalerkantho


সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ওষুধে

শামীম খান, মাগুরা   

২৫ আগস্ট, ২০১৭ ১০:০৩



সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ওষুধে

মাগুরা সদর হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ওষুধে। এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি টাকার যে ওষুধ, সার্জিক্যাল সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হয় তার বেশির ভাগই হাসপাতালের রোগীদের প্রাপ্য। এসব ওষুধ আউটডোর ও ইনডোর দুই বিভাগে বণ্টন হওয়ার কথা। কিন্তু রোগীরা তা কতটুকু পাচ্ছে? আউটডোরের চিকিৎসকরা যে ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখেছেন, তার বেশির ভাগ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। আবার ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর যে ওষুধ পাওয়ার কথা, তা সেবিকারা বাইরে থেকে আনতে বলছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ওষুধ, সার্জিক্যাল সরঞ্জামাদি, পথ্য, গজ ব্যান্ডেজের সরকারি ক্রয় পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট। এদের মধ্যে আজিজুল ইসলাম নামে একজনের দখলে রয়েছে তিনটি লাইসেন্স। একটি তাঁর নিজের নামে। অন্য দুটি স্ত্রী সুপ্তি হক ও ভাবি রহিমা খাতুনের নামে।

এ ছাড়া কাজী মনিরুজ্জামান ও ফিরোজ হোসেনের নামে রয়েছে পৃথক আরো দুটি লাইসেন্স। ওষুধ, সার্জিক্যাল সরঞ্জামাদির সব কাজই ঘুরেফিরে এ রকম গুটিকয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই পায়; যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের দাম উচ্চমূল্যে নিয়ে ঠেকায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে মান নিয়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত অর্থবছরে আজিজুল ইসলাম সদর হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে চার হাজার ৮৫১টি ক্যানোলা সরবরাহ করেছেন, যার প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে ৩০ টাকা। একই সময়ে তিনি সিভিল সার্জন কার্যালয়ে যে ক্যানোলা সরবরাহ করেছেন তার দাম ধরা হয়েছে সাত টাকা ৯০ পয়সা। ঢাকার সরকারি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (আইপিএস) সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্যালাইন সেট সরবরাহের ক্ষেত্রে দাম ধরেছে মাত্র ১০ টাকা।

জানা যায়, সিভিল সার্জন কার্যালয়ে গত বছর সদর হাসপাতালের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগ কম্পানি থেকে এসেছে এক কোটি ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৮৫ টাকার ওষুধ। বাইরে থেকে কেনা হয়েছে আট লাখ ৮৫ হাজার ৫৯ টাকার ওষুধ। হাসপাতালে ওষুধের মোট যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তার ৭৫ শতাংশ সরাসরি দেয় সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগ কম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। বাকি ২৫ শতাংশের ২০ শতাংশ পরিমাণ ওষুধ সরবরাহ করে সরকারি আরেক বিভাগ সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোর অ্যান্ড ডিপো (সিএমএসডি)। বাকি কেবল সাড়ে ৫ শতাংশ ওষুধ কেনার দায়িত্ব থাকে সিভিল সার্জন কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের। আউটডোরে ওষুধ সরবরাহ কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা শেখ মেছফার জানান, এখানে প্রতিদিন ২২ থেকে ৩৩ রকমের ওষুধ রোগীদের দেওয়া হয়। ওষুধ নিতে আসা নিজনান্দুয়ালী গ্রামের রাজন, আবালপুরের আতিয়ার রহমানসহ অনেকে জানায়, আউটডোরের চিকিৎসকরা যে ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখেছেন, তার বেশির ভাগ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।

অপারেশন থিয়েটারের বিষয়ে সদর হাসপাতালের সার্জিক্যাল বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. শফিউর রহমানের দাবি, এখানে ওষুধের সরবরাহ যেমন নিশ্চিত করা উচিত, তেমনি প্রত্যেক সার্জারি কনসালট্যান্টের সঙ্গে উপযোগী একজন চিকিৎসক সহকারী হিসেবে দেওয়া উচিত। ওষুধ সরবরাহে সদর হাসপাতালের আন্ত বিভাগের অবস্থা অনেকটাই ভয়াবহ। বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, সেবিকারা রোগীদের ব্যবস্থাপত্র থেকে বেশির ভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে বলছেন। অন্যদিকে ব্যবস্থাপত্রের ওই সব ওষুধ পরে বিক্রি হয় বিভিন্ন ক্লিনিকে।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ওয়ার্ডে গিয়ে কথা হয় সিনিয়র স্টাফ নার্স শামীমা আক্তার ও লিপিকা বিশ্বাসের সঙ্গে। তাঁরা জানান, চিকিৎসকরা যেসব ওষুধ লিখে দেন, তা হাসপাতালে সরবরাহ থাকলে অবশ্যই রোগীদের দেওয়া হয়। এখানে কোনো অনিয়ম হয় না। তাঁরা জানান, সদর হাসপাতালে নরমাল স্যালাইন, ৫ শতাংশ ডিএ, ডিএনএস, ১০ শতাংশ ডিএ, কটসন ইনজেকশন, অমিপ্রাজল ইনজেকশনসহ ২৩ ধরনের ইনজেকশন ও প্যারাসিটামল, মোনাস, মেট্রোনিডাজল, ইটোরাক, ফিক্সোকার্ডসহ ১৯ ধরনের ট্যাবলেট আছে।

এ বিষয়ে সদর হাসপাতালের পার্শ্ববর্তী মাগুরা ফার্মেসি, মোমেনা ফার্মেসিসহ বেশ কিছু ওষুধের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নার্সদের ওয়ার্ডে যেসব ওষুধের সরবরাহ দেখানো আছে তার অনেক ওষুধই রোগীরা ‘স্লিপ’ সিস্টেমে এসব দোকান থেকে কিনেছে। ওষুধ সরবরাহের পদ্ধতির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভাগের প্রতিটি ওয়ার্ডের সাপ্তাহিক ওষুধ একবারে চাহিদা অনুযায়ী সদর হাসপাতালের স্টোরকিপার গৌতম কুমার সরকারের কাছ থেকে বুঝে নেওয়া হয়; যেখানে প্রতিস্বাক্ষর করেন সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোক্তাদুর রহমান।

এ বিষয়ে হাসপাতালের স্টোরকিপার গৌতম কুমার সরকারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। গত দুই দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই কক্ষে তালা ঝুলছিল। গত বুধবার দুপুরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটিতে আছেন বলে জানিয়েছেন। এ বিষয়ে ডা. মোক্তাদুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে ৭৫ শতাংশ ওষুধ রোগীরা বাইরে থেকে কিনে আনে জানিয়ে তিনি বলেন, স্টোরকিপার ছুটিতে থাকলে আমার জানার কথা। কৌশলে তিনি আপনাকে এড়িয়ে গেছেন।

অন্যদিকে ঠিকাদারির বিষয়ে সদর হাসপাতালে গত মার্চে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমার সময়ে অতীতে একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বর্তমানে আরেকটি প্রক্রিয়াধীন। ঠিকাদারদের দর সরকার নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড রেটের (এসআর) মধ্যে আছে কি না সেটিই দেখার বিষয়। ঠিকাদারদের নেগোসিয়েশন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবু চলতি সময়ে যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, তা যথাযথ জবাবদিহি ও উন্মুক্তভাবে করার জন্য চেষ্টা করছি। ’

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক রুহুল আমীন জানান, গত চারদলীয় জোট সরকার সেবিকাদের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আলাদা করে সেবা পরিদপ্তর নামে পৃথক বিভাগ খুলেছে। এ কারণে তাঁদের সব জবাবদিহি সেখানে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কিংবা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক কারোর কাছেই জবাবদিহি করতে তাঁরা বাধ্য নন। স্থানীয়ভাবে তাঁরা সেবা পরিদপ্তর, খুলনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

 


মন্তব্য