kalerkantho


কালার কালো কাহিনি...

আলম ফরাজী, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)   

২৫ আগস্ট, ২০১৭ ১০:২৬



কালার কালো কাহিনি...

আব্দুল খালেক ভুঁইয়া কালা

আসল নাম আব্দুল খালেক ভুঁইয়া (৮০)। এ নামে কেউ তাঁকে ডাকে না।

তাঁকে ডাকা হয় কালার বাপ, কালা মিয়া ও হাজি কালা বলে। তবে তিনি অধিক পরিচিত কালা ভুঁইয়া নামে। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার গলকুণ্ড গ্রামের বাসিন্দা এই খালেক। আশপাশের কয়েক গ্রামের লোকজনের অভিযোগ, তিনি জাল দলিলের কারিগর। এভাবে তিনি প্রায় ১০ একর জমির মালিক হয়েছেন। তাঁর দখলে থাকা জমির দাবিদার এলাকার প্রায় ২০ জন লোক। তাঁরা তাঁদের পৈতৃক জমির বৈধ কাগজপত্র দেখাচ্ছেন। এ নিয়ে গ্রাম্য সালিসে খালেকের দলিল জাল প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত মালিকদের বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রান করা হচ্ছে।

খবর পেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার গলকুণ্ড গ্রামে গেলে অশীতিপর বৃদ্ধ আব্দুল হেকিম ভুঁইয়া জানান, ছোটবেলা থেকে কালা ছিলেন ভিন্ন স্বভাবের। বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর চালচলন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁর বাবা মৃত জহির উদ্দিন ছিলেন সাধারণ কৃষক। আত্মীয়স্বজনের জমি ভাগে নিয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন। এ অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর পর হাল ধরেন বড় ছেলে কালা। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এলাকার সব মানুষ কোনো না কোনোভাবে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো ক্ষতি হয়নি কালার। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে নান্দাইল সাবরেজিস্ট্রি অফিস আগুনে পোড়ানো হয়। স্বাধীনতার পর আশপাশের মানুষের জমি দখলে নেওয়া শুরু করেন কালা। জমির ভুয়া দলিল বানান শুরু করেন। হেকিম বলেন, একসময় কালা আমার বাপ-চাচারার পুট-ফরমাইশ করত। আর অহন আমার প্রায় ১৬ কাঠা (১৬০ শতাংশ) জমি দখলে নিয়ে জাল দলিল করেছে। এ ঘটনায় আমি আদালতে মামলা করেছি।

গলকুণ্ড গ্রামের আবদুর রহিম বলেন, তাঁর দায়ের করা একটি বাটোয়ারা মামলায় আসামি কালা ভুঁইয়া। আদালতে জাল দলিল উপস্থাপন করে ধরা খেয়েছেন। মামলাটি ঈশ্বরগঞ্জের জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ মো. মাহবুব সোবহানীর আদালতে বিচারাধীন। জাল দলিলটি ১৯৬৪ সালে নান্দাইল সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়েছিল। ওই সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দুজন প্রবীণ দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর স্থানীয় দোসররা নান্দাইল সাবরেজিস্ট্রি অফিস পুড়িয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার দলিল ছাই হয়েছে। এসব দলিলের দ্বিতীয় কোনো কপি (অনুলিপি) মহাফেজখানায় সংরক্ষিত ছিল না। ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ কার্যালয় জাল দলিল সম্পাদনের আখড়ায় পরিণত হয়।

আদালতে পেশ করা ১৯৬৪ সালে নিবন্ধিত ৫৮৯৩ নম্বরের কথিত দলিলটি আদালত তাঁর হেফাজতে নিয়ে বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করান। এর দুই বছর পর ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট মামলাটি ওই আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়। বিচারক রায় দেন, দলিলটি সৃজিত ও যোগসাজশী। আদালতকে বিভ্রান্ত করার অপরাধে বিবাদী আব্দুল খালেককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আরেকটি নথিসূত্রে জানা যায়, ঈশ্বরগঞ্জের জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ মাহবুব সোবহানী ২০১৪ সালের ২৬ মে ময়মনসিংহের মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে কালার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার পুলিশ আব্দুল খালেককে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করলে খালেককে কারাগারে পাঠানো হয়।

গলকুণ্ড গ্রামের শহীদুল হক, আবদুল কাইয়ুম, মোফাখখারুল ইসলামসহ প্রায় ২০ জন বাসিন্দা বলেন, কালা জাল দলিল ও লাঠির জোরে তাঁদের পৈতৃক জমিজমা জবরদখল করে নিয়েছেন। বছরের পর বছর মামলা চললেও আদালতে জমির দলিল পেশ করছেন না। শুধু সময় নিয়ে চলেছেন। দলিল পেশ করলেই জালিয়াতি ধরা পড়ে যাবে বলে গ্রামবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস। তাঁদের দাবি, দখল করা জমি ফিরিয়ে দিতে প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রানা চন্দ্র ঘোষ বলেন, কালা ভুঁইয়া চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী। যুদ্ধের সময় বিভিন্ন গ্রামের লোকজনের সহায়-সম্পদ লুট করেছেন। স্বাধীনতার পর লুট করা মালামাল তাঁর বাড়ি থেকে মুক্তিযোদ্ধারা উদ্ধার করেছেন। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন তিনি পলাতক ছিলেন। পরে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে এলাকায় প্রবেশ করেন।

কালা ভুঁইয়া জেলে থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর ছেলে মো. আব্দুল মজিদ, মো. আব্দুল হাই ও নজরুল ইসলাম বলেন, সব জমিই বাবার কেনা। জমিগুলো জোর করে দখলে নিতে এলাকার একটি চক্র অপচেষ্টা চালাচ্ছে। দু-একটি ঘটনায় কিছুটা ঝামেলা রয়েছে। তবে সব জমির দলিল জাল নয়। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিতু মরিয়ম বলেন, যেসব মামলা চলমান, সেগুলো আদালত দেখবে। বাকি ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে থানাকে বলব নিয়মিত মামলা নেওয়ার জন্য।

 


মন্তব্য