kalerkantho


৮টায় খোলে না, অথচ ঠিক ২টায় বন্ধ!

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

২৮ আগস্ট, ২০১৭ ১১:১৯



৮টায় খোলে না, অথচ ঠিক ২টায় বন্ধ!

ঘড়ির কাঁটায় সকাল ঠিক ৮টা। রাঙামাটি সদর হাসপাতালের ফটকের সামনে বসে আছেন ঝাড়ুদার প্রদীপ ও বাবুর্চি শাহজাহান। অপরিচ্ছন্ন মেঝে ঝাড়ু দেওয়া হয়নি তখনো। ইতিউতি ঘুরছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, কিন্তু খোলে না টিকিট কাউন্টার কিংবা বহির্বিভাগ। সকাল সোয়া ৮টায় হাসপাতালে সবার আগে দেখা মেলে শিশু বিশেষজ্ঞ আব্দুল হাইয়ের। জনপ্রিয় এই চিকিৎসক জানান, অন্যরাও হয়তো আসছেন। একটু পরেই এলেন ডা. উসে মং, চলে গেলেন সরাসরি দোতলায় পুরুষ ওয়ার্ডে রোগী দেখতে। তখনো খোলেনি বহির্বিভাগ কিংবা টিকিট কাউন্টার। এ সময় অস্ত্রোপচার কক্ষে গিয়ে দেখা মেলে চার শিক্ষার্থী নার্সের। তখনো আসেননি সিনিয়র নার্স কিংবা চিকিৎসক।

শিক্ষার্থী নার্স ইশরাত জাহান জানান, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবেন সবাই।

সকাল ৮টায় সবাই আসার কথা থাকলেও গতকাল রবিবার রাঙামাটি সদর হাসপাতালে গিয়ে সাড়ে ৮টায়ও দেখা গেছে বেশির ভাগ বিভাগই খোলেনি। কিন্তু দুপুর ২টা বাজতেই বন্ধ হয়ে যায় সব বিভাগ। অসুস্থ স্ত্রী সালমা বেগমকে নিয়ে বহির্বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মনসুর জানান, চিকিৎসক আসেননি এখনো। নির্ধারিত সময়ের ৪০ মিনিট পর অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে খোলা হয় বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার, প্রায় একই সময়ে খোলে বহির্বিভাগও। মূলত এই প্রতিবেদককে দেখেই তড়িঘড়ি করে এক একজন কর্মচারী অন্যদের ফোন করে দ্রুত আনছিলেন অফিসে। ৮টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত  বহির্বিভাগে কোনো চিকিৎসককে দেখা যায়নি।

৮টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত কোনো রোগী ছিল না জরুরি বিভাগে। এই বিভাগের চিকিৎসক ডা. আব্দুর রহমান রুবেল, যাঁর সঙ্গে শনিবার সকালেও দেখা হয়েছিল, গতকাল সকালেও তাঁকে জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। টানা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। কিন্তু কেন? জানা গেল, জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকরা নিজেরাই এই সময়সূচি ঠিক করে নিয়েছেন। তাঁরা এক একজন টানা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করে চলে যান চট্টগ্রামে।

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসক ডা. মংক্য চিং মারমা সাগর বলেন, ‘চিকিৎসকরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে এটা করেন, আমরা চাপ দিয়েও খুব একটা লাভ হয় না। বেশি চাপাচাপি করলে ওনারা বদলি হয়ে চলে যান। সকাল পৌনে ১০টায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, বসে আছেন স্টাফ ও শিক্ষার্থী নার্সরা। নিজের কক্ষে বিশ্রামে রয়েছেন ডা. রুবেল। এ সময় নানিয়ারচর উপজেলার শণখোলাপাড়া থেকে কামেজবালা চাকমা (৪৭) নামের এক রোগী আসেন। তাঁকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন স্টাফ নার্স মিঠু তালুকদার। বিশ্রামে থাকা চিকিৎসককে ডাকেননি তাঁরা। জরুরি বিভাগের ইনচার্জ শাহিদা আক্তার জানান, এ বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ জন রোগী আসে।

এক্স-রে বিভাগে গিয়ে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট সুপা চাকমার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এক্স-রে সুবিধা আছে। তবে এ বিভাগে তিনিই একমাত্র কর্মী। সঙ্গে অফিস সহায়ক সঞ্জয় চাকমা আছেন বাড়তি দায়িত্বে। এক্স-রে মেশিন সচল থাকলেও ভোল্টেজ সমস্যা ও রেডিওলজিস্ট না থাকায় রিপোর্ট দিতে না পারার কথা জানান তিনি। প্রতিদিনই গড়ে পাঁচ-ছয়টা এক্স-রে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ২০১৩ সাল থেকেই এখানে রেডিওলজিস্ট নেই। এতে রোগীদের শুধু ফিল্মটাই দিতে পারেন, রিপোর্ট দিতে পারেন না তাঁরা। আবার এই বিভাগে জেনারেটর বা আইপিএস সুবিধা না থাকায় সমস্যার কথা জানান তিনি।

হাসপাতালের রোগীদের খাবার আসে যেখান থেকে সেখানে সকাল ১১টায় পাওয়া গেল বাবুর্চি রিদুয়ান বারীকে। তিনি ও শাহজাহান, অনিতা রাণী দে, জাহানারা বেগম ও সুজাতা দেওয়ান ব্যস্ত রোগীদের দুপুরের খাবার তৈরি করতে। জানালেন, এদিন ৯০ জন রোগীর দুপুরের খাবার রান্না করছেন তাঁরা। খাবারের তালিকায় রয়েছে মুরগির মাংস, সবজি ও ডাল। রোগীদের জন্য তিন বেলার সাপ্তাহিক খাবারের তালিকাও ঠিক করা থাকে। রবিবার মাংস, সোমবার মাছ, মঙ্গলবার ডিম, বুধবার মাছ, বৃহস্পতিবার মুরগির মাংস ও শুক্রবার মাছ দেওয়া হয়। তবে প্রতি বেলায় এসবের সঙ্গে থাকে সবজি ও ডাল। আর সকালে দেওয়া হয় কলা-পাউরুটি ও ডিম। প্রতিদিন প্রত্যেক রোগীর জন্য ১২৫ টাকা বরাদ্দ। এসব খাবার সরবরাহ করেন রাজু নামের একজন ঠিকাদার। হাসপাতালে ছয়জন বাবুর্চির পদ থাকলেও একটি শূন্য থাকায় বাবুর্চিরা সবাই মিলে নিজেদের বেতন থেকে বেতন দিয়ে একজনকে ‘নিয়োগ’ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে ১৫ দিন ধরে চিকিৎসাধীন টাইফয়েড রোগী আব্দুর রহমান জানান, খাবারের মান মোটামুটি ভালো। সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট। হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষে সিনিয়র স্টাফ নার্সসহ বেশ কয়েকজন নার্সকে পাওয়া গেল। কিন্তু তখন ওয়ার্ডে রোগী দেখছিলেন চিকিৎসক মোতাহার হোসেন চৌধুরী। সিনিয়র স্টাফ নার্স কামরুন্নাহার জানান, অস্ত্রোপচার কক্ষের ফ্যান চলে না, শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। ঠিক নেই সব বাতিও। নেই জেনারেটর বা আইপিএস সংযোগ। ফলে বিদ্যুৎ না থাকলে চার্জার হাতে নিয়েই চলে অস্ত্রোপচার। এ বিভাগে ডা. সেলিম যোগ দেওয়ার পর রোগী আসা অনেক বেড়েছে বলে জানান তাঁরা।

গাইনি বিভাগে গিয়ে দেখা হয় চিকিৎসক ডা. হেনা রাণী বড়ুয়া ও ডা. নীহারঞ্জন নন্দীর সঙ্গে। জানা গেল, গতকাল পর্যন্ত এই মাসে ১৫৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে এ বিভাগে। তাদের মধ্যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ১৭ জনের এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ৪৩ জনের সন্তান প্রসব হয়েছে। জুলাই মাসে গাইনি বিভাগে ১৭২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ১৯ জন এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ৬৪ জনের সন্তান প্রসব হয়েছে। অন্যান্য অস্ত্রোপচার হয়েছে ১৬ জনের। এ বিভাগে ডা. হেনা যোগ দেওয়ার পর থেকেই জেলার নারীরা সুবিধা পাচ্ছে বলে জানা গেল। তবে হাসপাতালে স্থায়ী অ্যানেসথেটিস্ট না থাকায় রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডা. জিবেশ চাকমাকে আনা হয়। হাসপাতালের ফার্মেসি বিভাগে দেখা মিলল ইভানি চাকমা, এডাম জয় চাকমা, জিনা চাকমা ও বিঘ্নবিনাশ চাকমার সঙ্গে। তাঁরা জানান, তাঁরা মূলত ফার্মেসির দায়িত্বে থাকলেও টিকিট কাউন্টারেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। মাঝে মাঝে দেরি হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তাঁরা বলেন, চেষ্টা করেন ঠিক সময়ে আসতে, তবু কখনো কখনো সামান্য দেরি হয়ে যায়।

গতকাল সকাল পৌনে ১১টা পর্যন্ত ২৩ শিশু, ৩০ জন পুরুষ ও ৫১ জন নারী বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য টিকিট কেটেছে বলে জানান ইভানি চাকমা। ফার্মেসির দায়িত্বে থাকা বিঘ্নবিনাশ চাকমা জানান, এ সময় পর্যন্ত ৪৯ জন রোগীকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে বিনা মূল্যের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। ওই সময় শহীদুল্লাহ নামের এক রোগী আসেন ওষুধ নিতে। চিকিৎসক দুটি ওষুধ লিখলেও ফার্মেসি থেকে একটি দেওয়া হয়। জানতে চাইলে ইভানি চাকমা বলেন, সব ওষুধ সব সময় ফার্মেসিতে থাকে না, তাই দেওয়াও সম্ভব হয় না। আবার সব রোগীর মাঝে সমানভাবে ওষুধ বণ্টন করতে হয় বলে সব সময় সবাইকে ব্যবসস্থাপত্র অনুসারে ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না বলেও জানান তিনি।

ফার্মেসির পাশেই ঠাঁই নেওয়া ল্যাবরেটরির দায়িত্বে থাকা মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট জুলি চাকমা জানান, সকাল থেকে ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত ১৪ জন বিভিন্ন পরীক্ষা করিয়েছে। এই বিভাগে তিনি এবং ব্লাডব্যাংকের নিখিল প্রিয় চাকমাসহ তাঁরা দুজন দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি।

সকাল ১১টা। হাসপাতালের বহির্বিভাগে একটি কক্ষে বসে চিকিৎসা দিচ্ছেন ডা. রূপশ্রী রায়, ডা. অনন্যা চাকমা ও ডা. সৈকত চাকমা। ততক্ষণে তিনজন শতাধিক রোগী দেখেছেন। হাসপাতালের ভবনে ফাটল ধরার কারণে বহির্বিভাগ সরিয়ে আনা হয়েছে রিপ্রডাক্টিভ হেলথ সার্ভিসেস ট্রেনিং অ্যান্ড এডুকেশন প্রগ্রাম (আরএইচ স্টেপ) ভবনের একটি কক্ষে। এখানে গাদাগাদি করে একসঙ্গে একটি ছোট্ট টেবিলে তিনজন চিকিৎসককে রোগী দেখতে হচ্ছে। বিষয়টি বেশ কষ্টদায়ক ও বিড়ম্বনার বলে জানান তাঁরা।

ডা. অনন্যা চাকমা বলেন, আট মাস ধরে এ কঠিন কাজটিই করতে হচ্ছে আমাদের।   দেরিতে আসায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আসলে চেষ্টা করি সময়মতো আসতে। তবে মাঝে মাঝে দেরি হয়।   বহির্বিভাগে কক্ষ, অবকাঠামো ও চিকিৎসক বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন ডা. অনন্যা ও ডা. রূপশ্রী। হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের যথাসময়ে না আসা প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসক ডা. মংক্য চিং সাগর বলেন, এখন ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যথাসময়ে যাতে সবাই আসেন সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন বর্তমান সিভিল সার্জন।

ডা. সাগরের সঙ্গে কথা বলার সময়ই সিভিল সার্জনের কক্ষে রক্ষিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিনে আঙুলের চাপ দিতে দেখা গেছে কয়েকজন চিকিৎসককে। তখন ঘড়ির কাঁটা ৯টা পেরিয়ে গেছে। বাইরে বৃষ্টি নেই। নেই কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসও। তবু দেরিতে কেন এলেন তাঁরা—এর কোনো জবাব নেই। সেই জবাবে চাওয়ার ব্যাপারে খুব বেশি কঠোর হওয়ারও সুযোগ নেই দায়িত্বশীলদের। কারণ জবাব চাইলেই তদবির করে বদলি হয়ে যান চিকিৎসকরা।

তবে হাসপাতালের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, সময় ও নিয়ম মেনে চলতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট চালু করা হলেও সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সেই মেশিন উন্মুক্ত থাকার সুযোগ নিচ্ছেন সবাই। সাড়ে ৯টার বদলে সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিলেই সংকটের সুরাহা মিলতে পারে বলে পরামর্শ সূত্রটির।

 


মন্তব্য