kalerkantho


মেডিক্যাল কলেজের অনেক চিকিৎসকই আসেন না

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি    

২৯ আগস্ট, ২০১৭ ১০:৩৬



মেডিক্যাল কলেজের অনেক চিকিৎসকই আসেন না

মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনা আছে যে সব মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত চিকিৎসকরা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেবেন, এমনই বলছিলেন রাঙামাটির সিভিল সার্জন ডা. শহীদ তালুকদার। গতকাল সোমবারসহ গত তিন দিন রাঙামাটি সদর হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে মেডিক্যাল কলেজের খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষককেই চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, গৌরব দেওয়ান, জীবেশ চাকমা, কার্ডিওলজির খোরশেদ আলমসহ দু-চারজন অধ্যাপক ছাড়া বাকিরা হাসপাতালমুখো হন না।

রাঙামাটি সদর হাসপাতাল লাগোয়া তিনটি ভবনে মেডিক্যাল কলেজ চালু হয়েছে। কলেজের তিন ব্যাচের ১৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৪৬ জন অধ্যাপক থাকলেও তাঁদের সময় হয় না হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার। চট্টগ্রাম থেকে এসে একটি ক্লাস নিয়েই আবার চট্টগ্রামে ফিরে যান এসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। প্রায় সব বিষয়েই বিশেষজ্ঞ থাকলেও তাঁদের মধ্যে দু-চারজন বাদে আর কেউই আসেন না রাঙামাটি সদর হাসপাতালে। অথচ হাসপাতালে চক্ষু বিভাগ, নিউরোলজি ও কার্ডিওলজির কোনো বিশেষজ্ঞ নেই। কোনো কোনো বিভাগের চিকিৎসক নেই, বহির্বিভাগে তেমন কোনো বিশেষজ্ঞ বসেন না।

রাঙামাটির সিভিল সার্জন ডা. শহীদ তালুকদার, যিনি নিজেও রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজের প্রকল্প পরিচালক। তিনি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বিষয়টি জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, আমিও মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষকে অনুরোধ করেছি।

সেই মোতাবেক বেশ কয়েকজন চিকিৎসক এখন আমাদের হাসপাতালে সেবা দিচ্ছেন, তবে এটা আরো বাড়লে ভালো হয়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. টিপু সুলতান বলেন, যাবে না কেন? অবশ্যই যায়। তারা কেন এটা বলছে আমি জানি না। এখন থেকে যেন নিয়ম করে যায়, বিষয়টি দেখবেন বলেও আশ্বাস দেন তিনি।  

কতটা দায়িত্বশীল জেলা পরিষদ : ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী, স্বাস্থ্য বিভাগ পার্বত্য রাঙামাটি জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত বিভাগ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রাঙামাটি হাসপাতালের দেখভালের দায়িত্বও এই প্রতিষ্ঠানটির। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক কিংবা নার্স সবার বেতন-ভাতাও আসে জেলা পরিষদ হয়েই। কিন্তু রাঙামাটি হাসপাতালের উন্নয়নে কিংবা সংকটের সমাধানে যত্নবান নয় প্রতিষ্ঠানটি। হাসপাতালে জেনারেটর ও আইপিএস সমস্যাসহ অসংখ্য ছোট ছোট সমস্যা আছে, যা জেলা পরিষদ চাইলেই মুহূর্তেই সমাধান সম্ভব, সেটাও হচ্ছে না অজানা কারণে। অস্ত্রোপচারকক্ষে মাত্র একটি বিছানা থাকায়, যেদিন গাইনি বিভাগের বিশেষজ্ঞ আসেন সেদিন সার্জারির কোনো কাজ হয় না, আবার যেদিন সার্জারির কাজ থাকে সেদিন গাইনির কাজ করা যায় না। অস্ত্রোপচারকক্ষের ফ্যান নষ্ট, আইপিএস বা জেনারেটর না থাকায় বিদ্যুৎ না থাকলে চার্জার দিয়ে অস্ত্রোপচার করতে হয়। অথচ জেলা পরিষদ চাইলে সমস্যাটির সমাধান কঠিন কিছু নয়। অন্যদিকে হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য জেলা পরিষদ থেকে মাসিক বরাদ্দের পরিমাণও বিস্ময় জাগানিয়া, মাত্র দুই হাজার টাকা। তবে জেলা পরিষদ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পাঁচজন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে, যাঁদের বেতন-ভাতা তারা দিয়ে থাকে।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বে থাকা সদস্য মুছা মাতব্বর কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা ধীরে ধীরে চেষ্টা করছি। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাজ করা কঠিন হয়ে ওঠে। নতুন ভবন ও ২৫০ শয্যার হাসপাতাল চালু হলেই সমস্যা অনেক কেটে যাবে। এ সময় এই প্রতিবেদকের অনুরোধে তিনি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই হাসপাতালে আইপিএস ও জেনারেটর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

আড়াই শ শয্যার হাসপাতাল কত দূর : আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় জেলা রাঙামাটির প্রধান হাসপাতালটি ৩১ বছর ধরেই ১০০ শয্যার। মাঝে এই হাসপাতালকে ২৫০ শয্যার করার ব্যাপারে জোর তত্পরতা শুরু হয়। গত ২৫ জানুয়ারি বর্তমান হাসপাতাল ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় উল্টো আট মাস ধরে ৫০ শয্যার সুবিধা দিতে পারছে হাসপাতালটি। হাসপাতালের প্রস্তাবিত নতুন ভবনের জন্য কেবল মাটি পরীক্ষার কাজ হয়েছে। নির্মাণকাজ কবে শুরু হবে সেটা কেউ জানে না।

ভবন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এখন নকশা তৈরির কাজ চলছে। আগামী ২০ দিনের মধ্যেই দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং ভবনের পুরো কাজ শেষ হতে আনুমানিক দেড় বছর সময় লাগতে পারে।

কী হবে বর্তমান ভবনের : প্রায় আট মাস আগে বর্তমান ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করতে গিয়ে মূল ভবনে ফাটল দেখা দেয়। দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় নারী ও শিশু ওয়ার্ড, ল্যাবরেটরিসহ বেশ কয়েকটি বিভাগ। বর্তমানে পরিত্যক্ত পড়ে আছে ভবনের বড় এ অংশটি। কিন্তু জেলা পরিষদ, গণপূর্ত বিভাগ কিংবা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানাতে পারেনি এ অংশটি মেরামত সাপেক্ষে পুনর্ব্যবহার করা যাবে কি না বা ভেঙে ফেলতে হবে কি না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসক মংক্য চিং মারমা সাগর। কিন্তু সেসব চিঠির প্রত্যুত্তর আর আসেনি।

হাতছাড়া হাসপাতালের ভবন ও জমি : রাঙামাটি সদর হাসপাতাল মোট ১২ একর ৯০ শতক ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দখলে আছে মাত্র আট একর। বাকি প্রায় পাঁচ একর জমি এরই মধ্যে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় দখল হয়ে গেছে। রাজনৈতিক রোষের ভয়ে সে জমি উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নেন না কোনো সিভিল সার্জনই। শুধু জমি হারানোই নয়, হাসপাতালের চিকিৎসকদের দুটি আবাসিক ভবন  ও কার্ডিওলজি বিভাগের বড় ভবনটিতে রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজের কার্যক্রম চালু হওয়ার পর ভবনগুলোর মালিকানাও হারায় প্রতিষ্ঠানটি। সংগত কারণেই রাঙামাটি হাসপাতালে বদলি হয়ে আসা চিকিৎসকদের এখন থাকার কোনো জায়গা নেই। তাঁরা বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। ফলে হাসপাতালের তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনেও তাঁদের পেতে দেরি হয়।

তবে আশার কথা শুনিয়েছেন রাঙামাটির সিভিল সার্জন ডা. শহীদ তালুকদার। তাঁর নেতৃত্বেই কিছুদিন ধরে কিছুটা হলেও বদলে যেতে থাকা হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী এই চিকিৎসক বলেন, আমি চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার একার পক্ষে সব কিছু সম্ভব নয়। রাঙামাটির মানুষ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা প্রয়োজন। সবাই এগিয়ে এলে এবং প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের প্রতিষ্ঠান ভাবলেই অনেক সমস্যা সহজ হয়ে যাবে। সেটা হলে হাসপাতালটিকে একটি আদর্শ ও উন্নত হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব আমরা।

 


মন্তব্য