kalerkantho


বহির্বিভাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

মোশাররফ হোসেন সাতক্ষীরা   

৩০ আগস্ট, ২০১৭ ১১:০২



বহির্বিভাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

সকাল সাড়ে ৮টা। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতলের জরুরি বিভাগ। চিৎকার-চেঁচামেচি। আল্লাগো মরে গেলাম। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। তিন-চারজন বাইরের যুবক দৌড়ে এসে জানতে চাইলে একজন জানান, তাঁর পা ভেঙে গেছে। আর একজনের পেটে ব্যথা। বাইরের যুবকরা তাঁদের সেবা দিতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। পরে জানা গেল, এই যুবকরা হাসপাতালে মাস্টাররোলে কর্মরত। ১১টার পর হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের সামনে রোগীর লম্বা সারি। বহির্বিভাগে ঢুকে কথা হয় সদর উপজেলার মিলগেট এলাকার পালপাড়া থেকে আসা লক্ষ্মী চক্রবর্তীর (৬৭) সঙ্গে।

তিনি জানান, গত সোমবার সকাল ১১টায় চিকিৎসক দেখাতে এসেছিলেন তিনি। কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে দুপুর ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে চিকিৎসক না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান।

তিনি আরো জানান, তাঁর হাত-পা ঝিনঝিন করে, তলপেটে ব্যথা, উঠতে-বসতে কষ্ট হয়। আবার ফিরে যেতে হয় এমন আশঙ্কায় আজ (গতকাল মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৮টায় এসেছেন চিকিৎসকের কাছে। সকাল ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তিনি চিকিৎসক দেখাতে পারেননি। তাঁর মতো আরো শতাধিক রোগীও চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছিল বহির্বিভাগের বহির্বিভাগের সামনে। তাদের ছবি তোলার সময় পাশের কক্ষ থেকে ছুটে আসেন হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ফরহাদ জলিল। তিনি এ প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। পরিচয় জানার পর একপর্যায়ে এ বিভাগের চিকিৎসকরা কেউ জরুরি অস্ত্রোপচারে বাইরে আছেন, কারো ছেলে অসুস্থ, তাই আসতে দেরি হচ্ছে বলে জানান। এরপর ফিরে গিয়ে তিনি রোগী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত বহির্বিভাগের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর কক্ষে চিকিৎসক আসেননি।

কথা হয় কুলিয়া গ্রামের আব্দুস সবুরের স্ত্রী মোসলেমার (৪৭) সঙ্গে। তিনি জানান, বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার খোলার পর সকাল ৯টার দিকে তিনি সারিতে দাঁড়িয়ে টিকিট করেন। সকাল সাড়ে ১১টায় যখন তাঁর সঙ্গে কথা হয় তখনো তিনি অপেক্ষা করছিলেন চিকিৎসকের জন্য। এর আগে সকাল ১০টায় সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে অসুস্থতার কারণে কাতরাচ্ছিলেন সদর উপজেলার ঘোনা গ্রামের আমজেদ শেখের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৫১)। কোমরের ব্যথায় কুঁচকে যাওয়া জাহানারা একপর্যায়ে ধুলো-মাটি ভর্তি মেঝেতে বসে পড়েন। বলছিলেন, আর পারছি না। দম বন্ধ হয়ে আসছে।

কমলা বেগম (৫০) কয়েক দিন ধরে জ্বর ও মাথাব্যথায় ভুগছেন। বসে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন ভ্যানচালক স্বামী নিছার আলী ফকির। তিনি জানালেন, কমলা পরের ক্ষেতে দিনমজুরি করেন। সাত-আট দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন। গ্রামের চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ কিনে খেয়েছেন। জ্বর কমে গেলেও মাথাব্যথা সারছে না। মাথা উঁচু করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। দেবহাটা উপজেলার হাফেজ তুল্যার ছেলে আব্দুস সোবহান (৫৫) জানান, সারা দিন কায়িক পরিশ্রম করার পর রাতে ঘুম হয় না। তাঁর পায়ের শিরা চিনচিন করে। যন্ত্রণা হয়। স্থানীয় চিকিৎসকের ওষুধে কাজ হয়নি। তাই হাসপাতালে এসেছেন চিকিৎসক দেখাতে। চিকিৎসক আসেননি, তাই বসে আছেন।

সোবহানের মতো সদর উপজেলার তলুইগাছা গ্রামের নুরউদ্দিন (৫৪) বলেন, সেই সকাল থেকে বসে আছি। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ নিয়ে তবে বাড়ি ফিরব। তিনি জানান, সকাল ৯টার আগেই হাসপাতালে এসেছেন। টিকিট কিনে বসে আছেন। তাঁর চিকিৎসক ৯ নম্বর কক্ষের অর্থোসার্জন মো. হাফিজ উল্লাহ। তিনি যথাসময়ে না আসায় সেখানে প্রায় ২০-২৫ জন রোগী অপেক্ষা করছেন।

চিকিৎসা পেতে রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন অপেক্ষা কেন জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তওহিদুর রহমান বলেন, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালটি ২০০০ সালে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এত বছর পরও হাসপাতালটি আগের জনবল দিয়েই চলছে। পরিবর্তন যা হওয়ার, তা হলো ৫০ রোগীর স্থলে ১০০ জনের খাবার দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে রোগীদের সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। এর পরও হয়তো কিছু সমস্যা থাকছে।

ডা. তওহিদুর রহমান একই সঙ্গে জেলার সিভিল সার্জন। তিনি আরো বলেন, এখানে ২৭ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের জায়গায় আছেন মাত্র ১৫ জন। প্রতিদিন রোগী থাকে গড়ে ২৫০ জন। হাসপাতালে নতুন জনবল নিয়োগ হলে সমস্যার সমাধান হবে বলে আশাবাদী তিনি।

সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলা ছাড়াও আশপাশের যশোরের কেশবপুর, মণিরামপুর, খুলনার পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া উপজেলার মানুষও এখানে চিকিৎসা নিতে আসে। এ এলাকার মানুষের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে চালু হয়েছে সিটি স্ক্যানসহ নানা পরীক্ষা। করা হচ্ছে নতুন বিভাগ ও ইউনিট। যন্ত্রপাতিও আছে, কিন্তু প্রশিক্ষিত লোকবল না থাকায় সমস্যা কমছে না।    

গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত হাসপাতালে অবস্থান করে দেখা গেছে, অর্থোপেডিক, সার্জারি, শিশু বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগ ও ইউনিটে রোগীদের অপেক্ষা। কিছু অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে রোগীকে স্ট্রেচারে বহনকারী অনেকেই বহিরাগত। তারা সুযোগ বুঝে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে বকশিশ নেয়। বহির্বিভাগ এলাকায় সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে বিভিন্ন ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের। তাঁরা রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র চেয়ে নিয়ে নিজের কম্পানির ওষুধের নাম দেখে নিচ্ছিলেন। একজন বললেন, ‘আমার এক আত্মীয় অসুস্থ। তাকে দেখতে এসেছি। তারা আমার বন্ধু। তারা আমার আত্মীয়কে দেখতে এসেছে। ’

হাসপাতালে জরুরি সেবা দেওয়া চিকিৎসকদের ১১০, ১১৬, ১১৭, ১১৯, ১২১, ১২২, ১২৩ ও ১২৪ নম্বর কক্ষগুলোর দরজা সারা দিন বন্ধ ছিল। বন্ধ থাকা কক্ষগুলোর ছবি তোলার সময় সেখানে অপেক্ষমাণ বাইরের ক্লিনিকে রোগী ভাগানোর এক দালাল এসে কারণ জানতে চান। পরিচয় পাওয়ার পর তিনি নিজেকে কলেজছাত্রী পরিচয় দিয়ে সটকে পড়েন। সারা দিন তাঁকে আর দেখা যায়নি। পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে স্থানীয় ফার্মেসির দুই-একজন কর্মচারীকে মাঝেমধ্যে যাওয়া-আসা করতেও দেখা গেছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক জানান, বাইরের কেউ রোগীর স্বজনদের সাহায্য করে বকশিশ নিতে পারে। তবে এসব নিয়ে তাঁর কাছে কোনো অভিযোগ নেই। চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের বিরক্ত করায় সম্প্রতি দুই ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিকে পুলিশ পাকড়াও করেছে। হাসপাতালে পুলিশের কড়া নজরদারিও রয়েছে। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 


মন্তব্য