kalerkantho


তিন কম্পানির একই ইনজেকশন আনতে বলেন নার্সরা

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা   

৩১ আগস্ট, ২০১৭ ১১:৩০



তিন কম্পানির একই ইনজেকশন আনতে বলেন নার্সরা

তালা উপজেলার নগরঘাটা গ্রামের শাহজাহান সরদারের স্ত্রী নাছিমা বেগম আগে একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসক যেসব ওষুধ লেখেন তা হাসপাতালে পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে সব কিনতে হয়। রাতে নার্সরা তিন কম্পানির একই ইনজেকশন কিনে আনতে বলেন। একটি পুশ করে দুটি তাঁরা নিয়ে যান। তিনি বলেছিলেন, আজ (গতকাল) তিনি বহির্বিভাগে এসেছেন। শুধু চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়েই চলে যাবেন। সদর উপজেলার পলাশপোল গ্রামের শাহ আলমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৪৬) জানান, কানের যন্ত্রণা নিয়ে তিনি গত ছয় মাসে চারবার হাসপাতালে এসেছেন। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র লেখার পর হাসপাতাল থেকে যে ওষুধ দেওয়া হয় তা খেয়ে কাজ হয় না।

গতকাল বুধবার সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত অবস্থান করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে এসব চিত্র দেখা যায়। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও বিস্তর অভিযোগ করে রোগী ও তাদের স্বজনরা।

দুপুর ১২টায় পুরুষ ওয়ার্ড-১ (সার্জারি)-এর বারান্দায় বসে কাতরাচ্ছিলেন সদর উপজেলার আখড়াখোলা গ্রামের জোহর আলীর ছেলে সিরাজুল ইসলাম (৪৯)। পাশে স্ত্রী ও মেয়ে। পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তিনি পাঁচ দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বারান্দায় কেন জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম জানান, শয্যা নেই। তাই বাইরের বারান্দায় তাঁর ঠাঁই হয়েছে। পাশ থেকে তাঁর মেয়ে পপি খাতুন জানান, ভেতরে টয়লেট থেকে গন্ধ আসে। ব্যবহারের অনুপযোগী। চিকিৎসাসেবাও যেনতেন। সরকারি হাসপাতালের অবস্থা যেন গরিবের সংসার। রোগী রেখে ওষুধের জন্য বাইরে দৌড়াতে হয়। হাসপাতাল থেকে তিন বেলা তিন-চারটা বড়ি ছাড়া ওষুধ দেওয়া হয় না। কোন ওষুধের কী দাম তা তো সবাই জানে না। রোগীর কথা চিন্তা করে দর-কষাকষি না করে বেশি দামেই ওষুধ কিনতে হয়। সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতালের ভেতরেই দোকান দিয়ে যদি ওষুধ বিক্রির ব্যবস্থা করা হতো তাহলে ন্যায্য মূল্যে ভালো মানের ওষুধ কেনা যেত। হাসপাতাল থেকে পর্যাপ্ত ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ এ রকম আরো অনেকের।

হাসপাতালের সমাজসেবা কর্মকর্তা শেখ আব্দুল আওয়াল জানান, এখানে রোগীর প্রচুর ভিড়। তাদের মধ্যে গরিব মানুষের সংখ্যাই বেশি। হাসপাতাল থেকে সাধ্যমতো ওষুধ রোগীদের দেওয়া হয়। এ ছাড়া গত পাঁচ মাসে তাঁরা হাসপাতালের রোগী কল্যাণ তহবিল থেকে ৮৮০ জন গরিব ও অসহায় রোগীকে চার লাখ ২৬ হাজার ২০৭ টাকার ওষুধ বিনা মূল্যে দিয়েছেন।

হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মো. কামরুল ইসলাম জানান, হাসপাতালের বহির্বিভাগে যেসব রোগী দেখা হয় তাদের ওষুধের কোনো সংকট নেই। চাহিদামতো সরবরাহ না থাকলেও যে পরিমাণ ওষুধ পাওয়া যায় তা দিয়েই চলে যায়। তবে আন্তবিভাগে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের মারাত্মক সংকট। নেই বললেই চলে। কর্মী সংকটের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে দায়িত্ব পালনকারী তিনজনের স্থলে আছেন একজন। বাধ্য হয়েই বাইরের লোক এনে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।

এ বিভাগে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, হাসপাতালের চিকিৎসকরা যদি বরাদ্দকৃত ওষুদের মধ্য থেকে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেন তাতেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অনেকেই অজ্ঞাত কারণে বরাদ্দ থাকা ওষুধের বাইরে বিভিন্ন কম্পানির ওষুধ লেখেন। ফলে অনেক রোগীকেই তখন বাইরের ওষুধ কিনতে হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে প্যারাসিটামল আছে। ডাক্তার যদি নাপা লেখেন সেটা তো হাসপাতালে পাওয়া যাবে না। ’

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ফরহাদ জামিল বলেন, শয্যার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি রোগী সব সময় ভর্তি থাকে। তা ছাড়া দুর্ঘটনা বা জরুরি প্রয়োজনের জন্য ওষুধ মজুদ রাখতে হয়। হাসপাতালে রোগীদের ওষুধ মজুদ থাকা সাপেক্ষে দিতে হয়। সবাইকে সব ওষুধ সব সময় হয়তো দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে বেশির ভাগ ওষুধ হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হয়।

হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পূর্ব দিকের মেঝেতে শুয়ে আছে চার-পাঁচজন নারী রোগী। নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে ভর্তি হলেও শয্যা খালি না থাকায় মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে তাদের। সকালে শয্যা দেওয়া হলেও ভেতরের দুর্গন্ধময় পরিবেশ দেখে তারা বারান্দার মেঝেতে শুয়ে বসেই চিকিৎসা নিচ্ছে বলে জানায়।

জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. তওহিদুর রহমান বলেন, এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতো কর্মচারীরও তীব্র সংকট। পাঁচজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মধ্যে একজন অবসরে। বাকি চারজন দিয়েই পুরো হাসপাতালের কাজ করানো হচ্ছে। পরিবেশ ভালো রাখার জন্য মাঝেমধ্যে বাইরে থেকে শ্রমিক এনেও পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হয়।

সদর উপজেলার কুশখালী গ্রামের বিক্রম দাসের স্ত্রী কালীদাসী (৬০) কোমরে ব্যথা নিয়ে ছেলে কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন চিকিৎসক দেখাতে। চিকিৎসক এক্স-রে করার পরামর্শ দিলে অল্প বয়সী এক লোক (দালাল) তাঁকে ধরে নিয়ে ফটকের বাইরে যায়। হাসপাতালের রিপোর্ট ভালো হয় না বলে তাঁকে ডিজিটাল এক্স-রে করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ওই লোক। এ প্রতিবেদক সেখানে হাজির হলে ক্লিনিকের দালাল ওই নারীর কাছ থেকে নেওয়া চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে যায়।

সিভিল সার্জন ডা. তওহিদুর রহমান বলেন, ৫০ শয্যার হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও জনবল সেই ৫০ শয্যার মতোই আছে। এক্স-রে মেশিনটি দুর্বল হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে কাজ হয় না। নতুন আরেকটি আনা হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যেই সেটি স্থাপন করা হবে। তখন এক্স-রের সমস্যা আর থাকবে না।

 


মন্তব্য