kalerkantho


যন্ত্রপাতি থাকলেও রোগীকে যেতে বলা হয় প্রাইভেট ক্লিনিকে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১০:৪৬



যন্ত্রপাতি থাকলেও রোগীকে যেতে বলা হয় প্রাইভেট ক্লিনিকে

মঙ্গলবার সকাল ৮টা। মাদারীপুর সদর হাসপাতালের প্রধান ফটক খোলা।

ভর্তি রোগীদের আত্মীয়-স্বজন ছাড়া তেমন কাউকে দেখা গেল না। শুধু জরুরি বিভাগে দুজন কর্মচারী বসে আছেন।

সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট। তখন অজয় নামের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ঝাড়ু দিতে দেখা গেল। ৯টায় হাসপাতালের বহির্বিভাগের পুরুষ কাউন্টারে এলেন একজন কর্মচারী। ২০ মিনিট পর নারী রোগীদের জন্য নির্ধারিত কাউন্টারে এলেন আরেক কর্মচারী। এর মধ্যেই রোগীদের সারি দীর্ঘ হয়ে গেছে।

সকাল ৯টা ২২ মিনিটে হাসপাতাল ভবনের দোতলায় বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা গেল দাঁতের চিকিৎসক ডা. আশরাফুল আলম খান রোগী দেখছেন। তবে পাশের অর্থোপেডিক চিকিৎসক বায়জিদ মোস্তফা, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. হাসানুজ্জামান, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জহিরুল ইসলাম খানের কক্ষে তখনো তালা।

মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব রাস্তি গ্রাম থেকে আসা ৭৫ বছরের সামান বানু বলেন, 'আমি অনেক কষ্ট করে চোখের ডাক্তার দেখাতে এসেছি; কিন্তু ডাক্তার নেই। ডাক্তার নাকি অপারেশন করছে। তাকে আজ পাওয়া যাবে না। তাই চলে যাচ্ছি। '

সদর উপজেলার হোগলপাতিয়া গ্রামের মো. মোবারক হোসেন বলেন, 'আমিও চোখের ডাক্তার দেখাতে এসেছি; কিন্তু ডাক্তার নেই। তাই চলে যাচ্ছি। যদি আগে থেকে জানতাম অপারেশনের জন্য ডাক্তার পাওয়া যাবে না, তাহলে আমরা আজ আসতাম না। ' আরো কয়েকজন রোগী ও রোগীর সঙ্গে আসা স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে একই কথা বলে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. হাসানুজ্জামান ১৫ জন রোগীর চোখের অস্ত্রোপচার করবেন। তাই আজ রোগী দেখবেন না তিনি। দুপুর ২টা পর্যন্তও তাঁর দেখা মেলেনি। তিনি অস্ত্রোপচার কক্ষে ছিলেন বলে জানা যায়।

নারিকেলগাছ থেকে পড়ে হাতে ব্যথা পেয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার পাঁচখোলা গ্রামের শাহাউদ্দিন মাতব্বরের ছেলে মো. শিপন সকাল ৯টায় এসেছেন অর্থোপেডিক চিকিৎসক দেখানোর জন্য। সাড়ে ১০টা বাজলেও চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। তিনি বলেন, 'ডাক্তার কখন আসবেন জানি না। ব্যথায় কষ্ট হচ্ছে। '

রাজৈর উপজেলার মাছচর গ্রাম থেকে এসেছেন রাজিয়া সুলতানা। তিনি তাঁর তিন মাসের মেয়েকে পায়ের চিকিৎসার জন্য অর্থোপেডিক চিকিৎসক দেখাতে নিয়ে এসেছেন। এ সময় দেখা যায়, শিশুর এক আত্মীয় ব্লেড দিয়ে শিশুটির পায়ের ব্যান্ডেজ খুলছেন। জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, চিকিৎসক তো ব্যান্ডেজ খোলেন না। তা ছাড়া রোগীর ভিড় থাকে। আগেরবারও তাঁরা খুলেছিলেন। এবারও তাই খুলছেন। চিকিৎসক এখনো আসেননি। তাঁরা কাজটি এগিয়ে রাখছেন।

পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অর্থোপেডিক চিকিৎসক ১১টার পর এসেছিলেন। কিছুক্ষণ রোগী দেখে আবার চলে যান।

দুপুর দেড়টার দিকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শশাংক চন্দ্র ঘোষের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ডা. বায়জিদ মোস্তফা আজ এসেছেন এবং রোগীও দেখেছেন। বর্তমানে তিনি অপারেশন রুমে আছেন। '

কালকিনি উপজেলার ভূরঘাটা থেকে ইতি বেগম ১৭ মাস বয়সের শিশু ইউসুফকে নিয়ে সকাল ৮টায় শিশু বিভাগে এসেছেন; কিন্তু দুপুর ১২টা পর্যন্ত বসে থেকেও চিকিৎসককে পাননি। শিশুটি খাট থেকে পড়ে মাথায় ব্যথা পেয়ে বমি করছিল। ইতি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'ডাক্তার এখনো আসেননি। কী করব বুঝতে পারছি না। '

শিবচর উপজেলার শেখপুর থেকে ঠাণ্ডার সমস্যা নিয়ে আসা শিশু সায়মার মা শান্তা বেগম বলেন, 'ডাক্তার আসেনি। অনেক দূর থেকে এসেছি। কাল আবার আসা সম্ভব না। '

অপেক্ষা করে করে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাত-আটজন নারীকে তাঁদের শিশুসন্তানদের নিয়ে চলে যেতে দেখা যায়।

এ ব্যাপারে মাদারীপুর সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার দাস বলেন, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জহিরুল ইসলাম খান ওয়ার্ডে রোগী দেখার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর ডায়াবেটিস বেড়ে গেছে। তাই তিনি ছুটি নিয়েছেন।

সরেজমিনে গিয়ে আরো দেখা যায়, মাদারীপুর সদর হাসপাতালে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ রোগী এসব পরীক্ষার জন্য চলে যায় বেসরকারি ক্লিনিকে। রক্ত পরীক্ষা, টিসি, ডিসি, এইচবি, ইএসআর, ব্লাড স্কিনিং, এইচআইভি, ম্যালেরিয়া প্যারাসাইট, ডিডিআরএল, আরএইচ টাইপ, মল পরীক্ষা, মূত্র পরীক্ষা, সিরাম, কোলেস্টেরলসহ নানা পরীক্ষা অল্প টাকায় সদর হাসপাতালে করার ব্যবস্থা আছে; কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক রোগীই এসব পরীক্ষার জন্য বেসরকারি ক্লিনিকে যায়।

হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানকার চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরীক্ষার জন্য রোগীদের সেতারা জেনারেল হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালের মেশিন ভালো না- এ কথা বলে তাদের ওই ক্লিনিকে পাঠানো হয়।

সদর উপজেলার পক্ষীরা গ্রামের শাহ আলম মৃধা, শ্রীনদী গ্রামের রফিকুল ব্যাপারী, কাঠপট্টি এলাকার ননী গোপাল দাস, কালকিনির কালীনগরের সেকন মোল্যা, রাস্তি গ্রামের শহীদ চৌধুরী, ছিলারচরের দেলোয়ার খান, খোয়াজপুরের মো. আলী ও কামরুল হাসান, মিঠাপুরের সৌরভ ব্যাপারী, কালী বাজারের নুসাইবা, কমলাপুরের রাবেয়াসহ ২৫-৩০ জন রোগী জানায়, হাসপাতাল থেকে তাদের বলা হয়েছে এখানকার যন্ত্র ভালো না, তাই তারা যেন সেতারা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে আনে। তারা সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এর মধ্যে অনেক রোগী সদর হাসপাতাল থেকে এক্স-রে করিয়েছে; কিন্তু তাদের সেই এক্স-রে ভালো হয়নি। তাই ডিজিটাল এক্স-রে করতে সেতারা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন জানায়, এখানে অনেকগুলো ক্লিনিক থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ রোগীকে সেতারা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এ ব্যাপারে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. শশাংক চন্দ্র ঘোষ বলেন, হয়তো কোনো রোগী রাতে ভর্তি হয়েছে। তখন হাসপাতালে তার পরীক্ষা করা সম্ভব না। সে ক্ষেত্রে হয়তো কোনো রোগী পরীক্ষার জন্য যেতে পারে।

মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার দাস বলেন, 'ব্যাপারটি আমার জানা নেই। আমাদের হাসপাতালেই এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রামসহ নানা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাই রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে যাওয়ার দরকার নেই। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। '


মন্তব্য