kalerkantho


ধারাবাহিক উপন্যাস

বিষণ্ন শহরের গল্প

সেলিনা হোসেন

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিষণ্ন শহরের গল্প

অঙ্কন : বিপ্লব

ছয়

সুজন বুঝতে পারে, ওর সময় গড়াচ্ছে না। সময় এই ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে আছে। প্রতিদিন জেলে লক-আপ হয়। আজকেও নিশ্চয়ই হয়েছে, কিন্তু ওকে লক-আপে নেওয়া হয়নি। ছাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলছে, সময়ের ঘড়ি চলছে। হাতঘড়ি এখন সঠিক টাইম দিচ্ছে। আর এর সঙ্গে আমার সময় ফুরোচ্ছে।

হো-হো-হো, সময় ফুরোচ্ছে—চিৎকার করে সুজন। ফুরোচ্ছে?

—কেন, আমি কী করেছি যে সময় ফুরোবে? খুন করা আমার রাইট। আমি খুন করতেই পারি মুনিরাকে। ও দিনের পর দিন আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে।

—খামোশ! থাম বলছি।

—তুমি আমার ব্যাপারে নাক গলিয়ো না, শহর।

—কেন গলাব না? তুই আমার ওপর টিকে আছিস না? তুই তো সমুদ্রে ভেসে নেই। একদম চুপ করে থাক, বানর ছেলে।

—খবরদার! তুমি আমাকে শাসাবে না। আমি তোমার ধার ধারি না।

চিৎকার করতে থাকে সুজন। গালিগালাজ করে। ও জানে, শহর শুধু কথা বলতে পারবে, আর কিছু পারবে না। মনের আনন্দে গালিগালাজ করার এখনই সময়। ও চিৎকার করে গালি দিতে থাকে। মুখে যা আসে তা বলতে থাকে।

একসময় প্রবল চিৎকারে শহর বলে, চুপ কর বলছি। নইলে ঘরের মাটি দুই ফাঁক হয়ে যাবে। সেই গর্তে মরে পড়ে থাকবি। মনে রাখিস, সহ্য করার সীমা আছে।

—তুমি কী বলতে চাচ্ছ বলো?

—আমি চাই তুই ফাঁসির দড়িতে ঝোলার আগে মুনিরার কথা মনে করবি। মুনিরার ভালোবাসার কথা মনে কর, শয়তান।

বুকের ভেতরে কড়কড় শব্দ নিয়ে সুজন উচ্চারণ করে, মুনিরা।

ওহ, মুনিরা! বিয়ের রাতে তুমি আমাকে বলেছিলে, তোমার জন্যই আমার ভালোবাসা রাখা আছে। আমি আর কোনো পুরুষকে ভালোবাসার কথা বলিনি।

—ওহ, মনিরা! তুমি আমার চোখের সামনে এক মায়াবী অপ্সরা। ভরিয়ে রেখো আমার জীবন।

—পারব কি?

—কেন পারবে না? অবশ্যই পারবে।

—তুমি আমাকে...

—আহ্, নিজের কথা ভাবতে হয় না, অপ্সরা।

—আমাকে শুধুই তোমার কথা ভাবতে হবে?

—হ্যাঁ, তা তো বটেই। আমি ছাড়া তোমার আর কে থাকবে!

—অবশ্য কেউ না। মুনিরা হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করেছিল।

ওর দিকে তাকিয়ে নিজের মুগ্ধতায় ডুবে গিয়েছিল সুজন।

মুনিরা প্রশ্ন করেছিল, তুমি কি কাউকে ভালোবেসেছ?

—এসব কথা থাক। এমন কথা শুনতে ভালো লাগে না।

—ঠিক আছে, থাক। তাহলে বলো, তোমাকে কী নামে ডাকব?

—কী নামে ডাকবে? সুজন এক মুহূর্ত ভেবে বলেছিল, ভালুক নামে ডেকো।

—ভালুক? কী বলছ? তুমি ভালুক হবে কেন? ফান করছ?

—মোটেই ফান করছি না। আমি পশু ভালোবাসি।

—পশু ভালোবাসলে নিজেকেও পশুর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে?

—এটাই ভালোবাসার স্বরূপ।

—তুমি কি আমাকেও এভাবে ভালোবাসবে? আমাকে কী নামে ডাকবে?

—তোমাকে? তোমাকে আমি কয়েকটি নামে ডাকব। প্রথমে চোখের মণি।

মুনিরা হাসতে হাসতে বলেছিল, তার পরে? সুজন একমুহূর্ত না ভেবে বলেছিল, তার পরে কড়ে আঙুল।

—এটা কোনো নাম হলো?

—হলো হলো, এক শবার হলো। আমি তোমাকে ভালোবাসলে তোমার শরীরের প্রতিটি অঙ্গই আমার ভালোবাসার নাম হবে। তোমাকে কখনো পায়ের পাতা ডাকব, কখনো চুলের রাশি। নইলে সিঁথির বাঁশি। নইলে ভুরুর ছবি।

—আরে বাব্বা, তুমি কবির মতো কথা বলছ!

—আজ আমাদের বাসর রাত গায়ের রং। এই রাত তো একটি অন্য রকম রাত, অবশ্যই সুরেলা কণ্ঠ। মুনিরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিল। উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। বলেছিল, এত ভালোবাসা নিয়ে আমি কত দিন বাঁচতে পারব।

—হাজার বছর। নিজেও হাসিতে মেতে উঠেছিল সুজন। হাজার বছর—হাজার বছর—বলতে বলতে বুকে টেনেছিল মুনিরাকে। মুনিরা ওর বুকে মাথা ঘষে বলেছিল, তুমি তো আমাকে অনেক নামের কথা বললে, তোমার জন্যও আমার অনেক নাম বের করতে হবে। আমি তো অনেক নামে তোমাকে ডাকতে পারব না।

—কেন পারবে না? পারবে।

—যেমন শূকর, বানর, কচ্ছপ, ব্যাঙ, গরু, ষাঁড়, ছাগল—

—থাম, থাম। এ সবই প্রাণিকুল। তোমার মনে চাইলে তুমি ডাকবে। আমি কিছু মনে করব না। আমি সব পশু পছন্দ করি।

—না, তা হবে না। আমি সব পশুর নামে তোমাকে ডাকতে পারব না। আমি তোমাকে হরিণ ডাকব।

—হরিণ আমার বেশি পছন্দের নাম না। হরিণ খুব সুন্দর। আমি হরিণের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারি না। কারণ আমি এত সুন্দর না।

—তুমি খুব সুন্দর। হ্যান্ডসাম।

—আমি শুধু চেহারার সুন্দরকে সুন্দর বলি না। ব্যবহারেরও সৌন্দর্য থাকতে হয়।

—বাব্বা, তুমি একটা অন্য রকম মানুষ।

—অন্য রকম? হয়তো তাই। আমি অন্য রকমই। তবে এই অন্য রকম মানুষকে বোঝা কঠিন। আমার মা বলেন, ছেলেটাকে বোঝাই মুশকিল। এখন এই রকম, তো তখন ওই রকম। একদিন তুমিও এই কথা বলবে, মুনিরা।

—না, আমি বলতে চাই না। আমি তোমাকে শরীরে ও ব্যবহারে হ্যান্ডসাম পেতে চাই। তুমি কি আমার ইচ্ছা পূরণ করবে?

সুজন ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলে, কঠিন কাজ। কঠিন কাজ আমি করতে পারি না।

—আমার জন্যও পারবে না?

—বোধ হয় না। এই বাসর রাতে আমি তোমার সঙ্গে মিথ্যা বাখোয়াজি করব না।

মুনিরা মন খারাপ করে চুপ হয়ে যায়। সুজন মাথা থেকে পাগড়ি খোলে। নিজেরাই ঠিক করেছিল যে ঘুমানোর আগে পর্যন্ত তারা বিয়ের পোশাক খুলবে না। মুনিরা ওর দিকে তাকায় না। বিষণ্ন হয়ে বসে থাকে।

—তোমার কি মন খারাপ হয়েছে চুলের রাশি?

—হ্যাঁ, হয়েছে।

—আমি তো সত্যি কথাই বলেছি।

—সব সত্যি কথার সঙ্গে আবেগ থাকে না। তোমার সঙ্গে আমি একমত নই। আমি নিজে কোনো কোনো কঠিন কাজ তোমার জন্য করতে পারব। যদি তুমি সেই আবেগকে ভালোবাসার সঙ্গে দেখো।

—রাত দুপুর হয়ে গেছে। এখন আমরা ঘুমাব।

—আমার ঘুম পাচ্ছে না। তোমার কথা শুনে আমার ঘুম পালিয়ে গেছে।

—বাজে কথা বলো না, পায়ের পাতা।

—মোটেই বাজে কথা বলছি না, ছাগল।

—তাহলে তুমি কি চাও যে আমি এ ঘর থেকে চলে যাই।

—না, চাই না। বাড়ির মুরব্বিরা কষ্ট পাবেন। তাঁরা যখন দেখবেন যে বাসর রাতেই আমরা কথা কাটাকাটি করেছি—

সুজন ওর কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে, আমার বাড়ির মুরব্বিদের কঠিন দিন সামনে।

—কেন, তুমি কি কোনো অঘটন ঘটাবে?

—বাসর রাতে আমরা অনেক বাজে কথায় ঢুকে যাচ্ছি। রাতটি এমন হওয়া উচিত ছিল না।

—হ্যাঁ, ঠিক। চলো, ঘুমাই।

মুনিরা বাথরুমে যায়। কাপড় বদলায়। পরিপাটি হয়ে বিছানায় আসে। সুজনও কাপড় বদলায়। দুজন দুজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। হাসির আভায় উদ্ভাসিত চেহারা, যেন পৃথিবীর সব সরোবরে পস ফুটেছে।

—বাসর রাতে তোমাকে ভালোবাসা কড়ে আঙুল।

—এভাবে আর কাউকে বলবে না তো?

—আবেগের সময় প্রশ্ন করতে হয় না।

—হয়। যদি আবেগের জন্য অপমান থাকে।

—আমি বন্ধ করছি আলো। বিছানা হোক এখন সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

মুনিরা আর কথা বলে না। ও মনের মধ্যে প্রশ্ন রেখে বিছানায় যায়। বুঝে গেছে যে সুজন ওর কয়েকটি প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে। সরাসরি উত্তর তো দেয়ইনি, নিজের মনোভাবও প্রকাশ করেনি। ওর হৃদয় বাসর রাতের পুরো আনন্দে ভরে ওঠে না। মন খারাপ হয়ে যায়। চোখে পানিও আসে। অন্ধকারে সে পানি দেখতে পায় না সুজন। মুনিরা বালিশে মুখ ঘষে।

—এমন উল্টে গেলে যে? ভালো লাগছে না আমাকে?

মুনিরা কথা বলে না। ও বুঝে গেছে, সুজনের কোথাও কোনো ফাঁকি আছে? ওর শরীরও সায় দিচ্ছে না বাসর রাতের উষ্ণতায়।

সময় পেরিয়ে যায় রাতের প্রহরে। একসময় ঘুমিয়ে পড়ে দুজন। এক ঘুমে রাত পেরিয়ে যায় মুনিরার। এই ঘুমে ও কোনো স্বপ্ন দেখেনি। স্বপ্নহীন ঘুম কখনোই ওর পছন্দ হয় না। ঘুম ভাঙলে মন নিঃসাড় হয়ে থাকে। পাশে সুজন ঘুমোচ্ছে। দেখে মনে হয়, নিবিড় ঘুমে আচ্ছন্ন ও। মুনিরা উঠে পড়ে।

অদৃশ্য কণ্ঠস্বর ভেসে আসে—বেশ তো স্মৃতিচারণা করলে। এখন কি তোমার মেজাজ ঠিক হবে?

—না। একদমই ঠিক হবে না।

—কারণ, কিছুদিনের মধ্যে মুনিরা তোমার পরকীয়ার কথা জেনে যায়।

—তার পর থেকে ও আমার সঙ্গে সারাক্ষণই খারাপ ব্যবহার শুরু করে। একদিনও আমাকে ভালোবাসার কথা বলেনি।

—কেমন করে বলবে? মুনিরার কোনো প্রেম থাকলে তুমি কী করতে?

—মুনিরাকে মাথায় তুলে নাচতাম।

চিৎকার করে সুজন। গালাগালি করে শহরকে। শহর কিছুক্ষণ নিশ্চুপ শোনে। গালিগালাজ করে থামলে গোঁ গোঁ শব্দ বের হয় সুজনের কণ্ঠ থেকে।

—এভাবে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ কেন? শান্ত থাকতে পারো না?

—না, শান্ত থাকা সম্ভব না। এখন যদি মুনিরা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, তাহলে আমি ওকে আবার খুন করব। ও যতবার বেঁচে উঠবে, ততবার খুন করব।

—আসমাকে পেলে কী করতে?

—কী আবার করতাম, বিছানায় নিয়ে যেতাম। ও তো আমার জন্য স্বামী-সন্তান ছেড়ে এসেছে।

—কাজটি কি ঠিক করেছিল?

—ও যদি মনে করে ঠিক, তাহলে ঠিক ছিল? সেটা ওর ব্যাপার।

—তোমার ন্যায়-অন্যায় চিন্তা এতই কম। তুমি আসলে ঠিক চিন্তার মানুষ না।

—খবরদার! তুমি আমার সঙ্গে এসব কথা বলবে না। তোমার কাছে আমি ন্যায়-অন্যায় শিখতে চাই না।

—আর কখন শিখবে? শিখতে চাইলেও শিখতে পারবে না। তোমার সামনে এখন মরণের দুয়ার।

—খামোশ, চুপ কর।

স্তব্ধ হয়ে যায় চারদিক।

এখন সন্ধ্যা ছয়টা চল্লিশ মিনিট বাজে। জেল লক-আপ হয়, কিন্তু সুজনকে লক-আপে নেওয়া হয় না। ও বুঝে যায় যে কেন আজ ওকে লক-আপে নেওয়া হচ্ছে না। ও নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। বুঝতে পারে, ওর প্রান্তরে কোথাও পাখি নেই। এমনকি ক্ষুদ্র পোকামাকড়ও নেই। সুজন পাগলের মতো চারদিকে তাকায়। চিৎকার করতে থাকে—কে কোথায় আছিস, বেরিয়ে আয়।

কোথাও কোনো শব্দ নাই। সুজন ঘরের ভেতরে চরকির মতো ঘুরপাক খায়। কখনো চিৎকার করে, কখনো মাথা থাপড়ায়। একসময় থমকে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখে। নিজেকে বলে, এখন ঘড়ি আর সময় আমার বন্ধু। বন্ধুরা তোমরাই আমাকে আমার জীবনের শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দেবে।

অদৃশ্য কণ্ঠস্বর ওকে ধমকায়, তুই এত অস্থির হয়েছিস কেন?

—বুকের ভেতর তড়পাচ্ছে।

—কয়টা বাজে, দেখ?

—আটটা কুড়ি বাজে।

—তোর ফাঁসির কাগজপত্র চূড়ান্তভাবে অনুমোদন হয়ে গেল। সিগনেচার করা শেষ। কাগজপত্র ফাইলে রাখা হয়েছে।

—হবেই তো। যাক, তোমার কাছ থেকে সময়টা পেলাম। আজ সারা দিন সময় আমার বন্ধু থেকেছে। ঘড়ি আমার বন্ধু। আমি ঘড়ি হাতে রেখে মরতে চাই।

—সেটা হবে না। ঘড়ি হাতে রাখার অনুমতি তুই পাবি না।

—যতক্ষণ হাতে রাখতে পারি, ততক্ষণ রাখব। ওরাই খুলে নিক। আমাকে খুলতে বললে আমি খুলব না। আমি প্রতি মুহূর্তে সময়ের হিসাব করি।

—কঠিন কাজ করিস।

—কঠিন কাজই আজ আমার কাছে সহজ।

—এমন কথা তুই মুনিরাকে বলিসনি।

—তুই ওর নাম আমাকে বলবি না, শহর। আমি ওর কথা মনে করতে চাই না।

—জীবন নিয়ে দারুণ খেলা খেললি।

—ব্যস, থাম। সুজন ধমক দেয়।

আবার নীরব হয়ে যায় চারদিক। সুজন নিজেও স্তব্ধ হয়ে থাকে। মা-বাবাসহ আর কারো কথা ভাবতে পারছে না। মস্তিষ্কের শূন্যতার অনুভবে ও বিছানায় গড়িয়ে পড়ে।

 

চলবে


মন্তব্য