kalerkantho


নারীবাদ ও দাম্পত্য উপাখ্যান

শরীফ আতিক-উজ-জামান

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নারীবাদ ও দাম্পত্য উপাখ্যান

অঙ্কন : মানব

‘মা, মা, এসো। এখুনি টেলিভিশনে বাবার সাক্ষাৎকারটা দেখাবে। কই, শিগগির এসো।’ ১০ বছরের ছেলে পাভেল দুই-তিনবার চিৎকার করে ডাকার পরও যখন শাহানা এলেন না, তখন সে দৌড়ে গিয়ে মায়ের হাত ধরে টানতে টানতে ড্রয়িংরুমের সোফায় এনে বসিয়ে দিল। ওপাশে ইফতেখার টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে বসে আছেন, মৃদু মৃদু হাসছেন, সারা মুখে সাফল্যের একটা অহংকার ছড়িয়ে আছে যেন, আড়চোখে মাঝেমধ্যে শাহানাকে খেয়াল করছেন; কিন্তু মুখে কিছু বলছেন না। বিজ্ঞাপন শেষে টিভির পর্দায় ভেসে উঠল উপস্থাপিকার কড়া মেকআপে মোড়া মুখখানি। তার আড়াল থেকে মিষ্টি হেসে ঘোষণা করলেন, “এবার শুরু হচ্ছে ‘নারীচেতনা : এ সময়ের সংলাপ’ শীর্ষক একটি সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান, আমাদের আজকের বক্তা বিশিষ্ট নারীবাদী, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্বনামধন্য শিক্ষক প্রফেসর ইফতেখার মালেক। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করছেন একটি বেসরকারি সংস্থার নারী উন্নয়ন সেলের শীর্ষ নির্বাহী ড. মেহতাব এ খান।” আর অনুষ্ঠানটি পরিবেশিত হচ্ছে বলে এক ডজন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নাম বললেন।

সুন্দর সাজানো সেটে মুখোমুখি দুটি সিঙ্গেল সোফায় বসে প্রফেসর ইফতেখার ও ড. মেহতাব। সামনের গোল ছোট্ট কাচের টেবিলের ওপর একটি ফুলদানি আর দুজনের হাতে টিভি চ্যানেলের লোগোর ছাপ মারা চায়ের কাপ। আজকাল আড্ডার ঢংয়ে কথা হয় চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে। মন্দ লাগে না। একটা বৈঠকি আমেজ আনার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা থাকে। কখনো তা জমে ওঠে জ্ঞানী ও গুণী আলোচকের জ্ঞানগর্ভ আলোচনার কারণে, আবার কখনো তা একেবারেই ভেস্তে যায় আলোচকদের অসামর্থ্য ও বাচালতার কারণে। ইফতেখার আলোচনা খারাপ করবেন না, তা শাহানা জানেন; কিন্তু ... তার ভাবনাটা ছুটে যায় ড. মেহতাবের ভূমিকায় : আজ আমাদের এখানে উপস্থিত আছেন বিশিষ্ট গবেষক, নারীবাদী, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ প্রফেসর ইফতেখার মালেক, নারী বিষয়ে যাঁর রচিত নিবন্ধ দেশি-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেছেন। সম্প্র্রতি শিকাগোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে মূল প্রবন্ধকার ছিলেন তিনি। আজ আমরা তাঁর কাছ থেকে শুনব এই শতকে নারীর অবস্থান কোথায়। তাঁর কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন :

—একবিংশ শতাব্দীতে নারীকে কী চোখে দেখা হচ্ছে?

—দেখুন, নারীর প্রতি সমাজের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তার শিকড় অতীতের অনেক গভীরে প্রোথিত। ‘অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা’ কিংবা ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে’ যে রচনা, তা নারীর প্রতি কোনো ভালোবাসা, প্রেম বা সম্মান দেখানো নয়; বরং এ তার অসম্পূর্ণতার প্রতি ইঙ্গিত করে এক ধরনের করুণা ও তাচ্ছিল্য প্রদর্শন। নারীকে যে ‘অবলা’ বলা হচ্ছে, তার মধ্যেও রয়েছে করুণা, আবার তাকে ‘রমণী’ বলা হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে চরম অসম্মান। যে রমণযোগ্য, সে-ই রমণী—অর্থাৎ এই শব্দ দ্বারা নারীকে ভোগ্যবস্তুর চেয়ে বেশি কিছু ভাবার অবকাশ নেই। পুরুষ নারীকে যতই মহিমান্বিত করার কথা বলুক না কেন, তা আসলে নিজের কামুকবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য। এ সম্পর্কে আমি সিমোন দ্য ব্যুভোয়ার মন্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। তিনি বলেছেন : A man attaches himself to woman—not to enjoy her, but to enjoy himself.  আর একবিংশ শতাব্দীতে এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক কোনো পরিবর্তন আমার চোখে পড়ছে না। নারী তার শিক্ষা ও মেধা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু কিছু ক্ষমতা অর্জন করেছে বটে; কিন্তু পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির খুব উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।

—সেটা কি তারা পুরুষ বলেই?

—মোটা দাগে তা হয়তো বলা যায়, কিন্তু এর শিকড় খুঁজতে হবে আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতির মধ্যে, আমরা যার উত্তরাধিকার। নারীকে সব সময় একটি উপায় হিসেবে দেখা হয়েছে—বংশ রক্ষার উপায়; আবার তাকে অপবিত্র, পাপ-অমঙ্গল ইত্যাদির উৎস হিসেবে অপদস্ত করা হয়েছে। শাস্ত্র বা ধর্মগ্রন্থেও নারীকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়নি। আর পূর্ব বলুন, পশ্চিম বলুন—এই দৃষ্টিভঙ্গির খুব ব্যাপক পার্থক্য আছে বলে মনে হয় না। দার্শনিক এরিস্টটল নারীর মধ্যে কিছু আবশ্যিক গুণের অভাব দেখেছিলেন। ফ্রান্সিস বেকন যে কথা বলেছেন, তা কি নারীর জন্য সম্মানীয়? যৌবনে প্রেমিকা, মাঝ বয়সে সঙ্গিনী আর বৃদ্ধ বয়সে সেবিকা। এখানে তার প্রতি পুরুষের কী ভূমিকা থাকবে, তা কিছু বলেননি। আসলে নারীকে ভরণ-পোষণের বিনিময়ে সারাটা জীবনই পুরুষের সেবা করে যেতে হবে, বয়সভেদে শুধু ভূমিকা বদল হবে। প্রাচ্য সমাজে দেখুন, সেখানে নারীকে সম্প্রদান করতে হয়, সে কি হাঁড়ি-পাতিল বা বাসনকোসনজাতীয় কোনো বস্তু যে তাকে সম্প্রদান করতে হবে? আসলে আমরা নারীস্বাধীনতার কথা বলি, কিন্তু নারী তার সারা জীবনে আদৌ স্বাধীন নয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে কারো না কারো অধীন থাকতে হয়ে। একটি শৃঙ্খল তাকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়।

—এ প্রসঙ্গে একটু ইন্টারাপ্ট করি, বিয়ের পর মেয়েদের নামের শেষে স্বামীর নাম বা পদবি জুড়ে দেওয়ার বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?

—এটাও ওই অধীনতা বৈ আর কিছু নয়। তাকে বারবার বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে তুমি কারো না কারো অধীন : কন্যা হিসেবে পিতার, জায়া হিসেবে স্বামীর এবং জননী হিসেবে ছেলের। এর ব্যতিক্রম দেখলে তাকে উদ্ধত, পুরুষালি, আরো স্থূল ভাষায় বললে মর্দা, বেয়াড়া ইত্যাদি কত নামেই না ডাকা হয়। এখানে সিমোন দ্য ব্যুভোয়া যথার্থ বলেছেন যে পুরুষকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে মানব বলে, আর নারীকে মহিলা হিসেবে। যখন সে মানবের মতো আচরণ করতে চেয়েছে, তখনই বলা হয়েছে যে সে পুরুষকে অনুকরণ করছে। Man is defined as a human being and a woman as a female—whenever she behaves as a human being she is said to imitate the male.

—আমি ভার্জিনিয়া উলফের একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরে এই মন্তব্য সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইব। উলফ তাঁর A Room of One's Own গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন : Women have served all these centuries as looking-glasses possessing the magic and delicious power of reflecting the figure of a man at twice its natural size.

—তাঁর পর্যবেক্ষণ খুবই যথার্থ। আসলে তিনি বলতে চেয়েছেন যে নারীর সব কিছুই যেন পুরুষকে মহিমান্বিত করার জন্য। তার মন-শরীর-ইচ্ছা-অনিচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা—সবই পুরুষকে খুশি করার জন্য। এর থেকে পুরুষের মনে লৈঙ্গিক পীড়নের আকাঙ্ক্ষা জন্মে। আমার ধারণা, এ ক্ষেত্রে উলফ নারীকেও খানিকটা দোষারোপ করেছেন। শিকারিকে উসকে দিতে নারী দর্পণের ভূমিকা নিয়ে থাকে। এ ধরনের ভূমিকা নারীর ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে অন্তরায়। তিনি আরো বলেছেন, ‘অন্যদের চোখ আমাদের কারাগার, তাদের ভাবনা আমাদের খাঁচা।’ শুধু লৈঙ্গিক পীড়নের প্রতিবাদে সফল হলেই নারীর বিকাশ ঘটবে, এমন নয়। শিক্ষার মাধ্যমে তার চেতনার বিকাশ ও অর্থনৈতিক মুক্তি বিশেষভাবে জরুরি।

দর্শক, এ পর্যায়ে নেব একটা বিজ্ঞাপন বিরতি, বিরতির পর আবার নারীচেতনা সম্পর্কে প্রফেসর ইফতেখারের মূল্যবান বক্তব্য শুনব। আপনারা কোথাও যাবেন না। এ পর্যায়ে টিভির পর্দায় একটি বড় কম্পানির রেজারের বিজ্ঞাপন ভেসে উঠল, জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিচ্ছে নারী এবং পুরুষ মডেলের সঙ্গে একজন নারীও রয়েছে, যে শেভের পর হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে পুরুষটির মুখের মসৃণতা পরখ করে দেখছে এবং মিষ্টি করে হাসছে। এরপর একে একে টয়লেট ক্লিনার, টুথপেস্ট, সিমেন্ট, জাঙ্গিয়া, সেলফোন ইত্যাদির বিজ্ঞাপন প্রচারিত হলো এবং প্রতিটি বিজ্ঞাপনেই নারীর অপ্রাসঙ্গিক অংশগ্রহণ, অপ্রয়োজনীয় অঙ্গভঙ্গি, মিষ্টি হাসি দেখা গেল। কোনো কোনো বিজ্ঞাপনে তাদের উপস্থাপন কামোদ্দীপক। ‘মা একটু কার্টুনে দিই?’ বলে পাভেল রিমোর্ট কন্ট্রোলারটা হাতে তুলে নিতে যাচ্ছিল, শাহানা তার হাত থেকে সেটা কেড়ে নিলেন, মুখে কিছু বললেন না। পর্দায় বাবার চেহারা দেখা ছাড়া এই ভারী আলোচনার কোনো কিছু তার মাথায় ঢোকার কথা নয়। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই সে উসখুস করছে। আরো মিনিট দুয়েক পর বিজ্ঞাপন শেষ হলে ড. মেহতাবের মুখটা ভেসে উঠল :

—কথা বলছিলাম প্রফেসর ইফতেখারের সঙ্গে নারীচেতনা বিষয়ে। সিমোন দ্য ব্যুভোয়া তাঁর The Second Sex গ্রন্থে বলেছেন, One is not born, but rather becomes, a woman—এ প্রসঙ্গে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

—বিষয়টির আক্ষরিক অর্থের দিকে নয়, বরং এর দার্শনিক গভীরতার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। বায়োলজিক্যালি একজন অবশ্যই নারী হয়ে জন্মায়, কিন্তু শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের মাধ্যমে পুরুষ কিভাবে তাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখে, সে বিষয়টির দিকে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। এমনকি যে ভালোবাসার কথা আমরা বলি, তা-ও উভয়ের ক্ষেত্রে একই অর্থ বহন করে না। পুরুষতান্ত্রিকতা সেখানেও তাকে বঞ্চিত করে।

—কে যেন বলেছেন, ‘ভালোবাসা মানে হলো শরীরের পরিপূর্ণ অধিকার।’

—কে বলেছেন? উন্মাদ, একেবারে বদ্ধ উন্মাদ। শুধু শরীর দিয়ে যেটা হয় সেটা কামচর্চা, ভালোবাসা নয়। সেখানে মনের একটা বিশেষ ভূমিকা বা গুরুত্ব যা-ই বলেন না কেন থাকতে হবে, নইলে তা কোনোমতেই ভালোবাসা হতে পারে না।

—নারীর শিক্ষা ও স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে অনেকেই দেখেন ঔদ্ধত্য হিসেবে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

—দেখুন, নারীর যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা আমরা শুনে থাকি, তা পুরুষতান্ত্রিকতার ফলস্বরূপ প্রাপ্ত। প্রায় সব বৈশিষ্ট্যই একেকটি শৃঙ্খল, এ থেকে বেরিয়ে এলেই নারী মানবী হয়ে উঠবে। যারা বেরোতে চেয়েছে, তাদের উদ্ধত হিসেবে দেখা হয়েছে। শিক্ষার অধিকার যদিও তারা লাভ করেছে, কিন্তু যৌনপুত্তলিকা হিসেবে তার আবহমানকালের যে রূপ, তা ভেঙে কি বেরোতে পেরেছে? পুরুষের মনোরঞ্জন ও ছেলেসন্তান জন্ম দেওয়ার মধ্যে নারীত্বের যে সার্থকতা, তার বেশি কিছু ভাবতে কি তাকে উৎসাহিত করা হয়েছে? এখনো শিক্ষিত নারী ছেলেসন্তান জন্ম দিতে না পারলে বিয়েবিচ্ছেদের শিকার হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যা কী বলছে? মেয়েসন্তান জন্মানোর জন্য নারীর কি কোনো ভূমিকা আছে? পুরুষতন্ত্র শাস্ত্র, ধর্মগ্রন্থ, সংস্কার, আচার ইত্যাদির দোহাই দিয়ে তার চারপাশে যে নিষেধের বেড়াজাল তৈরি করেছে, তা থেকে বেরোতে পারলে তবে নারীর মুক্তি।

সুধী, এতক্ষণ আমরা বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক, নারীবাদী, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ প্রফেসর ইফতেখার মালেকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য আমাদের উৎসাহিত করে, অচলায়তন ভেঙে সামনে এগোনোর জন্য প্রেরণা জোগায়। এই আয়োজনের পক্ষ থেকে তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে আমি মেহতাব এ খান আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি।

এতক্ষণ নিজের বক্তব্য মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন প্রফেসর ইফতেখার। খেয়াল করেননি, কখন শাহানা পাশ থেকে উঠে গেছে। পাশে তাকিয়ে তাকে না দেখে তিনি খুব অবাক হলেন। পাভেল অনেক আগেই উঠে গেছে। নিজের ঘরে কম্পিউটার ছেড়ে গেম খেলছে। খুঁজতে খুঁজতে শোবার ঘরের সঙ্গে লাগোয়া এক চিলতে ব্যালকনিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় শাহানাকে আবিষ্কার করলেন ইফতেখার। স্বামীর উপস্থিতিতে তাঁর মধ্যে তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। শেষমেশ ইফতেখারই জিজ্ঞাস করলেন, ‘উঠে চলে আসলে যে, ভালো লাগেনি আমার আলোচনা?’ একটু সময় নিয়ে শাহানা বললেন, ‘ভালো বলেছ, কথাগুলো শুনলে যে কারোরই ভালো লাগবে, কিন্তু আমি তো বুঝতে পারলাম না, তুমি কবে নারীবাদী হলে?’

—মানে, কী বলতে চাও তুমি?

—সহজ বাংলায় বলেছি, বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। নারীমুক্তির যেসব বুলি কপচালে, তা তুমি নিজে বিশ্বাস করো?

—কেন, আমি কি তোমাকে স্বাধীনতা দিইনি?

—দিয়েছ! সত্যি দিয়েছ?

—কেন, বিয়ের পরও তোমার পড়াশোনা শেষ করার সুযোগ দিয়েছি, তার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ জুগিয়েছি। সব ভুলে গেলে? এতটাই অকৃতজ্ঞ তুমি?

—তাই? আমার মনে হয় তুমি ভুলে গেছ অনেক কিছু, কতটা যুদ্ধ করে আমার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হয়েছে, তা তোমার অজানা থাকার কথা নয়। দ্রুত বাচ্চা নিতে বাধ্য করলে আমায়। বললে, দেরি করলে মানুষ হতেও দেরি হবে। পড়াশোনার কথা বলায় তাচ্ছিল্যভরে বলেছিলে—দেখো, পারলে করো, আমার আপত্তি নেই; কিন্তু সাহায্য করেছ এতটুকু? পয়সা দিয়েছ বলছ, পড়াশোনা, পরীক্ষা—এসবও কি তুমি করে দিয়েছ? রাতে এক হাতে দোলনা দুলিয়ে বাচ্চা ঘুম পাড়িয়েছি আর এক হাতে বই নিয়ে পড়েছি, আর সারা দিন রান্নাঘরে কাজ করেছি। কোনো দিন ঠিকে ঝি ছাড়া বাঁধা একটা কাজের লোকের পয়সা তুমি জোগান দাওনি।

—আমার তখন অতটা জোগানোর সামর্থ্য ছিল না।

—তাই, বাঁধা কাজের লোকে অনেক টাকা লাগত বুঝি? নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলছিলে না, মনে আছে, এমএ পাস করার পর যখন চাকরি করব বলেছিলাম তখন কী বলেছিলে? বলেছিলে, ‘বউয়ের টাকা সংসারের কোনো কাজে লাগে নাকি। ও তো সব শাড়ি-চুড়ি-কসমেটিকসে চলে যায়। আজ কী দেখছ? সব সাজগোজে চলে যাচ্ছে? জেসমিনের পড়াশোনার খরচ কে দিচ্ছে? দরকার পড়লেই তো হাত পাতছ? স্ত্রীর টাকা কাজে লাগছে না? আরো বলেছিলে যে দুজনই বাইরে সময় দিলে ঘরের কাজ কে করবে? ছেলে-মেয়েদের মানুষ কে করবে? হচ্ছে না ওরা মানুষ, হচ্ছে না ঘরের কাজ?

—দেখো শাহানা, তুমি কিন্তু আমাকে অপমান করছ?

—তাই নাকি, শ্লেষ ঝরে পড়ল শাহানার কণ্ঠে, মানসম্মানবোধ আছে তাহলে তোমার? যৌনপুত্তলিকা না কী যেন বলছিলে? আমাকে ওর থেকে বেশি সম্মান তুমি দিয়েছ কখনো?

—শাহানা!

—চিৎকার কোরো না, চিৎকার করলে লোক জানাজানি হবে, আর তাতে তোমারই সম্মানের হানি হবে। এ রকম একজন নারীবাদী স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করছে জানলে তোমার গৌরব বাড়বে না। কত সুন্দর সুন্দর কথা বললে আজ। ঘেরাটোপ, শৃঙ্খল, বেড়াজাল ভাঙার কথা বললে; কিন্তু আমার জন্য এগুলো কে রচনা করেছিল? কখনো বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরে আমাকে দেখতে না পেলে কিভাবে চিৎকার করতে মনে আছে? ভাবখানা দেখাতে যেন আমি অভিসার করতে গেছি। কোনো অতিথির সঙ্গে কথা বললে কিভাবে কটমট করে তাকাতে মনে পড়ে?

—শাহানা! তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।

—তাই বুঝি। তোমার সঙ্গে কথা বলতেও আমার রুচি হয় না, তুমি আপাদমস্তক একটা ভণ্ড। নারীবাদী সেজেছ, নারীস্বাধীনতার কথা বলো, কিন্তু মন থেকে বিশ্বাস করো? খবরদার! এগোবে না বলছি। কী, করছ কী, ছাড়ো ছাড়ো বলছি, উফ, মাগো!

পরদিন অফিসে ঢোকার মুখেই আফরোজা হৈহৈ করে উঠল। শাহানা, কাল ইফতেখার ভাইকে যা হ্যান্ডসাম লাগছিল না, তা বলার মতো নয়। আমার কিন্তু তোকে রীতিমতো হিংসা হচ্ছে। এমন একজন উদার মনের মানুষ তোর বর। এত জ্ঞানী, মেয়েদের বিষয়ে এতটা বিবেচক; সব পুরুষ যদি ইফতেখার ভাইয়ের মতো মুক্তমনের হতো! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে সে। তারপর শাহানার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

—ও কী রে, ঘরের মধ্যে সানগ্লাস পরে আছিস কেন?

—না, এমনি।

—এমনি কী রে, চোখটোখ উঠেছে নাকি?

—না।

—তাহলে?

—ও কিছু না, কাল বাথরুমে পড়ে গেছিলাম, চোখের কোণে আঘাত লেগেছে।

রাতের নারীবাদী সোহাগের কথাটা মুখে বলতে পারল না শাহানা; কাজে মনোযোগী হওয়ার ভান করে তখনকার মতো আফরোজাকে এড়াতে চাইল।


মন্তব্য