kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

প্রলেতারিয়েত হ্যারি মার্টিনসন

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রলেতারিয়েত হ্যারি মার্টিনসন

সুইডেনের কবি ও কথাসাহিত্যিক হ্যারি মার্টিনসন নানা দিক থেকে তাঁর দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বিশ শতকের সুইডিশ কবিতার সবচেয়ে বড় সংস্কারক মনে করা হয় হ্যারি মার্টিনসনকে। তিনিই ছিলেন প্রলেতারিয়েত লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক। ১৯৭৪ সালে তিনি ইভিন্দ জনসনের সঙ্গে যৌথভাবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উপলক্ষে উল্লেখ করা হয়, ‘তাঁর কবিতা শিশির বিন্দুর অবয়বে মহাজগতের প্রতিফলন দেখাতে সক্ষম।’ হ্যারি মার্টিনসনের জন্ম ১৯০৪ সালের ৬ মে। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারান। বাবার মৃত্যুর পর মার্টিনসন এবং তাঁর চার বোনকে রেখে তাঁদের মা আমেরিকা চলে যান। সে সময় থেকেই শুরু তাঁর জীবনের অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামের। মা আর কোনো দিন আমেরিকা থেকে ফিরে আসেননি। মায়ের অনুপস্থিতি তাঁর মনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী আবেগী ক্ষত রেখে যায়। মা হারানোর ব্যথা আজীবন ভুলতে পারেননি। ভ্রমণের নেশা ছিল বাবার। ষোলো বছর বয়সে মার্টিনসন এক জাহাজে উঠে বসেন, উদ্দেশ্য দেশ-বিদেশ ঘোরা। সে যাত্রায়ই তিনি ব্রাজিল ও ভারত সফর করেন। ফুসফুসের সমস্যার কারণে কয়েক বছর পরেই দেশে ফিরতে বাধ্য হন। দেশে ফিরে কোনো কর্মসংস্থানের সন্ধান না পেয়ে ভবঘুরের জীবন যাপন করেন। রাস্তাঘাটে ঘোরার একপর্যায়ে গ্রেপ্তারও হন। ১৯২৯ সালে প্রথম কবিতা প্রকাশ করেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ফাইভ ইয়ুথস’ সুইডিশ কবিতার আধুনিক যুগের সূচনা করে। তিনি প্রকৃতিকে দেখেছেন গভীর দৃষ্টি দিয়ে। প্রকৃতির প্রতি ছিল তাঁর ভালোবাসা। প্রকৃতির মাঝেই খুঁজেছেন মানবতা। ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর সফলতা আসে ১৯৩৫ সালে ‘ফ্লাওয়ারিং নেটলস’ উপন্যাস প্রকাশের পর। আধা-আত্মজীবনীমূলক এ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন অভাবে আক্রান্ত পল্লী এলাকার এক ভবঘুরে বালকের কথা। তাঁর এ উপন্যাস ৩০টিরও অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তবে অন্যান্য রচনার চেয়ে তুলনামূলক কম অনুবাদ হয়েছে।  সুইডিশ ভাষা তিনি একদম নিজের মতো করে ব্যবহার করেছেন, বাক্যের গঠনপ্রণালী কঠিন করেছেন, নিজের তৈরি অনেক শব্দের ব্যবহারও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবু তাঁকে আঞ্চলিকতার দোষে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। তাঁর লেখায় সুইডেনের প্রকৃতির চেহারা এবং মাটির গন্ধ থাকলেও তিনি দেশ-বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার রং মিশিয়েছেন লেখার জমিনে। প্রকৃতির মধ্য দিয়েই তিনি অস্তিত্বের নিবিড় ক্ষুদ্র অংশকে দেখেছেন এবং মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছেন। আসলে তাঁর লেখার মধ্যে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, শিল্প—সব কিছুকেই স্থান দিয়েছেন। আরো একটি বিষয়ে তিনি সুইডিশ হয়েও সবার এবং সর্বকালের। সেটি হলো, তাঁর সমসাময়িককালের সাহিত্যের স্বাদ যথাযথই তুলে এনেছেন।  তাঁর লেখায় যেসব বিষয় প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি করেছে, সেগুলো পরবর্তীকালেও প্রযোজ্য। যেমন সমাজ উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আমাদের বসবাসের জগৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার বিষয় বর্তমান সময়ে আরো স্পষ্ট ও আরো প্রকট। বিশ শতকের স্পষ্ট বিষয়গুলোর মধ্যে সামাজিক অবিচার, স্বৈরাচার, যুদ্ধ, বাণিজ্যিক সংস্কৃতি, পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসঙ্গ, পরিবেশ নিধন—এগুলো এসেছে তাঁর লেখায়। আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় তাঁর কবিতায় মূল সুর হিসেবে বারবার এসেছে। বিজ্ঞানের ভাষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর কবিতায়। এ প্রসঙ্গে তাঁকে আন্তর্জাতিক নিরিখেও নতুনত্বের উদ্ভাবক বলা হয়। তাঁর লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে ব্যক্তিগত জীবনে আসে ভাঙন : প্রথম স্ত্রী মোয়া মার্টিনসনের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল তাঁর লেখা। মোয়া মনে করতেন, হ্যারির লেখায় রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নেই। দুজনেরই অনমনীয় মনোভাবের কারণে বাকি জীবন একসঙ্গে কাটাতে পারেননি। মোয়া নিজেও পরে লেখালেখি শুরু করেন। তবু বলা যাবে না, মার্টিনসন চলমান বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে অচেতন ছিলেন। তিনি শুধু বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতে চাননি। মানবতার আদর্শে তিনি অটল ছিলেন। তিনি নািসবাদ ও সমাজতন্ত্র অপছন্দ করতেন। ১৯৩৯ সালে রাশিয়া ফিনল্যান্ড আক্রমণ করলে তাদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহের কাজে ইভিন্দ জনসনের সঙ্গে মার্টিনসন সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। দেশব্যাপী তাঁরা জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৪০ সালে তিনি রণাঙ্গনেও হাজির হন।

 

দুলাল আল মনসুর


মন্তব্য