kalerkantho


অপ্রতিরোধ্য

মহি মুহাম্মদ

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অপ্রতিরোধ্য

অঙ্কন : মানব

কোমল দুটি পায়ের শব্দ ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে। এই শব্দ রাত নেই, দিন নেই তার চেতনে-অবচেতনে অবিরাম তাড়া করছে।

একটা ঘোরের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করে সে। কেউ কি তাকে মা বলে ডাক দিল? তৃষ্ণার্ত আর  মিষ্টি সেই আদুরে ডাকটা! বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠল। বাইরে বর্ষার অন্ধকার, রেশমি ওড়নায় ঢেকেছে সন্ধ্যা। কালো মেঘে আকাশ ঢাকা। নেহার কণ্ঠের আকুতি শোনা গেল, মা, মারে! কই মা তুই, কোথায়? আমার মনে হলো তুই যেন এলি। এসে চলে যাস কেন? থাকতে পারিস না, কাছে আসতে পারিস না?

এই বুঝি মাথাটা তার খারাপ হয়ে গেল।

অপেক্ষার মাত্রা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাচ্ছে। মোবাইলের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে সে। যেকোনো মুহূর্তে ওটা বেজে উঠতে পারে—এমন একটা উৎকণ্ঠা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

কথা না বললে দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই সে সময়-অসময়ে কথা বলে। ঘরে কথা বলে, বাইরে কথা বলে। অফিসে কথা বলে। ফোনে কথা বলে। মিনহাজ এসবের ধার ধারে না। ও সব সময় ব্যস্ত থাকে রোগী নিয়ে। ওকে দেখলেই নেহার ওষুধ ওষুধ গন্ধ লাগে। আজ ঢাকা তো কাল সিঙ্গাপুর। আর কী সব জটিল জটিল পড়া।

আর সে সাহিত্যের ছাত্রী। ও এসব বোঝে না। যে যার মতো থাকাই ভালো। অহেতুক ঝগড়াঝাঁটি করে লাভ কী! সন্তানের জন্য ওরও তো হাহাকার থাকতে পারে। তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজন মিনহাজকে বলেছিল আরেকটা বিয়ে করতে। ও পাত্তা দেয়নি। তারপর থেকে ওর ওপরে তার আস্থা বেড়ে গেছে। কিন্তু নতুন ইন্টার্ন করা মেয়েটা! কি যেন নাম! ও, মনে পড়েছে—শায়লা। ওর বিষয়টা বুঝতে পারছে না। ব্যাপারটা নিয়ে যে কথা বলবে তাও রুচিতে বাধছে।

কিন্তু অঞ্জন এটা কী করল? একেবারে মাথা খারাপ করার দশা। অফিসে আসা ওই নতুন চিকনী মেয়েটার সঙ্গে এত কথা বলছে কেন? পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। নিজের আক্রোশ ধরে রাখা যাচ্ছে না। ইচ্ছা করছে মেয়েটার দুই গালে দুটি সাটিয়ে চড় লাগিয়ে দেয়। কী ছুরত! একটা লইট্ট্যা মাছ! এত মাছ থাকতে তার লইট্ট্যা মাছের নাম মনে এলো কেন, ভেবে পেল না। এমা, কী জিলজিলে মাছটা! ওয়াক থু! ভেবেই বমি আসছে। কিন্তু কিসের এত ভাব ওই মেয়েটার সঙ্গে অঞ্জনের?

কিসের?

বহু প্রশ্নবোধক চিহ্ন মাথার ভেতর। ওগুলো বাদুড়ের মতো ঝুলতে থাকে। অহর্নিশি। তাতে তার কী! হোক গে, ও অঞ্জনের। তাতে তার তো কিছু আসে-যায় না। তার পরও তার পাগল হওয়ার দশা।

তার সহকর্মী অঞ্জন। টান টান শরীর। অনেকটা ধনুকের ছিলার মতো। জোড়া ভ্রু। তার নিচে জলে ডোবা দুটি চোখ। কখনো চৈত্রের আকাশ, কখনো বা শ্রাবণের মেঘ। সিঁদুরে রঙের আর্বিভাব ঘটেছে কখনো বা! চিকন, গোলাপি ঠোঁট। বেটা মানুষের অমন হয় নাকি! প্রথম প্রথম সে আর নাজিলা অনেক আলোচনা করেছে। কত মন্তব্য করেছে। এটা একটা পুরুষ হলো! শার্ট-প্যান্ট পরে অথচ কথা বলে খেতের মতো। আবার বলে কি না মাটির মানুষ। কিন্তু কী আশ্চর্য, এই মাটির মানুষকেই তারা দখল করার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। নাজিলা যেমন তেমন কিন্তু নতুন মেয়েটি যেন শান দেওয়া ক্ষুর। নাজিলার গায়ের রং খানিকটা চাপা। হাঁটার সময় থপ থপ করে শব্দ হয়। ব্যালেন্স নেই। যেখানে-সেখানে ভস ভস করে কথা উগরে দেয়। বোকা বোকা টাইপ। তার পরে নাস্তানাবুদ হয়।

সে তুলনায় নেহা অনেকটা থিতু। তবে মেজাজটা একটু গরম। খাঁটি বলে একটা কথা আছে না। খাঁটি জিনিসের তো ঝাঁজ বলে একটা ব্যাপার থাকেই!

কি অদ্ভুত গানের গলা ওর! এমনি এমনি কেউ গাইতে পারে বুঝি! আবার গান করে তো মাটির গান। আধ্যাত্মিক, মারফতি, মুর্শিদি। এটা একটা কথা, আধুনিক শিক্ষায় দীক্ষিত একটা সুপুরুষ কিনা মাটির গান করে! তা করুক, এখন সে ওসব ধার ধারে না। কেন জানি খুব টানে। নিষেধ মানে না মন। দেখতে কেমন মায়া। আর কথায় কত্ত দরদ! এত দরদ  কোথা থেকে পেল? শৈশবের কাহিনিটা তেমন জানা হয়নি। জানলে বুঝতে পারত, ওর কথায় এত ভাব কোত্থেকে আসে?  না, চোখ থেকে কিছুতেই তাড়াতে পারছে না। নেহার কী হলো? কিসের এত প্রতীক্ষা? বারবার করে মোবাইল ফোনটা চেক করে। যদি ভুল করে একটা মেসেজ কিংবা কল চলে আসে! আসতে পারে না?

অফিসে কেমন তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। হাঃ হাঃ করে হেসে বলল, কি গো ম্যাডাম, খবর কী?

সে বলল, এই তো! আপনার খবর ভালো?

চমৎকার!

ইশ! বলে কিনা চমৎকার! বানিয়ে বানিয়ে এত মিষ্টি করে বলে কী করে?

কিন্তু সারা দিন আর তার দেখা নেই। অথচ নেহার মধ্যে কী ছটফটে ভাব! এভাবে মানুষ বাঁচে? কী হয় একটা ফোন করলে? নেহাকে একটা ফোন তো সে করতেই পারে, তাই না? নাকি সে নিজেই একটা ফোন করবে। এই ভাবতে ভাবতে সে মুঠোফোনটা হাতে নেয়। নম্বরটা সেন্ড করে। ডায়াল হচ্ছে! কিন্তু বুকের মধ্যে আবার বিট বাজাচ্ছে কে? সে তো কচি খুকি নয়! রীতিমতো ৪০ পেরিয়েছে। তাহলে সে কি প্রেমে পড়েছে? আর ধুৎ, এই বয়সে কে তার সঙ্গে প্রেম করবে? কিন্তু অঞ্জনের ছবিটা কিছুতেই চোখ থেকে সরানো যাচ্ছে না। কেন? চোখ বন্ধ করে তাড়াতে চেষ্টা করল।

হ্যাঁ, ফোন রিসিভ করেছে। হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, আমি নেহা। শুনতে পাচ্ছেন? ধুৎ! এত চিৎকার-চেঁচামেচি, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

যা, ফোনটা কেটেই দিল। মনে হচ্ছে ব্যাক করবে। করুক, ব্যাক করুক। ভদ্রতা বলে একটা কথা আছে না! কিন্তু সময় চলে যায়। কল আসে না। নিজের ভেতর নিজের দহন চলতে থাকে।

নেহা নিঃসঙ্গতার আগুনে পোড়ে। দাম্পত্য জীবনের ১৩টি বছর পেরিয়ে গেল। ঘরভরা শূন্যতা। শূন্যতার ভেতর প্রতিনিয়ত সে খাবি খায়। মিনহাজের কোনো অভিযোগ নেই। ও যেন সারা দিন কাজ নিয়েই ব্যস্ত। নতুন নতুন ব্যস্ততা পেয়ে বসেছে ওকে। মধ্যরাতে ফেরে। খুব কি কথা হয়? না। তেমন না। একটা বাচ্চার হাহাকার তার বুকজুড়ে দাপিয়ে বেড়ায়। ঘুরে বেড়ায় সে দিনমান আলতো দুটি পায়ের শব্দের পেছনে। যেন একটা প্রজাপতি এ ঘর থেকে ও ঘরে উড়ে বেড়াচ্ছে। আর সে প্রজাপতির পেছন পেছন অনুসরণ করে যাচ্ছে। কিন্তু সফল হচ্ছে না।

যতক্ষণ অফিসে থাকে ভালোই থাকে। বাসায় ফিরলে সময় আর কাটে না। মনে হয় প্রকাণ্ড পাথরের চাঁই। অনেক কষ্টে ঠেলে সরাতে হচ্ছে।

বর্ষার সকাল। ঝুম ঝুম বৃষ্টির চাদরে ঢেকে আছে চারদিক। জানালা দিয়ে দেখতে ভালো লাগে। আজ কেন জানি রবিবাবুর লাবণ্যকে মনে পড়ছে। আর মনে পড়ছে দুই ধারে ঘন গাছের ছায়াঘেরা ইট বিছানো পথ। সে পথে অঞ্জন আর সে। ভাবনার এই সময় মিনহাজের ডাক। আমি যাচ্ছি। খেয়াল রেখো। ভালো থেকো।

নেহা বলল, তুমিও ভালো থেকো। অবশ্য শায়লা আছে, ও তোমার টেককেয়ার করতে পারবে। মিনহাজ চমকাল। কারণ ও শায়লার কথা ঘুণাক্ষরেও বলেনি। অথচ ঠিকই নেহা বুঝে নিয়েছে। না, ওর চোখে-মুখে কোনো রাগ নেই। এসো। গুড লাক।

খোলা দরজা দিয়ে একটা বৃষ্টিভেজা হাওয়া ঢোকে। সে হাওয়ার তোড়ে নেহার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে নামল। বাতাসটা ভালোই লাগছে। দরজা বন্ধ করতে ইচ্ছা করছে না। গাড়ির হর্ন বাজল। মিনহাজকে নিয়ে গাড়ি এয়ারপোর্টে গেল। নেহা ঝটপট তৈরি হয়ে নিল। অফিসে আজ তাড়াতাড়ি যাবে সে। অঞ্জনকে সে আজ কিডন্যাপ করবে। এমন বর্ষামেদুর দিনে অঞ্জন কি তার সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত কাটাবে না?

দেখা যাক কী হয়! নেহা বেরিয়ে এলো। এত সকালে সে আর কোনো দিন বের হয়নি। ধুমছে বৃষ্টি নেমেছে। বাসার গেট থেকে একটা রিকশা পেয়ে গেল। রিকশাওয়ালাকে চালাতে বলে উঠে বসল সে। পর্দার ফাঁক গলে বৃষ্টির অকৃপণ দান তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। নেহার ভালোই লাগল। রিকশা চলছে। হঠাৎ করে রিকশার চেইনটা পড়ে গেল। আর সে পর্দাটা ফাঁক করে সামনে তাকাল। দেখল, গার্লস স্কুলের সামনে রিকশাটা থেমে আছে। আর অদ্ভুত একটা দৃশ্য নেহার চোখে গেঁথে গেল। অঞ্জন রিকশা থেকে নামছে। সঙ্গে তার কাঁধসমান একটি মেয়ে। মেয়েটিকে স্কুলে ঢুকিয়ে অঞ্জন আবার রাস্তায় এসে দাঁড়াল। হয়তো এবার সে রিকশা খুঁজছে। নেহা ডাক দিল।

রিকশায় তুলে নিল অঞ্জনকে। নেহা জিজ্ঞেস করল, মেয়েটা কে?

আমার মা।

মানে? আপনার মেয়ে?

হ্যাঁ।

কয় ছেলেমেয়ে আপনার?

আমার পরিবারের সদস্য আমরা দুজনই।

খটকা লাগল নেহার। ওর বউ কোথায়?

অপূর্ণার মা মারা গেছে। তখন ওর বয়স চার বছর। মেয়ের কষ্ট হবে ভেবে আর কাউকে ঘরে আনিনি।

রিকশা চলতে থাকে। বৃষ্টি আরো বেড়েছে মনে হয়। নেহার মুখে আর কোনো কথা জোগায় না।

প্রতিদিন বিকেলে কাজের মেয়েটা আসে। ৯-১০ বছর বয়সের মেয়েটা। আন্টি আন্টি বলে জ্বালিয়ে মারে। এটা-ওটা বায়না ধরে। সব আবদারই সে রক্ষা  করে। আজও অপেক্ষায় থাকল। কিন্তু  মেয়েটা আসে না। বাইরে তখন তুমুল বর্ষা। তাই ঘরের ভেতর বুঝি অন্ধকার নামে। আর তখন ফিরে আসে দুটি পায়ের শব্দ। কোমল শব্দ। ছোট ছেলেমেয়ে যেমন থপ থপ করে হাঁটে, ঠিক অমন করে হাঁটছে। বুকের ভেতরটা নেহার ভেঙেচুরে যাচ্ছে। কোথাও কি ফোন বাজছে! সে দৌড়ে এলো। না, তার ফোন নয়। একবার ফোনটা তো বাজতে পারে, তাই না? না, বাজে না। একবার বুঝি ধরা দেবে না! নিশ্চয়ই ধরা দেবে। তার হারিয়ে যাওয়া শিশুটি ফিরে আসছে। জন্মের পর যে একটিবারের জন্যও মা ডাকেনি তাকে।

দরজার বেল বাজল। বেজেছে কি? ফোনটা মনে হয় বাজছে। তখন মেয়েটা ঘরে ঢুকল। বলল, আন্টি, যা বৃষ্টি! ভিজ্জা গেছি।

নেহা দৌড়ে গিয়ে তোয়ালে নিয়ে এলো। তারপর মেয়েটিকে মুছিয়ে বুকের ভেতর ধরে রাখল। আর বলল, মারে মা, তুই কোথায় ছিলি? এত দেরি করলি কেন?


মন্তব্য