kalerkantho


প্রদর্শনী

ফিরেদেখা ’৭৯

জাহিদ মুস্তাফা

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ফিরেদেখা ’৭৯

রিপ্রিন্ট অব মেমোরি। শিল্পী অশোক কর্মকার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে চলছে ৩৮ বছর আগে একই শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পাঠ নেওয়া ৩০ জন শিল্পীর সম্মিলিত প্রদর্শনী।

১৯৭৯ সালে দেশের নানাপ্রান্ত থেকে ঢাকার তৎকালীন বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে আমরা পাঠ নিতে এসেছিলাম অর্ধশতাধিক নবীন। প্রাক-ডিগ্রিপর্যায়ে শিক্ষক হিসেবে পেলাম মাহমুদুল হক, মাহবুবুল আমিন, শহীদ কবির, মতলুব আলী, শাকুর শাহ, ইংরেজি সাহিত্যের দিল আফরোজ কাদের, ইতিহাসের নাজমা খান মজলিসকে।

শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে আমাদের প্রথমবারের মতো বের করে আনলেন শহীদ কবির স্যার। চারুকলার চমৎকার চত্তরে থেকে রমনা উদ্যানের সবুজের সমারোহে শুরু হলো আলো-ছায়া গাছপালা নিয়ে আমাদের স্কেচ করার চেষ্টা। কাজ করেছি খেয়ে না-খেয়ে, তবু কি আনন্দ তখন! সে সময় হঠাৎ স্পেন পাড়ি জমালেন কবির স্যার! দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার পর মনোবসু বৃত্তি পেয়ে জাপান চলে গেলেন মাহমুদুল হক স্যার। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে গ্যালারিতে। মাহমুদ স্যার চলে যাওয়ায় মাহবুব স্যার প্রি-ডিগ্রি প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে আমাদের চারুপাঠকে এগিয়ে নেন।

আমাদের পরম সৌভাগ্য বাংলাদেশের আধুনিক চারুশিল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের গুণী চারুশিল্পীদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। আমাদের অধ্যক্ষ ছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম। নানা বিভাগের গুণী শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন পেইন্টিংয়ে কাজী আবদুল বাসেত, রফিকুন নবী, মাহবুবুল আমিন, ফরিদা জামান; ছাপচিত্রে সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আবুল বারক আলভী, জাপান থেকে ফিরে এ বিভাগে যোগ দেন অধ্যাপক মাহমুদুল হক; ভাস্কর্যে আবদুর রাজ্জাক, হামিদুজ্জামান খান; গ্রাফিক ডিজাইনে কাইয়ুম চৌধুরী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী; প্রাচ্যকলায় হাশেম খান, আবদুস সাত্তার; কারুকলায় জুনাবুল ইসলাম, আব্দুল জব্বার; মৃিশল্পে মীর মোস্তফা আলী, শামসুল ইসলাম নিজামী, মরণচাঁদ পাল। তত্ত্বীয় বিষয় পড়াতেন বুলবন ওসমান, আবদুল মতিন সরকার। নামি শিক্ষকদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই।

১৯৮২ সালে আমরা চারুকলা কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি ইনস্টিটিউটে রূপান্তরের আন্দোলনে নামি এবং আন্দোলনের মুখে সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেন। ১৯৮৪ সালে আমরা স্নাতক করি। পরে ১৯৮৮ সালের শেষদিকে আমরা প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়েছিলাম।

ভাবতে ভালো লাগে, আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে আজ অনেকেই শিল্পী ও পেশাজীবী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ভাস্কর লালা রুখ সেলিম ও মৃিশল্পী স্বপন সিকদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। স্বপন গড়েছেন তিনটি ফিগারের এক গঠন। দশম-এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক পেয়েছেন মোখলেসুর রহমান। তাঁর দুটি চমৎকার উডকাট ছাপচিত্র এ প্রদর্শনীর উল্লেখপ্রদ কাজ।

শিল্পী অশোক কর্মকার ১৯৮৯ সালের ডাকসুর নির্বাচিত সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক, এখন প্রথম আলোর প্রধান শিল্পনির্দেশক, পুরস্কৃত প্রচ্ছদশিল্পী। তাঁর একটি মাত্র কোলাজ চিত্রকর্মে তিনি আমাদের তিন যুগ আগের অবয়ব নিয়ে নন্দিত এক কম্পোজিশন রচনা করে শিরোনাম দিয়েছেন রিপ্রিন্ট অব মেমোরি। একই কাগজে আমাদের আরো দুই সহপাঠী শিল্পী আছেন—প্রচ্ছদ-ইলাস্ট্রেশনে শক্তিমান মাসুক হেলাল ও মুদ্রণবিশেষজ্ঞ মাহবুবুর রশিদ মজনু। মাসুক দুটি প্রতিকৃতি এঁকেছেন, মজনু ক্যানভাসে বিমূর্ত দুটি গড়ন এঁকেছেন।

ভাস্কর মাহাবুব জামাল শামীম যশোর চারুপীঠের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পহেলা বৈশাখের মঙ্গলশোভাযাত্রার উদগাতা। তিনি মানবদেহের গড়নকে আনুভূমিকভাবে তুলে ধরে ভাস্কর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। সেলিম আহমেদ এখন সুপরিচিত অভিনেতা, নাট্যকার, মডেল ও প্রচ্ছদশিল্পী। তিনি রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যালে বোরকাপরা এক নারীর ছবি এঁকেছেন। রুবিনা মডেল ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, তিনি এঁকেছেন দুটি নারী অবয়ব।

আফরোজা জামিল কংকা পাখিসহ নারী অবয়ব এঁকেছেন। দিলরুবা লতিফ এঁকেছেন বিক্ষুব্ধ পরিবেশে চিন্তিত এক নারী। সাবিনা জাহান কচি ও আকতার শাহীন দম্পতি বিসিকের নকশাবিদ। তাঁরা নিসর্গকেন্দ্রিক ছবি আঁকেন। নাট্যকর্মী হাবিবুর রহমান মেটালে নারী অবয়বের ভাস্কর্য গড়েছেন। রেজা কাজ করছেন সিআরপিতে। তিনি সিমেন্ট মাধ্যমে এক দম্পতির ভাস্কর্য গড়েছেন। আরিফ আহমেদ শাহীন সবুজের আবহে ঝরনার ছবি এঁকেছেন। মিজানুর রহমান পিন্টু ও আলতাফ হোসেন শরীফ সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তা। পিন্টু একটি আয়নাকে কেন্দ্র করে শিল্পিত এক ফ্রেম নির্মাণ করেছেন। শরীফ এঁকেছেন নিসর্গের ছবি। হিরণ্ময় যশোর চারুকলার শিক্ষক, সাদা-কালোয় এঁকেছেন অঙ্কনপ্রধান এক ছবি।

আমি সরেজমিনে গিয়ে দেখে এসেছি—ফরিদপুরে আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সাজেদুর রহমান তাতা ওই শহরে চারুশিল্প প্রসারে ভূমিকা রাখছেন। তিনিও নিসর্গচিত্র এঁকেছেন। ইতালির রোমে আমাদের সহপাঠী উত্তম পেশাদার শিল্পী হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি প্রশস্ত এক ফিগারের ছায়া এঁকেছেন। মিনি করিম ছবি আঁকার পাশাপাশি দেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনের সংগঠক হিসেবে সুপরিচিত। তিনি ভারী বর্ণে নিসর্গরূপ এঁকেছেন।

কম্পিউটার গ্রাফিকসে এ দেশে প্রথমযুগের শিল্পী মুনির; হংসমিথুনের ছবি এঁকেছেন তিনি। সাইফুর রহমান লালবর্ণের নানা টোনে দৃষ্টিনন্দন গঠন রচনা করেছেন। ধনঞ্জয় মণ্ডল ও শাহীন আকতার নিসর্গের ছবি এঁকেছেন। মৃিশল্পী রুস্তম এক সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠ নকশাবিদ। তিনি টাইলস পেইন্টিং করেছেন। মনোজ পাল নীলবর্ণের প্রাধান্যে কয়েকটি নারী ফিগার নিয়ে কম্পোজিশন করেছেন। প্রদর্শনীর খবর পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চলে এসেছেন সায়মা। তিনি গ্রামীণ আবহে দুটি নারী অবয়ব নিয়ে টাইলস পেইন্টিং করেছেন। আমি জলরঙে গায়েন ও এক বধূর ছবি এঁকেছি।

দীর্ঘ এ সময়ে আমরা হারিয়েছি প্রিয় কয়েকজন সহপাঠীকে। তাঁরা হলেন—নজরুল ইসলাম অনু, জামিল এহসানুল হক শুভ্র, মুরাদুজ্জামান মুরাদ, সুভাষ কুমার রায়, মনিরুল আলম ও জন এলবার্ট রায়। এ প্রদর্শনী আমরা তাঁদের উৎসর্গ করেছি।

আমাদের ব্যাচের ছয়জন শিল্পী—মোখলেসুর রহমান, মাহাবুব জামাল শামীম, লালা রুখ সেলিম, অশোক কর্মকার, উত্তম কুমার কর্মকার ও আমি বিশ্বশিল্পের প্রাচীন ও খ্যাতনামা দ্বিবার্ষিক ভেনিস বিয়েনালের ৫৫তম আসরে অংশগ্রহণ করেছি। ভারত, নেপাল, ইংল্যান্ড, ইতালি ও রাশিয়ায় আয়োজিত প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে আমাদের সহপাঠীরা। আমাদের কয়েকজন বন্ধু লেখালেখি ও গবেষণা, স্থাপনা নির্মাণ ও শিল্পনির্দেশনায় আজ দেশখ্যাত। আটত্রিশ বছর পর সহপাঠী যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের নিয়ে আবার আমরা সংঘবদ্ধ হয়েছি ৭৯ ব্যাচের এক যৌথ প্রদর্শনীতে।

নানা মাধ্যমের কাজ নিয়ে এ আয়োজন চলবে আগামী ২১ জানুয়ারি রবিবার প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত।


মন্তব্য