kalerkantho


লেখার ইশকুল

আমি ইচ্ছা করে দুর্বোধ্য কবিতা লেখার চেষ্টা করিনি : ইউজেনিও মন্তালে

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আমি ইচ্ছা করে দুর্বোধ্য কবিতা লেখার চেষ্টা করিনি : ইউজেনিও মন্তালে

গিয়াকোমো লিওপার্দির পর যাঁকে ইতালির প্রধান গীতি কবি গণ্য করা হয় তিনি ইউজেনিও মন্তালে। ১৯৭৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি তাঁকে পাশ্চাত্যের সমকালীন মহান কবিদের অন্যতম বলে উল্লেখ করে। ‘দ্য সেকেন্ড লাইফ অব আর্ট : সিলেক্টেড এসেস অব ইউজেনিও মন্তালে’ গ্রন্থের ভূমিকায় মন্তালের অনুবাদক জনাথন গাসালি বলেন, ‘তিনি আমাদের সময়ের মহান শিল্পবোদ্ধাদের অন্যতম। সারা বিশ্বে রয়েছে তাঁর বিশাল পরিসরের পাঠকবর্গ।’

লেখক জীবনের প্রথম ৫০ বছরে মাত্র পাঁচটি কাব্যগ্রন্থের জনক ছিলেন ইউজেনিও মন্তালে। তবে তত দিনে তাঁর অন্যান্য লেখার গতি কিন্তু মোটেও ধীর ছিল না। অন্যান্য লেখা নিয়মিতই লিখে গেছেন। সাহিত্য সমালোচনা লিখেছেন, কবিতা এবং গদ্য অনুবাদও করেছেন। এ ছাড়া সম্পাদনার কাজও করেছেন দীর্ঘ সময়। ইতালির পত্রপত্রিকার সাহিত্য পাতায় অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন মন্তালে। সমসাময়িক জীবনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিবিড় আছে বলে মনে করতেন না তিনি। সময়ের সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় খুঁজেছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর আকুতি দেখা যায় নিজের কবিতায় : ‘আমরা যা নই আর যা চাই না/সে কথাই কেবল তোমাকে জানাতে পারি আজ।’

মন্তালে কবিতা লেখা শুরু করেন কিশোর বয়সে। তখন ইতালির গীতি কবিতায় বিপ্লবের শুরু হয়েছে সবে। নতুন শতকের দ্বিতীয় দশকে যখন কবিতা লেখা শুরু করেন, তখন তাঁর মতো ফ্রান্স ও আমেরিকার কবিদের সামনেও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। মন্তালের দেশের অবস্থা বিচারে তাঁর জন্য বিষয়টি সামান্য ভিন্নও ছিল। তাঁর দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তখন কবির কণ্ঠ বেশ নিচু স্বরের হবে, তবে কিছুতেই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের পর্যায়ে নামানো যাবে না; কবিতায় মূর্ত চিত্রকল্প এলেও বারবার একই চিত্রকল্পের বাস্তবায়ন ঘটানো যাবে না। ভাষার বৈশিষ্ট্যের কারণেই অন্যান্য এলাকার কবিতার চেয়ে কঠিন হয়ে যায় তাঁর কাব্যজগতে নতুনত্ব আনার কাজটি। তাঁর কবিতার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখ করার মতো একটি হলো, নিজের অভিজ্ঞতার নিবিড় সান্নিধ্যে আসা। আর নিজের অভিজ্ঞতার নিবিড় সান্নিধ্যে আসার যে চেষ্টা করেছেন, তার জন্য অনেক সমালোচক তাঁর কবিতার গায়ে দুর্বোধ্য হওয়ার তকমা এঁটে দিয়েছেন। কেউ কেউ তাঁকে সালভাতোরে কুয়াসিমোতো এবং গিসেপ উনগারেত্তির মতো দুর্বোধ্য কবিতার আন্দোলনের একজন মনে করেছেন। তবে এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই পরিষ্কার বলেছেন, ‘আমি ইচ্ছা করে কখনো দুর্বোধ্য কবিতা লেখার চেষ্টা করিনি। আর হারমেটিসিজম নিয়ে কথা বলাও আমার রুচির সঙ্গে মানায় না।’ বিড়বিড় করে কথা বলা কোনো ব্যক্তির বক্তব্য অন্যের পক্ষে বোঝা যেমন কঠিন, মন্তালের কবিতাও তেমন কঠিন সাধারণ পাঠকের জন্য। তাঁর কবিতা কঠিন মনে হওয়ার কারণ বের করতে গিয়ে পারনাসাস পোয়েট্রির রিভিউতে সমালোচক আলফ্রেড কর্ন বলেন, তাঁর কবিতার উন্মোচনের উপাদান যেগুলো, সেগুলোতে কোনো ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলা হয় না, শুধু ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুভূতির কথা বলা হয়।

ইতালির বাইরের কোনো কবির সঙ্গে তাঁকে তুলনা করার সময় প্রথমেই আনা হয় টিএস এলিয়টের প্রসঙ্গ। বিশ শতকের মানুষের অস্তিত্ববাদী উৎকণ্ঠার প্রকাশ ঘটানোর জন্য তাঁরা দুজনই ঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের দুজনের শৈলীর মধ্যেও মিল পাওয়া যায়। শুষ্ক, নিঃসঙ্গ এবং নিষ্ঠুর এলাকার কথা হাজির করেছেন দুজনই। মানুষের জীবনের রহস্য মাপার জন্য দুজনই প্রকৃতিকে ভগ্নাংশের ধারাবাহিকতায় উপস্থাপন করেছেন। মন্তালের ‘আর্সেনিও’ কবিতার মিল রয়েছে এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতার সঙ্গে। এ দুটি কবিতার আরেকটি মিলের বিষয় হলো, মুক্তির উপায় অন্বেষণ। তবে পার্থক্যের বিষয়টি হলো, এলিয়ট খ্রিস্টধর্মের মধ্যে তাঁর সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন। কিন্তু মন্তালে জীবন, মৃত্যু এবং মানুষের অদৃষ্ট সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো উত্তর খুঁজে পাননি।

মন্তালে বিশ্বব্যাপী কবি খ্যাতি পেয়েছেন কবিতার জন্য যেমন, গদ্যের জন্যও তেমনই। বিশেষ করে গাসালির অনুবাদে তাঁর গদ্য বেশি খ্যাতি পেয়েছে। তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বটবৃক্ষের মতোই ডালপালা ছড়িয়েছিল। লোকে তাঁকে উল্লেখ করত ইতালীয় সাহিত্যের বর্ষীয়ান সমালোচক হিসেবে। সম্পাদক হিসেবেও তিনি খ্যাতির শিখরেই ছিলেন শেষ পর্যন্ত।

 

দুলাল আল মনসুর


মন্তব্য