kalerkantho


জিততেই হবে তবু নির্ভার ব্রাজিল

নোমান মোহাম্মদ সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে    

২২ জুন, ২০১৮ ১১:৫৫



জিততেই হবে তবু নির্ভার ব্রাজিল

কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচের আগে ঘাম ঝরাচ্ছেন নেইমার-পাউলিনিয়ো-মার্সেলোরা। ছবি : এএফপি

অদ্ভুত শহর এই সেন্ট পিটার্সবার্গ। যা কখনো ডুবে যায় না রাতের আঁধারে। দিনের আলো কমে যেতে যেতে রাত ১২টা। এর পরও আকাশ থেকে বিচ্ছুরিত মায়াবী নীলে রূপকথার রাজ্য হয়ে থাকে নেভা নদী ও বাল্টিক সাগরসেঁচা এ জনপদ। আবার রাত দুটো বাজতে বাজতেই ফুটে যায় সকালের আলো।

ব্রাজিলের ফুটবলও যেন তেমনি। অন্ধকারে যা হারিয়ে যায় না কখনো। সাফল্যের আলো কখনো-সখনো মলিন হয় বটে। তবু ভালোবাসায় ওই হলুদ প্রদীপ জ্বলতে থাকে সাঁঝবাতির মতো; যেন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা সকালের সূর্যের অপেক্ষায়। এই যে ২০০২ সাল থেকে বিশ্বকাপ ট্রফির সঙ্গে আড়ি, সেটিকে বন্ধুতায় রূপান্তরের চ্যালেঞ্জই তো এবার সেলেসাওদের! না হয় সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ ড্র করেছে, তবু আজ কোস্টারিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচের আগে আশার আলো কমছে না এতটুকুন।

সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের মতোই!

রোস্তভ-অন-ডনে নিজেদের প্রথম ম্যাচ শেষে বেইসক্যাম্প সোচিতে চলে গিয়েছিল ব্রাজিল। সেন্ট পিটার্সবার্গে এসে পৌঁছেছে পরশু রাতে। রাত বলাটা হয়তো ঠিক না, কারণ রাতই তো হয় না। বছরের দীর্ঘতম দিন এখানে পরিচিত ‘হোয়াইট নাইট’ নামে। উৎসবের মাদল বাজছে তাই অহর্নিশ। সে উৎসবকে আরো রাঙিয়ে দেওয়ার জন্যই শহরে পা রেখেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ‘রাত যে হচ্ছে না, এমন কিছুর সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল না। ব্যাপারটা অদ্ভুতুড়ে। তবে আমরা মানিয়ে নিয়ে প্রস্তুত কোস্টারিকার জন্য’—কাল সংবাদ সম্মেলনে বলছিলেন এ ম্যাচের অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা।

সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারের ঠিক পাশেই সংবাদ সম্মেলন কক্ষ। দুপুর ৩টায় সেখানে আসার কথা কোচ লিওনার্দো বাচ্চি তিতে ও অধিনায়ক সিলভার। ঘণ্টাখানেক আগে গিয়েই অপেক্ষা তাঁদের জন্য। প্রথম ম্যাচ হারের পর গণমাধ্যমের তোপের মুখে পড়বেন বলে ধারণা ছিল। কিসের কী! দারুণভাবে সামলালেন কোচ। কথার পিঠে কথা বলছেন, হালকাচালের কথা বলে হাসির ফোয়ারাও ছোটালেন। সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে হারের পর কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন তিতে, অমনটা তো মনে হলো না একবারও।

নেইমারের খেলা, না খেলা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ছিল অনেক। তিতে তা উড়িয়ে দেন এক ফুত্কারে। শুধু তা-ই নয়, ম্যাচের আগের দিন একাদশ পর্যন্ত ঘোষণা করে দেন, ‘সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে যে ১১ জন খেলেছে, কোস্টারিকার বিপক্ষেও শুরু করবে তারা। নেইমারও খেলবে। ও পুরোপুরি ফিট।’ কথাগুলো বলছিলেন পর্তুগিজ ভাষায়; কানে থাকা অনুবাদক যন্ত্রে তা রূপান্তিত ইংরেজিতে। তাহলে যে সুইসদের বিপক্ষে ম্যাচের পর এক দিন অনুশীলন করেননি। পরের দিন ফিরলেও মিনিট দশেক পর উঠে গিয়েছিলেন! বিশ্বকাপের মঞ্চ না হয়ে সাধারণ ম্যাচ হলে কি এই অবস্থায় খেলতেন নেইমার; এ স্যাক্রিফাইস করা হতো? ধৈর্য ধরে প্রশ্নটি শুনে দার্শনিকের মতো জবাব দেন তিতে, ‘এটি কোনো স্যাক্রিফাইস না। নেইমার সুস্থ রয়েছে বলেই খেলবে। আমরা অবশ্যই জিততে চাই। কারণ এটি বিশ্বকাপের ম্যাচ। তাই বলে কোনো কোচ তাঁর ফুটবলারের সঙ্গে অসৎ হতে পারেন না; তাঁর স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন না। এই সুস্বাস্থ্য ও সততার সঙ্গে কোনো আপস করতে পারি না আমি। আর আপনি কী যেন বললেন, স্যাক্রিফাইস। নাহ, নেইমারকে আমরা স্যাক্রিফাইস করছি না।’

এমনভাবে বুঝিয়ে বলার পর ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যমের না বুঝে উপায় কী!

তবে প্রথম ম্যাচে ড্রয়ের পর কোস্টারিকার বিপক্ষে সেন্ট পিটার্সবার্গের ম্যাচটি যে ব্রাজিলের জন্য বাঁচা-মরার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটিও ভালোভাবে বোঝেন তিতে। আরাধ্য সে জয়ের জন্য করণীয়টাও জানেন তিনি, ‘এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ খেলা কেননা প্রথম ম্যাচ আমরা ড্র করেছি। জিততে হলে ওই খেলার মতোই জমাট হতে হবে আমাদের রক্ষণভাগ এবং আক্রমণভাগকে হতে হবে আরো কার্যকর।’ সুইসদের চেয়ে কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচের আবহের পার্থক্যটাও ব্রাজিলকে সাহায্য করবে বলে বিশ্বাস কোচের, ‘প্রথম ম্যাচে বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ ছিল অনেক বেশি। খেলোয়াড়দের ছিল; কোচ হিসেবে আমারও ছিল। এখন তা চলে গেছে। সে কারণে আরো ভালোভাবে মনোযোগ দিতে পারছি।’ সেই গভীর মনঃসংযোগের মধ্যেও রসিকতা ঠিকই করেন তিতে। সংবাদ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক শেষ ঘোষণার পর পাশে থাকা কোচিং স্টাফের সদস্য সিলভিনহোকে দেখিয়ে হাসতে হাসতে বলেন তাই, ‘ওকে কোনো প্রশ্ন করছেন না কেন? আমি অপেক্ষা করছি, ওকে একটা কঠিন প্রশ্ন করুন।’

গণমাধ্যমের সঙ্গে জাতীয় দলের কোচের সম্পর্কটা কার্লোস দুঙ্গার সময়ের চেয়ে কতই না বদলে গেছে! সংবাদ সম্মেলন থেকে বেরোতে বেরোতে সে কথাই বলছিলেন ব্রাজিলের সাংবাদিকরা।

সংবাদ সম্মেলন শেষে সেন্ট পিটার্সবার্গের স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের অনুশীলন দেখার সুযোগ ছিল ১৫ মিনিট। মাঝমাঠের বৃত্ত ঘিরে দাঁড়িয়ে খেলোয়াড়রা অনুশীলন করলেন শুরুতে। এরপর মূল একাদশের সঙ্গে বাকিদের আলাদা করে ফেলেন তিতে। ১১ জন দাঁড়িয়ে যান একেবারে ৪-৩-৩ ছকে। মাঠের সবুজে ফরমেশন অনুযায়ী ওই তিনটি লাইন দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। এরপর ফরোয়ার্ড লাইন নিয়ে তিতের কিছু কাজ দেখার সুযোগ হলো। ডানে উইলিয়ান, মাঝে গাব্রিয়েল জেসুস, বাঁয়ে নেইমার। নিজে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার সেজে জেসুসের সামনে থেকে বল নিয়ে দেন ডানে। সেখানে থাকা নেইমারকে চিত্কার করে বলেন কিভাবে দৌড়ে এই ফাঁকা জায়গা ভরাট করতে হবে। সেন্ট পিটার্সবার্গের ফাঁকা গ্যালারিতে তিতের পর্তুগিজ ভাষার চিত্কার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। সে ভাষা না বুঝলেও ফুটবলের সর্বজনীন ভাষা বুঝতে তো সমস্যা হয় না এতটুকুন।

বিশ্বকাপের মঞ্চে সহজ প্রতিপক্ষ বলে তো কিছু নেই। তবু খেলাটি কোস্টারিকার বিপক্ষে হওয়ায় ইতিহাসের প্রেরণার অনেক বুদ্বুদ উড়তে পারে ব্রাজিল ক্যাম্পে। মুখোমুখি সর্বশেষ ১০ দেখায় ৯ বারই জিতেছে ব্রাজিল; পরাজয় শুধু ১৯৬০ সালের প্রীতি ম্যাচে। বিশ্বকাপের দুই দেখার মধ্যে ১৯৯০ সালে ১-০ এবং ২০০২ সালে ৫-২ গোলে জয় সেলেসাওদের। চলতি টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে সার্বিয়ার কাছে ০-১ গোলে হেরেছে কোস্টারিকা। আর ব্রাজিল সুইসদের সঙ্গে ড্র করলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে না যাওয়াটা তাদের জন্য অচিন্তনীয়। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সর্বশেষ ১৩ ম্যাচে অজেয় দলটি; ১৯৮২ থেকে শুরু করে প্রতি বিশ্বকাপে হয়েছে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। আজ কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিলের পক্ষে বাজি তাই ধরা যায় নিশ্চিন্ত নির্ভরতায়।

সেন্ট পিটার্সবার্গের ‘হোয়াইট নাইট’ উৎসব আজ তাহলে বদলে যাবে ‘ইয়েলো নাইট’-এ। বাসন্তী উৎসবে হলুদের রং ছড়াবে ছবির মতো সুন্দর এ শহরে। পুরো পৃথিবীতেও নয় কি! 



মন্তব্য