kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

ফুটবলযোদ্ধাদের ঋণ শোধের দায়

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ফুটবলযোদ্ধাদের ঋণ শোধের দায়

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনের শুরু আজ। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

 

সে ছিল এক রাক্ষুসে সময়! পাকিস্তানি শকুন-হায়েনাদের উল্লাসনৃত্যে মানবতার কেঁপে ওঠার কাল। অন্যায়-অত্যাচারের নৃশংস উপাখ্যানে রক্তের বান ডাকে এই মানচিত্রে। নদীর পানি হয়ে যায় লাল; সূর্যাস্তের লালিমা হয়ে ওঠে সেই বিষণ্নতার আয়না। কিন্তু কতক্ষণ আর? বিষাদ বুকে নিয়ে ঠিকই গর্জে ওঠে বাঙালির হৃদয়ের স্টেনগান। প্রতিরোধের আরেক মহাকাব্যের সূচনা সেখানে।

স্বাধীনতার সংগ্রামে সম্মুখসমরই সর্বোত্কৃষ্ট। অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দেওয়াই দস্তুর। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সেই আশ্চর্য সময়ে ভিন্ন এক রণাঙ্গনেও লড়াইয়ে নামে বীর বাঙালি। সেই ময়দান ফুটবলের। ‘বাংলাদেশ একাদশ’ নাম নিয়ে ফুটবলাররা ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় জনমত তৈরির জন্য খেলেন ১৬টি ম্যাচ। মানুষের ভালোবাসায় মানুষের মুখে মুখে সেই দলটি হয়ে ওঠে ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ক্রীড়াবিদদের এমন সক্রিয় অংশগ্রহণের নজির নেই।

অথচ যুদ্ধ শেষেই যেন ফুরিয়ে গেছে এর প্রয়োজনীয়তা। সবাই ভুলে গেছে সেই দলের ফুটবলারদের। শুধু গুটিকয়েকের আখের গোছানোর জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে তা। আর ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে সমগ্র বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে যেমন ছিনিমিনি খেলা হয়েছে, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলও এর বাইরে থাকতে পারেনি। ইতিহাসের পুনর্পাঠের প্রয়োজনীয়তায়, অন্ধকার চিরে আলোর অনুসন্ধানের জন্যই সেই দলের সদস্যদের কাছে গিয়েছি গত মাসখানেক ধরে। ইতিহাসের বিকৃতি সংশোধনের জন্য তাঁদের চেয়ে যোগ্য কেউ তো আর নেই।

স্বাধীন বাংলা দলে মোট ফুটবলার ৩৫ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৯ জন। বিদেশে থাকেন ছয়জন। এর মধ্যেও শাহজাহান আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলেও বাকি পাঁচের সঙ্গে তা সম্ভব হয়নি। দেশে থাকা এবং বেঁচে থাকা ২০ জনের প্রত্যেকের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়ার পাশাপাশি বিদেশের এক ফুটবলারের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে টেলিফোনে। কোচ ননী বসাক মারা গেছেন; যোগাযোগ করা হয়েছে ম্যানেজার তানভীর মাজহার তান্নার সঙ্গে। যশোর থেকে বরিশাল। মাদারীপুর থেকে খুলনা। ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা। পুরো দেশ ঘুরে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের দেশে থাকা জীবিত সব সদস্যের সঙ্গে কথা বলেই কালের কণ্ঠ’র এই ধারাবাহিক আয়োজন।

১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রথম ম্যাচ খেলে নদীয়ার কৃষ্ণনগরে। ফুটবলাররা গোঁ ধরেন, ম্যাচের আগে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজাতে হবে; জাতীয় পতাকা ওড়াতে হবে। কিন্তু তখন পর্যন্ত তো ভারত সরকার বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। জেলা প্রশাসকের আপত্তি ছিল তাই। তবে ফুটবলারদের দাবির মুখে ঠিকই তা করার অনুমতি দেন। বিদেশের মাটিতে ওই প্রথম ওড়ে জাতীয় পতাকা, ওই প্রথম বাজে জাতীয় সংগীত। আর ফুটবলার-কর্মকর্তা সবার চোখে তখন চিকচিক করছিল আনন্দাশ্রু।

এরপর আরো ১৫টি ম্যাচ খেলেছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। প্রত্যেক জায়গায় সাড়া পড়েছে ভীষণভাবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে তৈরি হয়েছে জনমত। বম্বের এক ম্যাচে তো ক্রিকেটার নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি পর্যন্ত ফুটবল খেলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে। গ্যালারিতে ছিলেন দিলীপ কুমার, শর্মিলা ঠাকুররা। ম্যাচের টিকিটে বিক্রি এবং অনুদানের অর্থ তুলে দেওয়া হতো প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের হাতে।

ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের ফুটবলাররা রেখেছিলেন বীরের ভূমিকা। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা তাঁদের বেশির ভাগকে ভুলে গেছি। ধারাবাহিক প্রতিবেদনে তা জানতে পারবেন পাঠক। অনন্ত হাহাকারে তাই ডুবে যান ওই ফুটবল-বীররা। পরক্ষণেই চোখে-মুখে ঝিলিক দেয় গর্ব—স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অংশ যে তাঁরা! পৃথিবীর ইতিহাসে যে সৌভাগ্য হয়নি আর কোনো ক্রীড়াবিদের!

 

► দলের প্রতিষ্ঠাতা প্যাটেল

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল



মন্তব্য