kalerkantho


বিভাজনের কারণেই বিস্মৃত

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিভাজনের কারণেই বিস্মৃত

অধিনায়ক পিন্টু স্বাধীন বাংলার সিঁড়ি ব্যবহার করে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন ক্ষমতাবানদের সঙ্গে। তাতে নিজের ইমেজের রোশনাই বেড়েছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বাকি সদস্যরা থেকে গেছেন অবহেলিত।

বঙ্গবন্ধু তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন ‘আমার সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল’ বলে। কখনো-সখনো ফরিদপুরের আঞ্চলিক ভাষায় আদর করে ডাকতেন, ‘আমার মেয়াচাঁন’। আর পুরান ঢাকায় তো একটা কথা প্রচলিতই হয়ে যায়, ‘শেখের চার পোলা—কামাল, জামাল, রাসেল ও প্যাটেল।’ এই সাইদুর রহমান প্যাটেলের সঙ্গে তুমুল বন্ধুত্ব শেখ কামালের। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে ’৭৫-এর রোদমাখা এক বিকেলে হাসিমুখে বলেছিলেন তাঁকে, ‘তোদের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্য দারুণ সুখবর আছে রে। কিছুদিনের মধ্যেই পাবি।’

সেই কিছুদিন আর ফুরোয় না। ১৫ আগস্টের অভিশপ্ত রাত আরো অনেক কিছুর মতো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকেও রেখে দেয় অনন্ত অপেক্ষায়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার জন্য কেটে যায় কত কত প্রহর!

১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মাস পেরোনোর আগেই গ্রেপ্তার হন প্যাটেল। ঠাঁই হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ডিভিশন প্রিজনার হিসেবে সংবাদপত্র-ম্যাগাজিন পেতেন। সেখানেই একদিন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় দেখেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে লেখা, ‘একাত্তরের যুদ্ধে দুটি রণাঙ্গন— একটি সশস্ত্র, একটি ক্রীড়া রণাঙ্গন।’ খুশিতে লাফিয়ে ওঠা প্যাটেল দমে যান ভেতরের লেখা পড়ে। সেখানে যে তাঁর নাম অনুপস্থিত! শুধু তা-ই নয়, দলটির ইতিহাস নিয়েও চরম মিথ্যাচার ছাপার হরফে। যে স্মৃতিচারণে এখনো আর্দ্র হয়ে ওঠে প্যাটেলের কণ্ঠ, ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে ইতিহাসের বিকৃতির শুরু সেখানেই। এটিকে শুধু অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর দল হিসেবে উপস্থাপনের শুরুও। এরপর এই মহান দলের নাম নিজের স্বার্থের কাজে ব্যবহার করেছেন তিনি। স্বাধীন বাংলা দলের খেলোয়াড়দের জিজ্ঞেস করলে তা জানতে পারবেন।’

সত্যিই তাই। ’৭৫ পরবর্তী সময়ে ক্রমশ ফিকে হতে থাকে প্যাটেলের নাম। জেল খেটে, অনেক দিন আড়ালে থেকে পরে প্রবাসজীবনে হয়ে পড়েন বিস্মৃতপ্রায়। অন্যদিকে অধিনায়ক পিন্টু স্বাধীন বাংলার সিঁড়ি ব্যবহার করে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন ক্ষমতাবানদের সঙ্গে। হন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের স্পোর্টস সেক্রেটারি; ভাইস প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত। তাতে নিজের ইমেজের রোশনাই বেড়েছে। সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরার মতো কারো কারো প্রোফাইলের বেড়েছে চেকনাই। কিন্তু স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বাকি সদস্যরা থেকে গেছেন অবহেলিত। যাঁদের অনেকের দুবেলা ভাত জোটে না; ওষুধ কেনার টাকা থাকে না। অধিনায়ক-সহঅধিনায়কের ওপর তাই এখনো ভীষণ রাগ তাঁদের!

ফরোয়ার্ড শেখ তসলিম উদ্দিন যেমন চাঁচাছোলাই বলেন, ‘পিন্টু ভাই ও প্রতাপদা নিজেদের স্বার্থ লুটেছেন। বিএনপির আমলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের নাম করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অথচ আমরা ভাতই খেতে পারি না।’ আবদুল খালেকেরও একই কথা, ‘স্বাধীন বাংলা দলের ফুটবলারদের দাঁড় করাতে না পারলে তো টাকা পাবে না। আমাদের বিভিন্ন জায়গায় দাঁড় করিয়ে হয়তো পাঁচ শ-হাজার টাকা পকেটে গুঁজে দিয়েছে। কিন্তু নিজেদের পকেটে ভরেছে লাখ লাখ টাকা।’ আবদুল হাকিমেরও প্রায় অভিন্ন উচ্চারণ, ‘পিন্টু ভাই স্বার্থপর। নিজেকে ছাড়া আর কিছু বোঝে না। বড় ভাই হিসেবে শ্রদ্ধা করলেও মানুষ হিসেবে তাঁকে ভালো বলা যাবে না।’ শাহজাহান আলমেরও একই কথা, ‘পিন্টু-প্রতাপের শয়তানির শেষ নেই। এরা আমাদের কত উপদ্রব যে করেছে! প্রতাপদা নকল পুলিশ পর্যন্ত পাঠিয়ে হয়রানি করেছে কলকাতায়।’ ডিফেন্ডার শেখ আশরাফ আলীর ক্ষোভ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের নামকে অধিনায়কের নিজস্বার্থে কাজে লাগানোয়, ‘‘পিন্টু ভাইয়ের রাজনৈতিক আলাদা পরিচয় থাকতে পারে। কিন্তু স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে উনি তো ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলতে পারেন না।’’ বীরেন দাস বীরুর আক্ষেপের জায়গা অন্যত্র, ‘পিন্টু ভাই একাই স্বাধীনতা পদক পেলেন। ওনার কি উচিত ছিল না, পুরো স্বাধীন বাংলা দলের জন্য ওই পদকটি চাওয়া? রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি তো ছিলেন। উনি চাইলেই এটি হতো।’

তা চাননি। উল্টো দলে বিভাজন জিইয়ে রেখে স্বার্থসিদ্ধি করেছেন বলে সতীর্থদের অভিযোগ। আর প্যাটেলের সঙ্গে পিন্টু-প্রতাপের সেই ঝামেলার শুরু ১৯৭১ সালেই। যার জেরে দলের প্রতিষ্ঠাতা হওয়া সত্ত্বেও দুই ম্যাচ পরই স্বাধীন বাংলা দল ছেড়ে চলে যান প্যাটেল। কারনানি ম্যানশনে ইচ্ছাকৃতভাবে পানির কল ছেড়ে সবার লেপ-তোষক ভিজিয়ে দেওয়ায় অভিযুক্ত করা হয় তাকে। সেই সঙ্গে দেয়া হয় পিন্টুর ট্রানজিস্টার চুরির দায়ও। কিভাবে পিন্টু-প্রতাপরা তা করতে পারেন, ভাবতে এখনো বিস্ময় লাগে বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ফিরে আসা প্যাটেলের, ‘আমি অমন কিছু করতে পারি কি না, এখনো অন্যদের জিজ্ঞেস করে দেখুন। নিজের তৈরি ঘরে আগুন লাগতে দেব না বলেই শুধু স্বাধীন বাংলা দল ছেড়ে রণাঙ্গনের যুদ্ধে চলে যাই আমি।’ কিন্তু পিন্টু-প্রতাপ-সুভাষের এখনো এক কথা, ‘অবশ্যই এটি প্যাটেল করেছে। দুর্ঘটনাবশত হয়েছে বলে মানি না।’ যদিও ওই সময়ের বিভাজনে তাঁদের পক্ষাবলম্বন করা আমিনুল ইসলাম সুরুজের মত পাল্টে গেছে, ‘তখন বয়স কম ছিল, না বুঝেই লাফালাফি করেছি। এখন বুঝতে পারি, প্যাটেলের পক্ষে অমন কিছু করা কিছুতেই সম্ভব না।’

কিন্তু ওই যে একটি বিভাজনরেখা টেনে দেয় ঘটনাটি, যার জের চলছে আজও। স্বাধীন বাংলা দলের যথার্থ স্বীকৃতি না পাওয়ায় এর ভূমিকাই মুখ্য হিসেবে দেখেন প্রায় সবাই। এ কে এম নওশেরুজ্জামান বলেন যেমন, ‘বিভাজনের কারণেই রাষ্ট্রের কাছ থেকে তেমন কিছু এখনো পেলাম না।’ একই কথা ফজলে সাদাইন মৃধা খোকনের, ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের দুর্দশার কারণ আমাদের ওই দলাদলি।’ কাজী সালাউদ্দিনের ছোট্ট এক বাক্য, ‘এই বিভাজন খুব দুর্ভাগ্যজনক।’

পিন্টু-প্রতাপ দুজনই বেমালুম অস্বীকার করেছেন বিভাজনের কথা। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের অভিযোগও নেন না আমলে। কিন্তু ওই দলের প্রায় সব সদস্যই যখন অভিযুক্ত করেন তাঁদের, ইতিহাসের কাঠগড়ায় তো দাঁড়াতেই হবে। সেটি তাঁরা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক ও সহঅধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও!



মন্তব্য