kalerkantho


অথচ ওরা অলিম্পিকও খেলেছিল

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আহা রে! আফগানিস্তানকে ম্যাচপ্রতি ২০-২২ গোল হজম করতে দেখে মুখ টিপে হাসির বদলে এ বেদনা জেগে উঠতে পারে আপনার, যখন জানবেন এই প্রথমবারের মতো কৃত্রিম টার্ফ ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয়েছে তাদের। কাবুলে পাথুরে জমিতে অনুশীলন করে ওমানে এসেছে তারা এশিয়ান গেমস বাছাই খেলতে।

টুর্নামেন্টটা বাছাই টুর্নামেন্ট ঠিক; কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই আফগানদের লক্ষ্য সেটা নয়। তারা এই যে ২০-২২ গোলে হারছে, এটাই এক অর্থে দেখানোর জন্য এসেছে এশিয়ান হকিতে। আর দেখাতে চাইছে খেলার জন্য নিজেদের প্রবল আগ্রহটা। সেদিন বাংলাদেশ দলের এক কর্মকর্তা অভিমান নিয়ে বলছিলেন, ‘দেখেছেন, আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূত মাঠে বসে দলের খেলা দেখে গেলেন। আমাদের দূতের তো কোনো খোঁজই পেলাম না!’ ওমানে আফগান রাষ্ট্রদূত আজিমুল্লা নাসির জিয়াকে বাহবা দিতেই হয়। প্রথম ম্যাচে হংকংয়ের কাছে দলের ১৯ গোল হজম ঠায় চেয়ারে বসে দেখে গেলেন। কিন্তু মুখ লুকাননি, থাইল্যান্ডের বিপক্ষে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আবারও তিনি হাজির। এদিন দল হজম করল গুনে গুনে ২৩ দল। তিনি আজ নিশ্চিত বাংলাদেশের বিপক্ষেও খেলা দেখতে চলে আসবেন। আফগান জামাল আব্দুল নাসের বলছিলেন, ‘মাত্র ১০ দিনের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা এ টুর্নামেন্টে এসেছি। এর আগে জাতীয় দলই তো ছিল না। আফগান জাতীয় দল শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে ২০০৪ সালে। বাংলাদেশেই গিয়েছিলাম আমরা চ্যালেঞ্জ কাপ খেলতে। এর পর থেকে কোথাও কোনো ম্যাচই খেলা হয়নি। এই টুর্নামেন্টের জন্য একেবারে নতুন করে আমরা দলটা গড়েছি।’

খেলাধুলাটা আফগানদের রক্তে মিশে আছে। তালেবান সরকারের পতনের পর গত প্রায় এক দশকে প্রায় প্রতিটি খেলা নতুন করে শুরুর পর যে গতিতে এগিয়েছে তারা, সেটা বিস্ময়কর। ক্রিকেট তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আফগানরা এ খেলাটাকে এখন এমনভাবেই আঁকড়ে ধরেছে যে বলা হচ্ছে, দেশে ‘শান্তি’ আলোচনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গই হলো এখন ক্রিকেট। আফগানদের খেলোয়াড়ি সামর্থ্য এর আগে ফুটবলেও ফুটে উঠেছে, সাফে মাত্র দ্বিতীয়বারের অংশগ্রহণেই শিরোপা জিতে কাবুলের রাস্তায় জয়োত্সব করেছে। এরই মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে ফুটবলে তারা এই দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে। যে কারণে এএফসি এখন তাদের মধ্য এশিয়ার গ্রুপে জায়গা দিয়েছে। বলতে হয় বাস্কেটবলের কথাও। ২০১০ এসএ গেমসে প্রথমবারের অংশগ্রহণেই ভারতীয়দের আধিপত্য গুঁড়িয়ে দিয়ে তারা সোনা জিতেছে। গত আসরে অবশ্য তারা অংশই নেয়নি। এতে ভারতীয় কুটনীতি কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সেই জটিলতায় শেষ পর্যন্ত গুয়াহাটির বাস্কেটবল ইভেন্টটিই আর হয়নি। এই আফগানরা এখন হকির জন্য মুখ চেয়ে আছে এশিয়ান হকি ফেডারেশনের। অন্যান্য খেলায় দ্রুত উন্নতি হলেও হকিতে পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে নাসের বলেছেন আর্থিক সমস্যার কথা, ‘ফুটবলে মেতে ওঠার জন্য একটা বল হলেই চলে, ক্রিকেটেও ব্যাট-বল নিয়ে যেখানে-সেখানে খেলাটা শিখে ফেলা যায়। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া হকি এগোয় কী করে! পুরো আফগানিস্তানে আমাদের কোনো টার্ফ নেই। পাথরের শক্ত মেঝেতে ওখানে খেলার চেষ্টা চলে। কাবুলের কয়েকটা ক্লাবের হকি দল আছে, টুর্নামেন্ট হয় মোটামুটি মানের দুটি ঘাসের মাঠে।’

একটা সময় হকি ছিল ঘাসের মাঠেরই খেলা। আফগানরাও ঘাসে খেলে হকিতে ছিল প্রবলভাবেই। তবে সেটা সেই পুরনো দিনের কথা। যখন ধ্যান চাঁদ জাদু দেখাচ্ছেন, তখন আফগানরাও খেলেছে অলিম্পিক। ১৯২৮, ১৯৩৪ ও ১৯৩৬—এই তিনটা অলিম্পিক জিতেছিলেন ভারতীয় কিংবদন্তি। আফগানরা খেলেছিল ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে। গ্রুপে ডেনমার্ককে পেছনে ফেলে তারা দ্বিতীয় হয়েছিল। জার্মানির কাছে হেরেছিল ৪-১। জার্মানদের জালে বল ঢোকানো সেই আফগানরা এখন হংকং, থাইল্যান্ডের সামনেই চোখে অন্ধকার দেখেছে।

জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড়, বর্তমান দলের কোচ নাসের এককথায় যুদ্ধ আর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন, ‘কখনো রাশিয়ানরা, কখনো আমেরিকানরা, কখনো মুজাহিদীনরা, কখনো তালেবানরা—প্রতিবার ক্ষমতার পালাবদলে দেশের খেলাধুলা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৩৬ অলিম্পিকে যাঁরা খেলেছিলেন, তাঁদের পরের প্রজন্ম আবার একেবারে শিকার হয় নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের। রাশিয়ায় ম্যাচ খেলে দেশে ফেরার পরপরই কারা যেন খেলোয়াড়দের ধরে নিয়ে মেরে ফেলে। তখনো এমন ক্ষমতার পালাবদল চলছিল, বিদেশিদের হটিয়ে মুজাহিদীনরা ক্ষমতায় ফিরেছিল। আফগান হকির ওপর প্রথম বড় আঘাত ছিল সেটাই।’

আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়ানো আফগান দল ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছে।


মন্তব্য