kalerkantho


ওমানিদের হৃদয়ে ফুটবল

শাহজাহান কবির, মাসকাট থেকে ফিরে   

২০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মেসি, রোনালদো, রবেন, ওয়েজিল, আলী আল হাবসি, ইমাদ আল হোসনি, স্নাইডার, শেভচেংকো, দ্রগবা—খাবারের মেন্যুতে একে একে সব ফুটবলারের নাম। টিম হোটেলের সামনে বুশার স্ট্রিটের দুপাশে বেশ কয়েকটি কলেজ। তাই এখানকার খাবারের দোকানগুলোতে সেই কলেজপড়ুয়াদের ভিড়। বিকেলে ইউরোপিয়ান বিভিন্ন ক্লাবের জার্সি গায়ে ওরা হুল্লোড় করে। ওদের আনন্দ দিতেই দোকান মালিকদের এই কৌশল।

বার্সেলোনা, রিয়াল, আর্সেনাল তারকাদের পাশে আরবি নামগুলো অবশ্য কৌতূহল জাগায়। মেন্যু তালিকায় আলী আল হাবসির নামটা তো সবার ওপরে। তাঁরা সবাই ওমানি ফুটবলার। রাতে কোনো একটা ক্যাফেতে ঢুঁ দিলেও দেখা যাবে বড় পর্দায় খেলা চলছে। শুধু ইউরোপিয়ান ফুটবলই নয়, পরশু সন্ধ্যায় যেমন বেশির ভাগ ক্যাফের টিভিতেই চলেছে এএফসি কাপের ম্যাচ। মাসকাটের পাশের শহর সালালার দল ধোফার এফসির সঙ্গে খেলা ছিল জর্দান ক্লাব আল ফয়সালির। ধোফারের ১-০ গোলের লিড ধরে রাখা নিয়ে ওমানিদের উৎকণ্ঠা দেখার মতো। এএফসি কাপের পরপরই এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগে ঘুরে গেছে টিভি চ্যানেল। এবারের আসরে ওমানের কোনো দল নেই। সেখানে সৌদি আরবের আল আহলির সঙ্গে খেলা হচ্ছিল কাতার আল ঘারাফার। একটা কুইজ হতে পারে, ডাচ তারকা ওয়েসলি স্নাইডার এখন কোন ক্লাবে খেলেন? অনেকেই জানেন না হয়তো যে, ইন্টার মিলান, গ্যালাতসরয়, নিস হয়ে এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার এখন ঘারাফার খেলোয়াড়। মধ্যপ্রাচ্যে ফুটবলের মানটা এএফসি টুর্নামেন্টে গেলে বাংলাদেশের দলগুলো টের পায়। এখানে জনপ্রিয়তায়ও ইউরোপের ফুটবলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে নিজেদের ফুটবল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘরোয়া ফুটবলটাই বরং বেশি জনপ্রিয়।

মাসকাটে সুলতান কাবুস স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ফুটবল স্টেডিয়ামের পাশে হকি কমপ্লেক্সটায় বলতে গেলে কিছুই না। তবে শুরুর দিন থেকে নিশ্চুপ, নিথর স্থাপনাটাই শুধু দৃশ্যমান। লিগ চললেও এর মধ্যে কোনো ম্যাচ হয়নি। আগামীকাল শহরের অন্য একটি মাঠ, সিব স্টেডিয়ামে এইচএম (হিজ ম্যাজেস্টি) কাপের সেমিফাইনাল আল শাবাব ও আল নসর ক্লাবের মধ্যে। নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায়, সেদিন ফুটবল উন্মদনায় মেতে উঠবে ওমানিরা।

এখানে ইংরেজি পত্রিকাগুলোতে ক্রিকেটের খবর থাকে ভালো করেই। টাইমস অব ওমানে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের রেকর্ড জয়ের খবর এসেছে মুশফিকুর রহিমের ছবিসহ-ই। ভারতীয়, পাকিস্তানিসহ মূলত প্রবাসীদের কথা মাথায় রেখেই ক্রিকেটটা এখানে গুরুত্ব পায়। ভারতীয়, পাকিস্তানিরা প্রচুর খেলছেও ওমানি ক্রিকেট লিগে। ওমান জাতীয় দলেও উপমহাদেশীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার পাওয়া যাবে।

কিন্তু ফুটবলটা তাদের একেবারে নিজস্ব। আরবি পত্রিকাগুলোর খেলার পাতাজুড়ে তাই ফুটবলের খবরই বেশি। ২০১৭-১৮ গালফ কাপ চ্যাম্পিয়ন ওমান। ২০০৯-এ প্রথম তারা জিতেছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মর্যাদার এই আসর। আলী আল হাবসি তখন থেকেই জাতীয় দলে। উইগান অ্যাথলেটিক, বোল্টন ওয়ান্ডারার্সসহ বেশ কয়েকটি ইংলিশ ক্লাবেও খেলেছেন এই গোলরক্ষক। নরওয়ে লিগ সেরা গোলরক্ষক হয়েছিলেন। মোহাম্মদ সালাহর উত্থানের আগে পুরো ‘মিনা’ (মিডল ইস্ট ও নর্থ আফ্রিকা) অঞ্চল থেকে আর্সেনালের মারুয়ান চমখ ও উইগানের হাবসিই ছিলেন সবচেয়ে দামি ফুটবলার। ২০০৯-এর গালফজয়ী দলের খেলোয়াড়রাই এত দিন ওমানের সোনালি প্রজন্মের তকমা পেয়ে এসেছেন। এ বছরের জানুয়ারিতে কুয়েতে দ্বিতীয়বারের মতো সে আসর জিতে তরুণরাও ভালোবাসার আসনটা ধরে রেখেছেন ওমানিদের হৃদয়ে।

হকিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঠিক মাঠে গিয়ে খেলার দেখার আগ্রহ যেন নেই ওমানিদের। এশিয়ান গেমস বাছাইয়েও ছোট স্টেডিয়ামটির গ্যালারি তাই ভরে না। দল ফাইনালে উঠলে কে জানে ভিন্ন ছবিও দেখা যেতে পারে। শৌখিন ওমানিরা সেইলিং আর ধৌ (ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় নৌকা) রেসিং নিয়েও কম মেতে থাকেন না। ওমান উপসাগরের কোল ঘেঁষে একের পর এক বিলাসবহুল রিসোর্ট, বোট ক্লাব... সেইলিং, ডাইভিংয়ের সব আয়োজন রয়েছে। ঘোড়দৌড়ও ভীষণ জনপ্রিয়। প্রতিবছর ট্যুর ডি ওমান (সাইক্লিং) হয়। মোটর রেসার আহমদ আল হার্থি তো দেশের শীর্ষ তারকাদেরই একজন। তবে সব কিছু ছাপিয়ে ফুটবল। আমাদের দেশে যেমন ক্রিকেট গোটা দেশকে এক সুতায় গাঁথে ওমানে তেমনি ফুটবল। গালফ কাপ জয়ের আনন্দে প্রবাসী, ভারতীয়, বাংলাদেশিরাও নাকি রাস্তায় নেমে এসেছিল। সেই উৎসব চলেছিল তিন দিন ধরে!

 



মন্তব্য