kalerkantho


বয়সের ভারে ন্যুব্জ যুব গেমস

সনৎ বাবলা   

২০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বয়সের ভারে ন্যুব্জ যুব গেমস

হকির ফাইনাল শেষে এক আম্পায়ার রসিকতা করে বলছিলেন, ‘এটা হয়ে গেছে বুড়োদের গেমস। এ দেশে বয়সসীমা ১৩-১৪ বছর বেঁধে দিলে যদি সঠিক যুব গেমস হয়।’ আসলে যুব আর অনূর্ধ্ব-১৭ এ আটকে থাকেনি, বয়সের কমনীয়তার সীমা ছাড়িয়ে সে হয়ে গেছে দুর্দমনীয় সুঠামদেহী! প্রথমে চোখের আন্দাজেই ধাক্কা খেয়েছে গেমসের বয়সের সৌন্দর্য, সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ ও সত্য ভাষণ মিলে দাঁড়াল এক চরম সত্যি—সদ্য সমাপ্ত যুব গেমস বয়সের ভারে ন্যুব্জ।

সম্ভাবনাময় সাঁতারেই ঘটেছে বয়স কারচুপির বড় ঘটনা। খুলনার বিভাগীয় সাঁতার দলের কোচ আমিরুল ইসলাম আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন পাঁচ সোনাজয়ী আরিফুল ইসলামকে, ‘যুব গেমসের সাঁতারে মূলত প্রতিভা অন্বেষণের ছেলে-মেয়েরা খেলেছে। তবে লক্ষণীয় ব্যাপার হলো ঢাকা বিভাগকে চ্যাম্পিয়ন করানোর জন্য বেশি বয়সীদের পুলে নামানো হয়েছে। সিনিয়র জাতীয় সাঁতারে সোনাজয়ী আরিফুল ইসলামও এই গেমসে খেলেছে। অথচ তার ছোট ভাই তিন মাস আগে এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরি নিয়েছে বিমানবাহিনীতে। আর বাহিনীতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের চাকরি হয় না। তাহলে আরিফুলের বয়স কী করে ১৭ বছরের কম হয়?’ এ প্রশ্নের জুতসই জবাব নেই কারো কাছে। সাঁতার ফেডারেশনের কর্তাদের দাবি, পাসপোর্ট অনুযায়ী তার বয়স ১৭ বছরের কম। তাহলে ছোট ভাই সজীব, আরিফুলের চেয়ে এক বছরের বড়! আগামী মাসে বিকেএসপির এই সাঁতারু যাবে অস্ট্রেলিয়ায় কমনওয়েলথ গেমসে। জাতীয় দলের সাঁতারু হিসেবেও তাকে যুব গেমসের বাইরে রাখলে এত বিতর্কের জন্ম হয় না।

ভারোত্তোলকরাও এগিয়ে ছিল বয়সের ভারে। আন্তর্জাতিক পদকজয়ী এক মহিলা ভারোত্তোলক সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছেন, ‘মেয়েদের বয়স ঠিক আছে তবে ছেলেদের বয়স অনেক বেশি।’ পর্যবেক্ষক হয়ে গেমস হকি দেখার সুবাদে হকি কোচ হোসেন ইমাম চৌধুরী শান্টারও হয়েছে একই অভিজ্ঞতা, ‘এখানে ২২ বছর বয়সী খেলোয়াড়ও আমার চোখে পড়েছে। ছেলে হকি দলের গড় বয়স ২০ বছরের কম হবে না। আমাদের দেশে বয়স ঠিক রাখাটা বিশাল চ্যালেঞ্জের। এ জন্য আমাদের খেলারও উন্নতি হয় না।’ শ্যুটিং, ভলিবল, হ্যান্ডবলের মতো কয়েকটি ডিসিপ্লিন বাদ দিলে বাকিগুলোতে বয়সের বাড়াবাড়ির গল্প বিস্তর, স্বাভাবিকভাবে গেমসে দাপটও ছিল তাদের। এ ক্ষেত্রে অনেকে বিকেএসপির অ্যাথলেটদের দিকেই আঙুল তুলেছে, যারা খেলছে নিজেদের বিভাগের হয়ে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, দেশের একমাত্র ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বয়স যাচাইয়ের কোনো মেডিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। তাতে বয়স কমিয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ বেশি এবং হরহামেশাই হয়। তাই ১০০ মিটার স্প্রিন্ট চ্যাম্পিয়ন হাসান মিয়ার দেহ-সৌষ্ঠব দেখে সন্দেহ হলেও পরক্ষণে দমে যেতে হয় নবম শ্রেণিতে পড়ছে শুনে।

যুব গেমসেও যে বয়স নির্ণয়ের কোনো আধুনিক ব্যবস্থা ছিল না। মেডিক্যাল কমিটির প্রধান ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জন্ম সনদ ও প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সনদ দেখেই অ্যাথলেটদের বয়স যাচাই করেছি আমরা। অনেকে দেখিয়েছে পাসপোর্ট, সেটি দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক মিটে অংশ নিলে আমরা বাধা দিই কী করে।’ ওই সনদ মুখ্য হলে মেডিক্যাল কমিটিরই বা দরকার কিসে। বিওএ যুগ্ম মহাসচিব আশিকুর রহমান মিকু অ্যাথলেটদের বেশি বয়সের কথা মেনে নিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন এভাবে, ‘বয়স নিয়ে অভিযোগ আমরা পেয়েছি। কিন্তু ডাক্তারি ব্যবস্থায় সঠিকভাবে বয়স নির্ণয় করাটা অনেক ব্যয়বহুল, আমাদের পক্ষে সেটা করা সম্ভব নয়। আমার লম্বা সাংগঠনিক ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বয়স লুকানোর স্বভাব আমাদের মজ্জায় ঢুকে গেছে।’ এই মজ্জাগত দুই নম্বরিকে প্রশ্রয় না দিয়ে শ্যুটিং স্পোর্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইন্তেখাবুল হামিদ অপু হয়েছিলেন কঠোর, ‘এই গেমসের উদ্দেশ্য নতুন প্রতিভা খোঁজা। তাই জাতীয় দলের ক্যাম্পে তিনজন অনূর্ধ্ব-১৭ শ্যুটার থাকলেও তাদের অংশ নিতে দিইনি, এর মধ্যে আমার মেয়েও আছে। কারণ যারা আন্তর্জাতিক মিটে গিয়ে শ্যুটিং করছে তাদের যুব গেমস খেলার দরকার নেই, এখানে খেলবে নতুনরা। এই নিয়মে আমি ৮০ ভাগ সফল হয়েছি।’

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক ফিফা ১৭ বছর পর্যন্ত ‘যুব ফুটবল’ ধরে। আর আইওসি (আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি) ১৫ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত যুব হিসেবে মানে, যুব অলিম্পিকের বয়সসীমাও এটা। বাংলাদেশ সেটাকে নিয়ে ঠেকিয়েছে ২২ বছরে কিংবা তারও বেশি! দেশের ক্রীড়ার অবিশ্বাস্য যুব উন্নয়ন!



মন্তব্য