kalerkantho


সেই গোল এসেছিল স্বর্গ থেকে!

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



সেই গোল এসেছিল স্বর্গ থেকে!

সেই মাথাভরা চুল তো কমে গেছে কবেই! সামনের কপাল বড় হয়ে গেছে বেশ খানিকটা। চুলে কালোর উঁকি কদাচিৎ; সাদারই প্রাধান্য সেখানে। কিন্তু এই বুড়িয়ে যাওয়া চেহারায়ও ছিপছিপে শরীর দেখে মনে হয়, চাইলে বুঝি এখনো মাঠে নামতে পারেন তিনি। বল পায়ে ব্যালে ড্যান্সারের মতো অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে রাঙিয়ে দিতে পারেন ফুটবলপ্রেমীদের মন।

তখনই ফুটবল ইতিহাসের পাতা থেকে আর্তনাদের বিউগল বেজে ওঠে। হাহাকারের ঢেউ ওঠে ফুটবল-রোমান্টিকদের হৃদয়ে। হায়, মাত্র ২৮ বছর বয়সেই যে থেমে গেছে এই মার্কো ফন বাস্তেনের ক্যারিয়ার! ইনজুরি না হলে ফুটবলের সবুজে আরো কত কাব্যগাথাই না লিখতে পারতেন এই ডাচ কবি!

ফন বাস্তেনের সঙ্গে দেখা সেন্ট পিটার্সবার্গে। ফ্রান্স-বেলজিয়াম সেমিফাইনালের আগে। ফিফা টেকনিকাল স্টাডি গ্রুপের সদস্য তিনি। বিশ্ব ফুটবলের নিন্ত্রয়ক সংস্থার স্যুট গায়ে। গলায় ঝুলছে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড, সেখানে তাঁর নাম লেখা। ভলান্টিয়ারদের কাছে জিজ্ঞেস করছিলেন, তাঁর বসার জায়গা কোথায়। ‘অজ্ঞ’ ওই ভলান্টিয়ারদের কাছে ফন বাস্তেনের আলাদা গুরুত্ব নেই; অন্য সবার মতোই কে একজন তিনি। দুজন তো বসার জায়গা দুদিকে বলে বিপাকেই ফেলে দেন বেচারাকে। অবশেষে তৃতীয়জনের হস্তক্ষেপে নিজের বসার জায়গা পান এই কিংবদন্তি। খোলা গ্যালারিতে।

সেখানে তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য অবশ্য ‘মার্কো’ বলে চিত্কার করে উঠে এলেন নেদারল্যান্ডসের এক সাংবাদিক। ফিফা টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের সদস্যের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ওই গণমাধ্যমের সঙ্গেও কী যেন কাজ করছেন ফন বাস্তেন। সে কারণেই গ্যালারিতে সাংবাদিককুলের মাঝে। বিস্ময়টা লাগল এ কারণেই যে, ফন বাস্তেনকে সেখানে চেনার মতো লোক হাতে গোনা। কাছে গিয়ে পরিচয় দিতে হাসিতে স্বাগত জানান। ছবি তোলার আবদারও রাখেন। যখন বলি, ‘আপনি আমার শৈশবের নায়ক’—ইংরেজি সে ভাষার কী বুঝলেন, কে জানে! তবে হাসিতে এবং চোখ টেপার প্রতিক্রিয়ায় নিজের খুশিটা জানিয়ে দেন ফন বাস্তেন।

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় তিনি। শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে আরো অনেক ধাপ ওপরে থাকতে পারতেন যদি ইনজুরি না হতো। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৩০১ গোল করেছেন ক্যারিয়ারে। ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছেন দুইবার। ঘরোয়া শিরোপা আরো ১৪ বার। আর ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের যে মুকুট, সেই ব্যালন ডি’অর জিতেছেন তিনি। অথচ আশ্চর্য কি জানেন, ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি যখন খেলেন, ফন বাস্তেনের বয়স তখন মোটে ২৮ বছর!

দুই পায়ে সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন ফন বাস্তেন; কোন পা শক্তিশালী বোঝার উপায় নেই। ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষের রক্ষণ চিরে বেরিয়ে যেতেন ব্যালে ড্যান্সারের মতো অনায়াসে। হেন কোনো উপায় নেই, যেভাবে গোল করতে পারতেন না। দূরপাল্লার শট, টেপ ইন, গোলরক্ষককে একা পেয়ে ওয়ান-অন-ওয়ানে, ফ্রি কিক, পেনাল্টি, হেড—কোথায় দুর্বলতা ছিল! আয়াক্সে ক্যারিয়ারের প্রথম ছয় বছরে ১৭২ ম্যাচে করেন ১৫২ গোল। হালফিলে লিওনেল মেসি, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর কারণে এটিকে হয়তো মনে হবে ‘তেমন আর কী’! কিন্তু আশির দশকের শুরুর ওই সময়ে ম্যাচপ্রতি এমন গোলগড় ছিল অবিশ্বাস্য। ১৯৮২ সালের এপ্রিলে মাত্র ১৬ বছর বয়সে অভিষেক হয় আয়াক্সে। দ্বিতীয়ার্ধে কার বদলি হিসেবে নামেন, জানেন? ইয়োহান ক্রুয়েফের। করেন গোলও। গোলের সখ্যে সেই যে বন্ধুতা শুরু, তাতে চির ধরেনি কখনো। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে স্পার্টার রটারডামের বিপক্ষে ৯-০ গোলে জেতা ম্যাচে তো ছয় গোল করেন পর্যন্ত। ফন বাস্তেন নিজেও পরবর্তী সময়ে বলেছেন, ‘এখন রোনালদো-মেসিরা মৌসুমে ৪০-৫০ গোল করে। আমি আয়াক্সে ২৬ ম্যাচে ৩৭ গোলও করেছি। যদি ইনজুরি না হতো মৌসুমে ৪০-৫০ করতে পারতাম।’

আয়াক্সের পর ফন বাস্তেনের স্বর্ণসময় এসি মিলানে। রুদ খুলিত, ফ্রাংক রাইকার্ডের সঙ্গে মিলে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর ত্রয়ী গড়ে তোলেন। নেদারল্যান্ডসের জার্সিতেও এনে দিয়েছেন সোনালি সাফল্য। ১৯৮৮ ইউরো জয়ে ফাইনালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে ফন বাস্তেনের সেই ভলি ভুলতে পারবে কে! এই গোল প্রথমবার দেখায় মুখ হাঁ হয়ে যেতে বাধ্য। এরপর যতবার এর রিপ্লে দেখবেন, হাঁ করা মুখ আর বন্ধ হবে না। ভীষণ ব্যস্ত ফন বাস্তেনকে সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে একটি প্রশ্নই করি শুধু, ‘১৯৮৮ ইউরোর ফাইনালে ওই গোল করলেন কিভাবে!’ ম্যাচ শুরু হতে তখন বাকি নেই বেশি সময়। নিজের ব্যাগ থেকে নোটবুক বের করতে করতে কাত হয়ে ওপরের আকাশের দিকে তাকান। এরপর ডাচ ভাষায় যা বলেন, সেটি অনুবাদ করে দেন পাশের নেদারল্যান্ডসের সাংবাদিক, ‘স্বর্গ থেকেই এসেছে ওই গোলটি।’

ফন বাস্তেনও ফুটবলের মহামঞ্চে এসেছিলেন স্বর্গ থেকে। শুধু অ্যাংকেলের হতচ্ছাড়া ইনজুরিটাই নরক থেকে নিয়ে আসেন দেবতার অভিশাপের মতো। যে কারণে ২৮ বছর বয়সে থেমে যায় ক্যারিয়ার। ১৯৯৩ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে মার্সেইয়ের কাছে এসি মিলানের ০-১ গোলে হারা ম্যাচটিই হয়ে যায় বাস্তেনের শেষ ম্যাচ। বছর দুয়েক পর ১৯৯৫ সালে তাঁর আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা দেওয়া হয় এসি মিলান ক্লাবের হেডকোয়ার্টার থেকে। তখন রবের্তো বাজ্জোকে নিয়ে তুমুল মাতামাতি। তাঁকে তুলনা করা হচ্ছিল ইতালির রেনেসাঁ যুগের শিল্পী রাফায়েলোর সঙ্গে। ফন বাস্তেনের অবসরের ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট আদ্রিয়ানো গালিয়ানিকে প্রশ্ন করেন, ‘বাজ্জো যদি রাফায়েলো হয়, ফন বাস্তেন তাহলে কে?’ গালিয়ানির উত্তর, ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। একই সঙ্গে শিল্পী ও প্রকৌশলী। ফুটবলের সব কিছুই ছিল তাঁর ভেতর।’

ফুটবলের এই মহান শিল্পীকে সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে চোখের সামনে দেখে মুগ্ধতার পাশাপাশি আর্তনাদও বুকের ভেতর বাজল চড়া সুরে। আহা রে, ইনজুরি না হলে আরো কত কিছুই না করতে পারতেন মার্কো ফন বাস্তেন। ১৯৮৮ ইউরো ফাইনালের সেই গোলের মতো কত কত ‘মোনালিসা’ আঁকা হতো ফুটবলের সঙ্গে তাঁর জাদুকরী স্পর্শে!



মন্তব্য