kalerkantho


হাওরে বন্যায় ফসলহানি রোধ করা জরুরি

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হাওরে বন্যায় ফসলহানি রোধ করা জরুরি

গত বছর হাওরে আগাম বন্যায় ফসলহানি হাওরবাসীর কষ্টের যেমন বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি গোটা অর্থনীতির ওপর তা বড় প্রভাব ফেলে। অতীতেও বন্যায় ফসলহানি হয়েছে, তবে গতবারের বন্যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। হাওরবাসীর একমাত্র ফসল যার ওপর তাদের সারা বছরের জীবনযাত্রা নির্ভর করে, তার হানিতে গোটা জীবন সংকটে পড়ে। এমন এক অবস্থায় কাউকে কাউকে দেশ ত্যাগ করতেও দেখা যায়। অসীম সাহস ও প্রচণ্ড ধৈর্য নিয়ে হাওরবাসী আবার আশায় বুক বাঁধে। এখন হাওরের মানুষগুলোর ব্যস্ত সময় কাটছে ধান রোপণের কাজে। সামনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করে আছে তা আমরা জানি না। সঠিক ও সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে গত বছরের মতো খারাপ পরিস্থিতি আমাদের হয়তো দেখতে হবে না।

হাওরবাসীর ফসল উৎপাদন ও ফসলহানির সঙ্গে কতগুলো বিষয় সরাসরি জড়িত। তাদের বক্তব্য তারা বৃষ্টি চায় কিন্তু বন্যা চায় না এবং এমনটি স্বাভাবিক। বন্যার সম্ভাবনা কম থাকে যদি বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যায়। এমনকি উজান থেকে পানির ঢল নেমে এলেও বড় সমস্যা হয় না। আবার বৃষ্টি ও বন্যার পানি আটকে রাখারও ব্যবস্থা রয়েছে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা যায় এবং প্রয়োজনে বাঁধ কেটে পানি বের করা যায়। এই যে পানি আটকে রাখা এবং বের করে দেওয়া, এখানেই আমাদের দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতি জড়িত। বৃষ্টি ও উজানের ঢলের ওপর আমাদের হাত নেই। আগাম হতে পারে, হতে পারে বিলম্বিতও। কিন্তু আমাদের কাজ হলো একে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের প্রস্তুতির অভাবের কারণে ফসলহানি হয় এবং যাবতীয় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সরকারি নিয়ম মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা। মূলত কোনো কারণে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল নেমে এলে তা থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য এমন পূর্ব প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। এর বাইরে কৃষকদের পক্ষ থেকে আরো একটি বিষয় বিবেচ্য, তা হলো একরপ্রতি বেশি ফসল উৎপন্ন হয় এমন প্রজাতি বেছে নেওয়া। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন প্রজাতির ধানের বীজ রয়েছে, যার ওপর ফলন কম-বেশি নির্ভর করে। কোনো কোনো প্রজাতিতে কম সময়ে ফসল হয় কিন্তু উৎপাদন কম হয়। ফলে কৃষকরা এমন প্রজাতি সহজে গ্রহণ করে না। উৎপাদন বেশি হলে কৃষক ও আমাদের উভয়েরই লাভ। কম সময়ে উৎপন্ন প্রজাতি পছন্দ করলে ঝুঁকির পরিমাণ অনেক কম থাকে। কেননা এখানে বন্যা ও বৃষ্টির আগে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। বৃষ্টিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না কিন্তু বন্যাকে মোকাবেলা করা আমাদের অসম্ভব নয়। আমরা সবাই জানি হাওর অঞ্চলে রয়েছে অনেক নদী। খননের অভাবে নদীগুলো এমন অবস্থায় রয়েছে, যখন বৃষ্টি কিংবা বন্যা হয় তখন নদী সহজে ফুলে ওঠে। পানি সহজে নেমে যেতে পারে না। হাওরে বন্যার এটি অন্যতম কারণ। নদীগুলো খনন ও গভীর করা গেলে দ্রুত পানি নেমে যেতে পারে, তখন বন্যার আশঙ্কা কমে যায়।

জীববৈচিত্র্য ও ভৌগোলিক বিবেচনায় অতি বৃষ্টি ও বন্যা হাওরবাসীর জন্য কষ্ট ও কান্নার কারণ। কেননা তাদের রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন এক ফসল। প্রতিবছর বৃষ্টি ও বন্যা মোকাবেলা করার জন্য যে আগাম প্রস্তুতি দরকার তার ঘাটতি সব সময় থেকেই যায়। আমরা পুরো বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেখতে পারছি না বিধায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি না করার জন্য স্থায়ী কোনো সমাধানে আমরা যেতে পারছি না, যে কাজগুলো সময়মতো ও নিয়মমাফিক করা উচিত। গত বছর আমরা লক্ষ করি কৃষকরা কিভাবে পরিশ্রম করে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁধ রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পারেননি। কৃষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। বড় সমাধান হতে পারে নদী খনন এবং পানি দ্রুত নামার ব্যবস্থা করা।

আমরা বৃষ্টি চাই কিন্তু বন্যা চাই না। হাওরবাসীর এমন স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পদক্ষেপের। নির্দিষ্ট সময়ে বাঁধ নির্মাণ করে ফসল রক্ষা করা। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত পদক্ষেপ ফসল রক্ষা করতে পারবে। হাওরে এখন ধান রোপণের ধুম পড়েছে। কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছে ধান রোপণের কাজে। ঠিক একই সময় পার করতে হবে ঠিকাদারদের বাঁধ নির্মাণের কাজে। না হলে গত বছরের মতো এবারও একই পরিণতি হতে পারে। আমরা কোনোভাবেই তা চাই না। আমরা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না ঠিক কিন্তু সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারব। আমরা আর হাওরে কৃষকের কান্না শুনতে চাই না। শুকব নতুন ধানের গন্ধ এবং দেখব তাদের মুখে হাসি। এ থেকে কোনোভাবেই আমরা যেন বঞ্চিত না হই। 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

neazahmed_2002@yahoo.com



মন্তব্য