kalerkantho


মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন

জামিলে বিজিও ও রাচেল ভোগেলস্টেইন

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের জাতিগত নিধনযজ্ঞ যৌন সহিংসতায় পূর্ণ—সম্প্রতি প্রকাশিত খবরগুলো থেকে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। যে ছয় লক্ষাধিক লোক পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের অনেকেই ধর্ষণ বা গণধর্ষণের শিকার। অনেকেই যৌন দাসত্ব করতে বাধ্য হয়েছে।

তাদের সংখ্যা কত? সংঘর্ষে যৌন সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি প্রমীলা প্যাটেনের দেওয়া প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত নভেম্বরে বাংলাদেশ সফরের সময় যেসব নারীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে, তাদের সবাই হয় নৃশংস ধর্ষণের শিকার বা এ ধরনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। মিয়ানমারের সেনাদের যৌন সহিংসতা নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন প্যাটেন।

নিরাপত্তা পরিষদ কাজ করে মূলত আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে। তাহলে এই সংস্থা কেন যৌন সহিংসতা নিয়ে কাজ করবে? কেন করবে, তার পাঁচটি কারণ এখানে উল্লেখ করা হলো—

সামরিক বাহিনীর দুর্বলতা

সেনাদের ধর্ষণ সামরিক কমান্ড ও শৃঙ্খলার দুর্বলতার প্রতিই ইঙ্গিত করে, যা মিশনে সেনাবাহিনীর কার্যকারিতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ২০১১ সালে একটি স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর দুর্বল নেতৃত্বের কারণে দেড় শতাধিক বেসামরিক নাগরিক ধর্ষণের শিকার হয়। সরকারি বাহিনী এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হলে সংঘাত শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ওই অঞ্চলে শান্তি স্থাপন কঠিন হয়ে পড়ে।

শরণার্থীর প্রবাহ

যখন সশস্ত্র গ্রুপগুলো যৌন সহিংসতা চালায় তখন শরণার্থীর স্রোত বাড়তে থাকে। অস্থিতিশীলতাও বাড়ে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। গুয়াতেমালা হয়ে ইরাক, সিরিয়ার বিষয়গুলোও এমনই। নানা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্ষণের আশঙ্কা তৈরি হলে পালানোর হার বেড়ে যায়।

রাষ্ট্রের অক্ষমতা

সংঘাত সম্পর্কিত যৌন সহিংসতার অর্থ হচ্ছে সরকার তার নাগরিকদের রক্ষায় ইচ্ছুক নয় অথবা অক্ষম। দক্ষিণ সুদানে যেমনটি ঘটেছে। সেখানে সেনাবাহিনী দায়মুক্তি নিয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আস্থা কমতে থাকে। অস্থিতিশীলতা বাড়ে।

যৌন সহিংসতার আর্থিক মূল্য

যুদ্ধকালীন ধর্ষণ একটি দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে। ধর্ষণের শিকার নারীরা দীর্ঘ মেয়াদে শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়। বিষয়টি ব্যয়সাপেক্ষ। এর কারণে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা কমে যায়, আয় কমে। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ধর্ষণের শিকার নারীরা মাঠে কৃষিকাজে ফিরতে ভয় পেত। এ কারণে দেশটির কৃষি উৎপাদন কমে যায়। 

ঐক্যপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়

যুদ্ধকৌশল হিসেবে জাতিগত সহিংসতায় যৌন নির্যাতনকে ব্যবহার করা হলে পরবর্তী ঐক্য স্থাপন কঠিন হয়ে পড়ে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকার যে প্রতিশ্রুতিই দিক না কেন, কাজটি সহজ হবে না। বিরোধীদের হাতে যেসব নারী ধর্ষিত হয়েছে, সমাজে তাদের কলঙ্কিত হয়ে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েই যায়। আবার ধর্ষণের কারণে জন্ম নেওয়া শিশুরাও নানা বৈষম্যের শিকার হয়। 

ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতায় গভীর ক্ষত তৈরি করে ধর্ষণ; যদিও বিষয়টি অনিবার্য নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বহু সেনাবাহিনী ধর্ষণকে যুদ্ধ নষ্টকারী উপাদান হিসেবে বিবেচনা করত। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে যুদ্ধে ধর্ষণ এড়ানো যায় না বলে গ্রহণযোগ্য একটি মত তৈরি হয়।

এসব কারণে নিরাপত্তা পরিষদকে যৌন সহিংসতার বিষয়ে আরো মনোযোগী হতে হবে।

 

লেখকদ্বয় : যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের নারী ও বৈদেশিক

নীতি বিষয়ক প্রকল্পের সিনিয়র ফেলো ও প্রকল্প পরিচালক

সূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ


মন্তব্য