kalerkantho


সিলেটের পর্যটন শিল্প : অনেক আশায় হতাশাও কম নয়

মো. শফিকুল ইসলাম ভূঞা   

৩ অক্টোবর, ২০১৭ ১৭:৪৮



সিলেটের পর্যটন শিল্প : অনেক আশায় হতাশাও কম নয়

বিছানাকান্দি। ছবি : লেখক

দখিনে যার সাগর ঘেরা পূর্ব কোণ তার পাহাড়ে /এইতো আমার প্রিয় স্বদেশ স্বর্গ যেন আহারে!

কবিতার মতোই সুন্দর আমাদের এই দেশ। এর প্রকৃতিকে সৃষ্টিকর্তা সাজিয়েছেন অপরূপ সাজে।

এ দেশের দর্শনীয় স্থানগুলো তাই সব সময় দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসু প্রকৃতিপ্রেমীদের হাতছানি দিয়ে যায়। কি শীত, কি গ্রীষ্ম-বর্ষা সব ঋতুতে প্রতিটি দিনেই পর্যটন কেন্দ্রগুলো মুখর করে রাখে হাজারো ভ্রমণপিপাসু।

দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিকট এ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান 'দুটি পাতা আর একটি কুড়ি' ও 'পূণ্যভূমি' খ্যাত সিলেট। সিলেটে রয়েছে হযরত শাহজালাল, শাহপরানের মাজার, জাফলং, লালা খাল, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, মাধবপুর লেক, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, চা বাগান, কমলার বাগান, আনারস বাগান, মনিপুরী পাড়া, খাসিয়া পুঞ্জি, টাংগুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর। এ ছাড়া নানান স্থানে রয়েছে পাহাড়ি ছড়া আর ঝরনা।

বৃষ্টিস্নাত জাফলং

দেশের একমাত্র এবং বিশ্বের অন্যতম জলাবনের নাম রাতারগুল। সিলেট শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত রাতারগুল বন। পর্যটকদের নিকট এটা রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট নামেও পরিচিত। ভরা বর্ষায় স্থানীয় হস্তচালিত ডিঙি নৌকায় চড়ে রাতারগুল জলাবনে ঘুরে বেড়ানোর মধুর স্মৃতি ভুলা যাবে না সহজে।

স্থানীয় বহু লোকের জীবন জীবিকার উৎস, প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের আনাগোনায় মুখরিত এই পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াতের সব রাস্তা যান চলাচলের প্রায় অনুপযুক্ত। গাড়ি থেকে নেমে নৌকা ঘাটে পৌঁছানোর কাঁচা রাস্তায় বৃষ্টির দিনে হাঁটা শহুরে মানুষের জন্য খুবই বিপদজনক। কোনো নিয়মনীতি না থাকায় ২০০ টাকার নৌকা ভাড়া পর্যটকদের কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।  

ছয়তলা ভবন সমান উচ্চতার একমাত্র ওয়াচ টাওয়ারটি পর্যটকদের পদভারে বিপদজনকভাবে দুলতে থাকে। এক দিন হয়তো শত মানুষের শেষ চিৎকারে কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে!

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট

সিলেটের আরেক দর্শনীয় স্থানের নাম জাফলং। ভারতের মেঘালয়ের বিশালাকৃতির দুটি পাহাড়ের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা পিয়াইন নদীর স্রোতধারা পড়েছে জিরো পয়েন্ট হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে। কোথাও পায়ের পাতা, কোথাও গোড়ালি আর কোথাও হাঁটু সমান স্বচ্ছ শীতল জলের ধারার নিচে রং বেরঙের গোলাকৃতির পাথর বিছানো। অমন জলে গা ভেজানো কিংবা ডিঙি করে ঘুরে বেড়ানোর সুখানুভূতি অসীম! দুই দেশের সীমানায় কোনো দেয়াল বা কাঁটাতারের বেড়া পর্যন্ত নেই। বিজিবি-বিএসএফ পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছে। একই জলে ভিন্ন ভাষাভাষী দুই দেশের মানুষ যার যার নির্ধারিত স্থানে প্রকৃতির নান্দনিকতায় অবগাহন করছে।

জাফলংয়ে গেলে বাংলাদেশি পর্যটকগণ আক্ষেপের আগুনে পোড়েন। ওপাশে ভারতের অংশ সাজানো গুছানো পরিপাটি। উপরের সমতল হতে নিচ পর্যন্ত নানান জায়গায় সিঁড়ি করে দেয়া হয়েছে আর দুই পাশে বড় বড় পাথর বিছিয়ে আরো আকর্ষণীয় করা হয়েছে স্থানটিকে। চারদিকের সব কিছুতে শৃঙ্খলার বিষয়টিও দূর থেকেই বোঝা যায়।

মাধবপুর লেক

অন্যদিকে বাংলাদেশের  অংশে বাসস্টপ থেকে নেমে জিরো পয়েন্টে আসতে বড় বড় দুটি টিলা বেয়ে, কয়েকটি ছড়া পেরিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। একটু অসাবধান হলে, কিংবা পা হড়কালে নিশ্চিত হাসপাতালে যেতে হবে। নারী ,শিশু কিংবা বয়োবৃদ্ধ হলে তো কথাই নেই। নানান জায়গা দিয়ে হাঁটাপথ তৈরি হয়েছে। যে যার মতো পারছে চলছে। কোথাও কোনো শৃঙ্খলার লেশমাত্র নেই। যেখানে সেখানে, মাঝি, হকারের হাঁকডাক, ডিঙি, ছাপড়া দোকান আর হাজারো মানুষের বিশৃঙ্খলা সৌন্দর্য পিপাসুদের বিরক্তির উদ্রেক করে। নদী পার হলে অদূরেই আছে মায়াবী ঝরনা। অমন সুন্দর ঝরনা আর কটিইবা আছে এই দেশে। অথচ সেখানে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থাই নেই!

প্রশ্ম জাগে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের কাজটা কী আসলে!

সিলেটে বেড়াতে যাওয়া অধিকাংশ পর্যটক শ্রীমঙ্গল যায় মূলত চা বাগান দেখতে। সেখানের কোনো চা বাগানই কোনো দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত নয়। ছবি তুলতে বাগানের কাছে গেলেই নিরাপত্তারক্ষীদের তাড়া খেয়ে ফিরতে হয়!

বহু পথ পেরিয়ে মাধবপুর লেক দেখতে আসা পর্যটকদের হতাশ হয়েই ফিরতে হয়। চা বাগান দেখার জন্য এই স্থানটি হতে পারতো আদর্শ। কিন্তু সরকারি মালিকানাধীন এই বাগানটিই যে মৃতপ্রায়! 

বাগানের টিলায় উঠতে জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। হেরে গেলেই স্থান হাসপাতালের বিছানা! মাধবপুর লেক ঘিরে বান্দরবানের নীলাচলের মতোই সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেত। এসব নিয়ে ভাববার কেউ আছে কী এই দেশে?

শ্যামল বাংলার অপার সৌন্দর্যের আরেক নিদর্শন বিছানাকান্দি। গোয়াইনঘাট থানার শেষ প্রান্তে সিলেট শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে বাংলাদেশ-ভারত সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত বিছানাকান্দি পর্যটন কেন্দ্র। ভারতের বিশালাকার সাতটি পাহাড়ের শেষ প্রান্ত বিস্ময়করভাবে জিরো পয়েন্টের কাছে এক বিন্দুতে মিলেছে! সেখান থেকে স্বচ্ছ শীতল জলের ধারা থরে থরে বিছানো ছোট বড় পাথরের উপর দিয়ে গড়িয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এমন নিসর্গে কিছু সময় কাটানো পর্যটকদের নিকট বহুদিনের আরাধ্য।

সিলেট শহর থেকে বেরুলে হাদারপার নৌকা ঘাট পর্যন্ত রাস্তাকে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত বলা যেতে পারে। বিছানাকান্দি দর্শনে আসা পর্যটকদের কাছে এই রাস্তা পারাপার যেন এক দুঃস্বপ্ন।  

মাধবপুর লেক

হাদারপার নৌকা ঘাটের অবস্থা আরো করুণ। যে ঘাটে দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটকের নিত্য আনাগোনা সেই ঘাটের এমন দীনতা দেশের উন্নয়ন আর অগ্রগতির ভুল বার্তা ছড়াচ্ছে নিয়ত।  

সিলেটের পর্যটন শিল্প অফুরান সম্ভাবনাময়। এখানের সব কয়টি পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াতের রাস্তাঘাট আরো প্রশস্ত এবং সুগম হওয়া উচিত। নির্বিঘ্নে পর্যটন কেন্দ্রে বিচরণ করার ব্যবস্থা করে পর্যটকদের নিরাপত্তা আরো বৃদ্ধি করা গেলে সিলেট হয়ে উঠতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকের স্বর্গরাজ্য। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সিলেটের স্থানীয় প্রশাসনের বোধোদয়ই সিলেটকে এনে দিতে পারে পর্যটন শিল্পে গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, ঢাকা ক্যান্ট গার্লস পাবলিক স্কুল ও কলেজ।


মন্তব্য