kalerkantho


ভ্রমণ : বাকৃবির নিসর্গ বোটানিক্যাল গার্ডেন

আবুল বাশার মিরাজ   

১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ১৮:০৭



ভ্রমণ : বাকৃবির নিসর্গ বোটানিক্যাল গার্ডেন

এই গেট দিয়ে ঢুকলেই কেবল বিস্ময় আর বিস্ময়

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অপার সৌন্দর্য্যকন্যা বোটানিক্যাল গার্ডেনটিকে একনজর দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসে। দেশ বিদেশের বিভিন্ন বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সম্পর্কে অতি সহজে ধারণা পাওয়া যায় এ বাগানে।

যা বিমোহিত করে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের। বোটানিক্যাল গার্ডেন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা বোটানিক গার্ডেন্স কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল (বিজিসিআই) কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রথম বোটানিক্যাল গার্ডেন এটি।  

বিলুপ্ত ও বিলুপ্তপ্রায় গাছেদের মানুষের কাছে তুলে ধরতে ১৯৬৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ এবং তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওসমান গণির হাত ধরে ২৫ একর (প্রায় ৭৫বিঘা) জমি নিয়ে গার্ডেনটি যাত্রা শুরু করে। গার্ডেনটি শুধু যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য এনে দিয়েছে তাই নয়, এর মাধ্যমে পুরো ময়মনসিংহ শহরে পেয়েছে নতুন মাত্রা। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে গড়ে ওঠা এ গার্ডেনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনোদনের পাশাপাশি ভ্রমনপিপাসু ও স্থানীয় বিনোদনপ্রেমীদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ, চিরহরিৎ বনাঞ্চল, ঝাউ-থুজা, ঊষর মরুর বুকে প্রাণ জাগানিয়া রক গার্ডেন, শাপলা-পদ্মফুলের ঝিল, কৃত্রিম দ্বীপ, নারিকেল কর্ণার, বিলুপ্তপ্রায় বাঁশঝাড়সহ বিচিত্র উদ্ভিদরাজির সমাহার এ বোটানিক্যাল গার্ডেন।

দর্শণার্থীদের আনাগোনা

 

গার্ডেনের গাছেরা
সরকারি হিসাব মতে, দেশের মোট চারটি বোটানিক্যাল গার্ডেনের মধ্যে সর্বাধিক উদ্ভিদ প্রজাতি ধারণ করে আছে এই গার্ডেন। জীব বৈচিত্র্যের দিক দিয়েও সবচেয়ে এগিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. এ কে এম জাকির হোসেন জানান, উদ্ভিদরাজি সমন্বয়ে গঠিত গার্ডেনটি ৩০টি জোনে বিভক্ত।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অঞ্চলের বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় কয়েক হাজার উদ্ভিদের বিশাল সংগ্রহশালা এ বোটানিক্যাল গার্ডেন। গার্ডেনে দেশি প্রায় সব প্রজাতির উদ্ভিদের পাশাপাশি বিদেশি অনেক বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। ছোট-বড়-মাঝারি ধরনের অসংখ্য গাছে ভরপুর এ গার্ডেনে রয়েছে প্রায় ১০০০টি বড়, ১২৭৮টি মাঝারি ও ৪৪৬৭টি ছোট গাছসহ প্রায় ৬০০ প্রজাতির উদ্ভিদ।

ঔষধি, ফুল, ফল, ক্যাকটাস, অর্কিড, পাম, সাইকাস, মসলা, টিম্বার, বাঁশ, বেত, বিরল উদ্ভিদ ও বনজ উদ্ভিদ জোনসহ জলজ উদ্ভিদ (হাইড্রোফাইটিক) সংরক্ষণের জন্য ওয়াটার গার্ডেন এবং মরুভূমি ও পাথুরে অঞ্চলের উদ্ভিদ সংরক্ষণের জন্য রক গার্ডেন গড়ে তোলা হয়েছে। বাগান পরিচালনা করার জন্য বাগানের ভেতর রয়েছে দুইতলা অফিস কক্ষ। অফিস কক্ষ সংলগ্ন নিসর্গ ভবনের ভেতরে রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় অসংখ্য প্রজাতির ক্যাকটাস। এর অপরুপ সৌন্দর্যই যেন এর নিসর্গ নামের সার্থকতা বহন করছে। আর বাগানের সর্ব দক্ষিণের রয়েছে মনোরোম অর্কিড হাউজ।
 
পাম সাইকাস গার্ডেন
গার্ডেনের ঠিক মাঝখানে গড়ে তোলা হয়েছে পাম সাইকাস গার্ডেন জোন। দর্শনাথীরা সারা পৃথিবীতে জন্মে থাকা ৩৩ ধরনের পাম এখানে একসাথে দেখতে পারবেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুগার পাম, তাল, ফিশটেইল পাম, বনসুপারী, ক্যামোডোরা পাম, তালি তাম, অয়েল পাম, চায় পাম, বোতল পাম, সালাক পাম, ওয়াশিংটন পাম, জামিয়া পাম প্রভৃতি।

সুন্দরবন জোন
অনেকের ধারণা কেবলমাত্র সুন্দরবনেই ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ জন্মে থাকে। ধারনাটিকে মিথ্যা প্রমাণ করে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অনুরূপ জলবেষ্টিত একটি সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রমধর্মী সুন্দরবন জোন। যা বাংলাদেশে প্রথম ও একমাত্র। শ্বাসমূল (নিউমেটাফোর) ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ সমূহের অন্যতম বৈশিষ্ট যা এ গার্ডেনে সংরক্ষিত। সুন্দরবনের সুন্দরী গাছও এখানে দেখতে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও এ জোনে আরও রয়েছে গরান, গেওয়া, কেওড়া, পশুর, বাইন, হোগলা ও ফার্ণ জাতীয় নানা প্রজাতির উদ্ভিদ।

বসার জন্যে আছে ছাউনি

 

অনান্য উদ্ভিদ 
গার্ডেনের এক একটি জোনে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের উদ্ভিদ। যার কারণে খুব সহজেই উদ্ভিদ জগৎ  সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। গার্ডেনের ঔষধি গাছের মধ্যে রয়েছে অশ্বগন্ধা, সর্পগন্ধা, গন্ধভাদুলী, পুনর্নভা, কুর্চি, বচ, উলটচন্ডাল, অন্তমূল, অঞ্জন প্রভৃতি। বিভিন্ন ধরনের ফুলের মধ্যে রয়েছে কমব্রিটাম, রনডেলেসিয়া, পালাম, ক্যামেলিয়া, আফ্রিকান টিউলিপ, ট্যাবেবুঁইয়া, রাইবেলি, জেসিয়া, ডায়ান্থাস, সিলভিয়া, হৈমন্তি প্রভৃতি। ফলের মধ্যে রয়েছে স্টার আপেল, আমেরিকান পেয়ারা, থাই মালটা, আঙ্গুর, প্যাসান ফলসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল। এ ছাড়াও বাঁশবাগানে রয়েছে ১৬ প্রজাতির বাঁশ। মসলা জোনে রয়েছে একশ এর অধিক মসলা জাতীয় উদ্ভিদ।   

নাগলিঙ্গম
বাগানের ভিতর ঢুকতেই অদূরে চোখে পড়বে এটি। নাগলিঙ্গম একটি অপরিচিত বৃক্ষ। এখানে যারা আসেন তারা অবাক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে গাছের গোড়া ফুঁড়ে বের হওয়া লম্বা লতার মতো শাখায় ছোট ছোট হাজারো কুঁড়ি। কুঁড়ি থেকে টকটকে লাল পলাশ কিংবা শিমুলের মতো ফুল মুখ বের করে আকাশের পানে।

নাগলিঙ্গম ফুলের পাপড়ি, রেণু, ফুলের গঠন আরো মোহনীয়। পাপড়ির মাথায় অসংখ্য ছোট ছোট সাপের মতো ফণা তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুজ্জামান জানান নাগলিঙ্গমের বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis।   নাগলিঙ্গম আমাদের দেশে বিরল প্রকৃতির গাছ। এর আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার গভীর বনাঞ্চলে। নাগলিঙ্গম গাছ সাধারণত ১০  থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর গোড়ায় বেলের মতো শত শত ফল হয়। একই সঙ্গে ফুল, ফল ও গাছের পাতা আলাদা বৈশিষ্টের। নাগলিঙ্গম গাছ সাধারণত অন্যান্য কাঠবৃক্ষের মতো হলেও অন্যান্য জাতের গাছের মতো এর শাখায় নয়, বরং ফুল ফাটে গুঁড়িতে। এই ফুল সচরাচর দেখা যায় না। নয়নকাড়া ফুল আর বিচিত্র গোলাকার ফলের মনকাড়া সৌন্দর্য বিমোহিত করে সবার।

ফুল ফুটলে সৌন্দর্যে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়

 

বিলুপ্তপ্রায় ও বিরল উদ্ভিদের সংগ্রহশালা
গার্ডেনটিতে কনজারভেটিভ উপায়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে বেশ কিছু বিলুপ্ত উদ্ভিদ। এসব উদ্ভিদের মধ্যে এমন কিছু উদ্ভিদ আছে কেবলমাত্র এই গার্ডেনেই দেখতে পাওয়া যায়। বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে রাজ-অশোক, ডেফল, কালাবাউস, ক্যারিলিম্ফ, ফলসা, মনহোটা, মাক্কি, পেয়ালা, মাক্কি,  বনভুবি, লোহাকাট, উদাল, পানবিলাস, টেকোমা, বয়রা, হরতকি, কাটাসিংড়া, ম্যালারিউকা, প্যাপিরাস, রাইবেলি, রুপিলিয়া, স্ট্যাভিয়া, হিং,  পেল্টোফোরামসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ।

পট হাউজ
এখানে রয়েছে এদেশের বহু মূল্যবান উদ্ভিদ প্রজাতি। বিশেষ করে বিরল প্রজাতির হার্ব জাতীয় ঔষধি ও সুগন্ধি জাতীয় উদ্ভিদ সংরক্ষণের জন্য পট হাউজ নামে বিশেষ সংরক্ষণাগার। এখানকার ঔষধি জোনে রয়েছে ৫০ এর অধিক প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এগুলো। এদের মধ্যে আপাং, পেটারি, বাসক, উচান্টি, ঈশ্বরমূল, রইনা, দাঁদমর্দন, হুরহুরিয়া, মূতা, কালাহুজা, অতশি, স্বর্ণলতা, চাপড়া, হরিনা, আসামলতা, জির, উলটচন্ডাল, ফলসা, তোকমা, জ্যাট্রোফা, লাল রিয়া, মহুয়া, নাগকেশর, জয়ত্রি, কালিজিরা, রক্তচিতা, সর্পগন্ধা, দুধকরচ, ইন্দ্রযব প্রভৃতি। পট হাউজসহ গার্ডেনের সকল ঔষধি গাছ নিয়ে গার্ডেনের একটি প্রকাশনা বই রয়েছে। বইয়ে কোন ঔষধি গাছ কোন অংশ কি কাজে ব্যবহৃত হয় তার বর্ণনা ও ছবি রয়েছে।   

ওয়াটার গার্ডেনের একাংশ

 

বিনোদন স্পট 
গার্ডেনের সৌন্দর্য বর্ধন এবং দর্শনার্থীদের অধিক বিনোদনের জন্য বন্য পশু-পাখির প্রতিকৃতি নির্মাণ করে বিভিন্ন দর্শনীয় পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে দ্বীপ জোনে রয়েছে দুটি রাজহাঁস ও দুটি সারস (সাদা বড় বক), গেটের সম্মুখে সিংহ, অরকোরিয়া গাছের গোড়ায় হরিণ, বাগানের ভেতরের প্রবেশদ্বারের সামনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও ছানাসহ বিড়াল এবং দর্শনার্থীদের শুভ কামনায় শাবকসহ প্রার্থনারত ক্যাঙ্গারু। গার্ডেনের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সৌন্দর্য উপভোগের ক্ষেত্রে দর্শনার্থীদের বিশ্রাম ও আলাপচারিতা সেরে নেওয়ার জন্য রয়েছে ৪০টির অধিক বিশ্রাম বেঞ্চ। প্রতিটি বেঞ্চে আরাম করে প্রায় ৩ থেকে ৪ জন বসা যায়। বেশির ভাগ বেঞ্চই ব্রহ্মপুত্র নদীর কূল ঘেঁষা। ফলে দর্শনার্থীরা এখান থেকে বসেই ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে ভেসে চলা পালতোলা অথবা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় আরোহী হাজারো শ্রমজীবী মানুষ এবং নদের দুপাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সহজে উপভোগ করতে পারেন।  

ক্যাকটাস-সাকুলেন্ট হাউজ নিসর্গ
গার্ডেনের অসংখ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এটি। এর সৌন্দর্য অবাক করে দেয় দর্শনার্থীদের। বাগানের পূর্ব দিকের সীমানা ঘেঁষে ২০১০ সালে নির্মিত হয় একটি ক্যাকটাস হাউজ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহিত বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ৬০ এর অধিক প্রজাতির ক্যাকটাস নিয়ে সাজানো হয় এই হাউজটি।  

যেভাবে যাবেন  
ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ১৫-২০ মিনিট পরপর ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে বাস ছাড়ে। এনা, শ্যামলী বাংলা, আলম এশিয়া, সৌখিন, সোনার বাংলা প্রভৃতি বাসে চড়ে আসতে পারেন। সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। এনা গাড়িতে আসলে ভাড়া নেবে ২২০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য ইত্যাদি গাড়িতে ভাড়া প্রায় ১২০-১৫০ টাকা। এছাড়া আপনি ট্রেনে চড়েও আসতে পারেন। বাসে আসলে ময়মনসিংহ এসে মাসকান্দা বা ব্রিজ মোড় নামিয়ে দিবে। মাসকান্দা হতে ক্যাম্পাসে আসতে অটোতে সবোর্চ্চ ভাড়া ২০ টাকা এবং ব্রিজ মোড় থেকে অটোতে ১০ টাকা লাগবে।  


মন্তব্য