kalerkantho


ইনডোর চিড়িয়াখানা : যেখানে বন্ধু বনে যায় সাপ কিংবা গিরগিটি!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২২ নভেম্বর, ২০১৭ ১৩:১৮



ইনডোর চিড়িয়াখানা : যেখানে বন্ধু বনে যায় সাপ কিংবা গিরগিটি!

এই অদ্ভুত প্রাণীটিকে দেখা বা ধরার সুযোগ সেখানেই মেলে, বাচ্চারাও ওদের বন্ধু হয়ে যায়!

জানার আছে অনেক কিছু আর অভিজ্ঞতার তো শেষ নেই। শীতকালীন দেশে যেখানে বরফের স্তূপে বাইরের সব আয়োজন বন্ধ থাকে, সেখানে আনন্দ ও শিক্ষার জন্য অভ্যন্তরীণ অনেক আয়োজন থাকে।

তেমনই এক আয়োজন অভ্যন্তরীণ চিড়িয়াখানা, ঘরের ভেতরে চিড়িয়াখানাও বলতে পারেন! জীবনে একেবারে ভিন্ন কিছু অভিজ্ঞতা দিতে আপনার অপেক্ষায় রয়েছে 'লিটল রেইস রেপটাইল জু অ্যান্ড নেচার সেন্টার'।

চিড়িয়াখানা শব্দটি শুনলেই মনে হয় খোলামেলা পরিবেশ যেখানে বাঘ, সিংহ, হাতি, বানর ঘুরে বেড়াবে। আর আপনি দূর থেকে দেখবেন ওদের মজার কিংবা হিংস্র যত কর্মকাণ্ড। কিন্তু এই চিড়িয়াখানার বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। নিজের মতো করে নিজের অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি। কানাডার ওটোয়ার হ্যামিল্টনে রয়েছে এই চিড়িয়াখানাটি। আমাদের বাসা থেকে গাড়ি করে যেতে লাগে মাত্র তিন মিনিট। একেবারে ছিমছাম পরিবেশ। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই ভেতরে আপনার জন্য কী অপেক্ষা করছে! দরজা গলে ভেতরে যেতেই দেখা যায় নানা রকমের প্রাণীর ছবিতে দেয়াল পরিপূর্ণ।

প্রাণীদের ছবির জাদুঘর মনে করে হতাশ হবেন না। নাকে যে গন্ধ আসবে তাতেই বুঝতে পারবেন এইখানে জীবন্ত পশু-পাখি আছে। কিন্তু মজার বিষয় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একটু এগোতেই একজন সহযোগী আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে আর দিকনির্দেশনা দেবে কোন দিকে যেতে হবে আর কীভাবে যেতে হবে। তার নির্দেশনা জেনে-বুঝে শুরু করলাম ঘরের মধ্যে এক রোমাঞ্চকর অভিযান।  

কেবল দেখা বা স্পর্শের অভিজ্ঞতাই নয়, সবাই জানতেও আসেন

মজার মজার সব তথ্য দিয়ে ঘিরে রাখা এক একটি ছোট্ট ঘরে আছে বিচিত্র সব প্রাণী। একই প্রাণী কত প্রজাতির হতে পারে এইখানে না গেলে হয়তো দেখাই হতো না। আমার ছেলেটা ভীষণ উচ্ছ্বসিত। আবার একইসাথে একটু একটু ভয়ও পাচ্ছে। কিন্তু ওর উচ্ছ্বাসের মাঝে ভয়টা চাপা পড়ে গেছে। এখানে আরো অনেকে তাদের বাচ্চাদের নিয়ে আসেন। মূলত প্রকৃতির সঙ্গে আধুনিক জীবনের যে বিস্তর ফারাক তা ঘুঁচিয়ে দেবে এই আয়োজন। বাচ্চারা যে প্রাণীগুলোকে ভয়ংকর জেনে বড় হচ্ছে, এখানে পা ফেললে সেই প্রাণীগুলোর প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বাড়ি ফিরবে। একেবারে কাছ থেকে বিচিত্র সব প্রাণী দেখতে ও এদের সম্পর্কে জানতে পারছে মানুষ।

ঘুরে ঘুরে অনেক রকমের ব্যাঙ, সাপ, গিরগিটি, কুমির, বানর, ক্যাঙ্গারু, পাখি, খরগোশ এবং আরো অনেক অনেক প্রাণী দেখা হলো। মনে হলো সব কিছু দেখা বুঝি শেষ। কিন্তু না, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা! যারা দেখতে এসেছেন তাদের সবাইকে একটি ঘরে যেতে বলা হলো। আমরা সবাই গেলাম, ওখানে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। সবার উদ্দেশে কিছু বলবেন। তারপর শুরু করলেন কোন প্রাণী কোথায় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, কিভাবে সংরক্ষণ করা হয়, কেমন এদের আচরণ, কার কী খাবার, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছুটা বিরক্তির মাঝে যখন অজগর কিভাবে একটি ছাগল খেয়ে ফেলার গল্প শুনলাম, তখন চমকে উঠলাম। এরপর জীবনের অন্যরকম এক অভিজ্ঞতার পালা! 

প্রথমে চোখে মুখে আতঙ্ক থাকলেও ওর মতো বাচ্চারা প্রাণীগুলোকে সহজেই ভালোবাসতে শুরু করে

তিনি একটি একটি করে প্রাণী ধরে নিয়ে আসলেন সবার মাঝে। ওদের সম্পর্কে আরো বিস্তারিত বলতে লাগলেন। আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকলাম। সবাই প্রাণীগুলোকে ধরেও দেখছিল। যেকোনো মানুষের জন্যে এটা এক নতুন অভিজ্ঞতা। এত কাছ থেকে এত বড় বড় সরীসৃপ দেখার আর ধরার অভিজ্ঞতা ক'জনের হয়! যতই দেখছি আর স্পর্শ করছি তখন মনে হচ্ছিল সৃষ্টির কত রূপ আর ভিন্নতা, সত্যিই অবাক হবার মতো। যাই হোক, অভিযান শেষ হবার পালা। কিন্তু না, আসল অভিজ্ঞতা যে আরো বাকি বুঝতেই পারিনি। পৃথিবীর সব প্রাণীর মধ্যে সাপ আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর। এটা অনেকের কাছেই অবশ্য দুঃস্বপ্নের মতো। ওই ভদ্রলোক ১০ ফুট লম্বা একটি অজগর সাপ যখন নিয়ে আসলেন, আমার মতো অনেকেই ঘর থেকে দৌড়ে পালালেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো আমার ছেলে আর বউ তখনো ওখানে। ছেলের ওখানে আরেক বাচ্চার সাথে বন্ধুত্ব। দুজনই দূর থেকে সাপ দেখছে। আমি ভাবলাম এত মানুষ এত কাছ থেকে দেখছে আমিও সাহস করে একবার যাই, আবার সেই ঘরে ঢুকলাম, একটু একটু করে কাছে গেলাম, সাপ স্পর্শ করলাম! এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা, ভয় আর জানার এক অতুলনীয় মিশেল।  

সবকিছু শেষ করে যখন বের হচ্ছিলাম তখন মনে হচ্ছিল টিকেট এর দাম খুব বেশি হয়নি। এই ধরনের আয়োজন আসলে ছোট বাচ্চাদের বিভিন্ন প্রাণী সম্পর্কে জানবার জন্য। যারা কানাডাতে আছেন তারা তো বটেই, ভ্রমণের নেশা যাদের রক্তে মিশে রয়েছে তারাও সুযোগ পেলে অবশ্যই এই অভ্যন্তরীণ চিড়িয়াখানায় এসে জীবনের এক ভিন্ন স্বাদ নিতে পারেন। এ স্বল্প পরিসরের আয়োজনটা আসলে মানুষকে পরিবেশ ও প্রাণীদের সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করছে। সেই সঙ্গে ভিন্ন অভিজ্ঞতার গল্পটা তো আছেই।  

লেখক : মাইনুল বাশার, কানাডা


মন্তব্য