kalerkantho


ভ্যাবলার ভূতমন্ত্র

আবেদীন জনী

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভ্যাবলার ভূতমন্ত্র

অঙ্কন : মানব

ভ্যাবলাকে নিয়ে বড্ড মুশকিলে আছে ওর মা-বাবা। কী সুন্দর চেহারা! এক্কেবারে রাজপুত্তুরের মতো। কিন্তু কথায়-কাজে ঠনঠনে। যেমন আলসে, তেমনি মনভোলা। বোকারাম। এমন ভ্যাবলা-বোকা এ জগতে দ্বিতীয়টি নেই। যাকে বলে জগদ্বোকা। এ কারণেই ওকে সবাই ভ্যাবলা বলে ডাকে।

ভূতদের কিছু মন্ত্র জানতে হয়। এগুলোকে বলা হয় ভূতমন্ত্র। এসব মন্ত্রের গুণেই ভূতেরা রূপ পরিবর্তন করে। যখন যা হতে ইচ্ছা করে, তা-ই হয়ে যায়। যদি ছাগল হতে ইচ্ছা করে, তাহলে ছাগলমন্ত্র পড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই ছাগল হয়ে যায়। যদি ঘোড়া হতে চায়, ঘোড়ামন্ত্র পড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই ঘোড়া। মন্ত্রগুলো না জানলেও বিপদ, জানলেও বিপদ আছে, যদি পড়তে ভুল হয়। তার মানে, ভূতমন্ত্রগুলো নির্ভুলভাবে শিখতে ও পড়তে হবে। তবেই সাফল্য, তবেই পরিপূর্ণ ভূত। যারা মন্ত্র জানে না, তাদের বলা হয় মূর্খ ভূত। তেমনই একটা মূর্খ ভূত হলো ভ্যাবলা। ভূতের ইশকুলে যারা পড়েছে, তারা সবাই খুব তাড়াতাড়ি মন্ত্র শিখেছে। ভ্যাবলা তো ইশকুলে যায় না, মন্ত্রও পারে না। এর কাছে ওর কাছে শুনে শুনে যা একটু মন্ত্র শিখেছে, তাও পড়তে ভুল করে। তাই ভ্যাবলা যেখানেই যায়, যে কাজই করে, সেখানেই বিপদে পড়ে।

একদিন বিকেলবেলা। ভ্যাবলা দেখল, খোকা-খুকিরা মাঠে গোল্লাছুট খেলছে। ওর ভীষণ খেলতে ইচ্ছা করল। খেলতে হলে খোকা বা খুকি হয়ে ওদের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। ও মানুষ হওয়ার মন্ত্র পড়তে গিয়ে অর্ধেক পড়ল মানুষমন্ত্র, ভুলে গিয়ে বাকিটুকু পড়ল ছাগলমন্ত্র। ব্যস, একপলকে হয়ে গেল অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক ছাগল। খোকা-খুকিরা এই উদ্ভট জন্তু দেখে ভূত ভূত করে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে বাড়ি চলে গেল। ভ্যাবলার গোল্লাছুট খেলার ইচ্ছাটাই মাটি হয়ে গেল।

এখন আবার ভূত হয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু ভূতমন্ত্র মনে পড়ছে না ওর। কী মুশকিল! পাশেই ঘোড়া হয়ে ঘাস খাচ্ছিল ভ্যাবলার বাবা। ছেলের কাণ্ড দেখে তাড়াতাড়ি এসে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিয়ে ভূত বানিয়ে দিল।

আবার একদিন এক বাড়ির পাশে পেয়ারাগাছে উঠে পেয়ারা খাচ্ছিল ভ্যাবলা। এমন সময় জানালা দিয়ে দেখল, পিচ্চি একটা খুকি টিভিতে কার্টুন দেখছে। ওরও দেখতে ইচ্ছা হলো। কিন্তু পেয়ারাগাছের ডাল থেকে গলা বাড়িয়েও ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। দেখতে হলে ঘরে ঢুকতে হবে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখল, দরজাটার বাইরে তালা। নিশ্চয়ই খুকির মা-বাবা ওকে রেখে অফিসে বা অন্য কোনো কাজে গেছে। এখনকার মা-বাবারা এমন হয় কেন? ভাবল ভ্যাবলা। আবার বিড়বিড় করে বলল, এত্ত সব ভাইব্যা লাভ নাইক্কা।

আবার সে পেয়ারাগাছে উঠল। পেয়ারা খেতে খেতে বুদ্ধি করল, প্রজাপতি হয়ে জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকবে। তারপর খুকির চুলের ওপর বসে কার্টুন দেখবে। আহ্, দারুণ মজা হবে! প্রজাপতি হওয়ার মন্ত্র তো জানাই আছে। চক্ষের সামনে ভাসতাছে এক্কেবারে ঝকমকা মন্ত্রটা। পেয়ারাগাছের মগডালে বসে প্রজাপতিমন্ত্র পড়তে গিয়ে ভুল করে পড়ল ঘোড়ামন্ত্র। এক নিমেষেই হয়ে  গেল ঘোড়া। ঘোড়ার তো হাত নেই যে গাছের ডাল ধরবে। মগডাল থেকে ধপাস করে শক্ত মাটির ওপর পড়ে এক্কেবারে চ্যাপটা। ব্যথার চোটে গোঙাতে লাগল। গোঙানি শুনে ওর মা-বাবা এসে সোজা নিয়ে গেল হাড়ভাঙা হাসপাতালে।

দীর্ঘ ৪১ দিন চিকিৎসা শেষে ভ্যাবলা সুস্থ হয়ে উঠল। ওর মা-বাবা বলল, আজ থেকে কোথাও যেতে পারবি না। যে পর্যন্ত ভূতমন্ত্র ঠিকমতো না বলতে পারবি, সে পর্যন্ত তোকে ঘরেই বন্দি করে রাখব।

বন্দি থাকতে থাকতে মনটা ছটফট করতে লাগল ভ্যাবলার। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে পারছে না। খেলাধুলা করতে পারছে না। এদিকে মন্ত্রও মুখস্থ হচ্ছে না। একবার শিখে, আবার একটু পরেই ভুলে যায়। কিংবা গরু-ঘোড়া-বাঘ-হরিণ ও পাখি হওয়ার মন্ত্র একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। ভ্যাবলা যে কী ভ্যাবাচেকা অবস্থায় পড়েছে, তা বলার মতো নয়। উপায় না দেখে একদিন মা-বাবাকে ডেকে বলল, এভাবে বন্দি থাকলে আমি অসুস্থ হয়ে মারা যাব। মারা যাওয়ার আগে একটা শখ পূরণ করবে আমার? খুব ইচ্ছা করছে চিড়িয়াখানা দেখতে। নিয়ে যাবে?

ভ্যাবলার মা-বাবা প্রথমে রাজি ছিল না। অনেক ভেবেচিন্তে অবশেষে রাজি হলো। কারণ চিড়িয়াখানা দেখলে ওর মনমানসিকতা পরিবর্তনও হতে পারে। কেটে যেতে পারে বোকাসোকা ভাবটা। মনের মধ্যে লেখাপড়ার ইচ্ছাটাও জেগে উঠতে পারে। তা ছাড়া নিজেদের ছেলেই তো। কত দিন আর বন্দি করে রাখা যায়। সময়-সুযোগ বুঝে একদিন ভ্যাবলাকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া হলো। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে প্রায় সব জীবজন্তু দেখা শেষ। বাকি শুধু বাঘ। মানে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ভ্যাবলা বলল, আমি বাঘ হয়ে বাঘের সঙ্গে একটু খেলাধুলা করতে চাই। বাবা বললেন, বাঘ হওয়ার মন্ত্র পারিস তো? ভ্যাবলা হিঃ হিঃ হিঃ হেসে বলল, হ্যাঁ, পারি। ওটা তো একদম সোজা। মা বললেন, না না, অতসব দরকার নেই। বাঘ হতে গিয়ে আবার কোন বিপদে পড়িস! ভ্যাবলা মাকে বলল, তুমি কোনো চিন্তাই করো না মা। দেখো, বাঘ হয়ে বাঘের সঙ্গে কেমন ডিগবাজি খেলি।

ভ্যাবলা ভূতবেশে বাঘের কাছে গেল। কিন্তু বাঘ হওয়ার জন্য বাঘমন্ত্র পাঠ করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলল। ভুলে পাঠ করল হরিণমন্ত্র। চোখের পলকে হয়ে গেল হরিণ। হরিণ হয়ে ভয়ে কাঁপতে লাগল থরথরিয়ে। আবার ভূত হওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ভূত হওয়ার মন্ত্রটা মনে করতে পারল না। মুখের কাছে তরতাজা নাদুসনুদুস একটা হরিণ পেয়ে বাঘ তো খুশিতে আটখানা। লাফ মেরে ধরতে গেল হরিণটা। এমন সময় ভ্যাবলার মনে পড়ে গেল পাখিমন্ত্র। পাখি হয়ে ফুড়ুৎ করে উড়াল দিল। বসল গিয়ে গাছের ডালে। পা দুলিয়ে, পাখা নাচিয়ে মিষ্টি সুরে কিচিরমিচির গান গাইতে লাগল আনন্দে।

ঘটনা দেখে ভ্যাবলার মা-বাবা খুব খুশি। মনে মনে বলল, আমাদের ভ্যাবলা এখন আর বোকা না। ভূতমন্ত্র পাঠ করা শিখে ফেলেছে।


মন্তব্য