kalerkantho


অপার্থিব ভালোবাসা | নাজমুল হোসাইন আকাশ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৮:৫৮



অপার্থিব ভালোবাসা | নাজমুল হোসাইন আকাশ

সময়টা শীতের প্রায় শেষের দিকে। আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের জোয়ার ভয়ংকর জ্বর বাধিয়ে আমাকে বিছানা গত করে রেখেছে টানা তিনদিন। সারাদিন কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকি, কমলালেবু খাই। মাঝেমাঝে পাশের বাসার পিচ্চি শন্তুটা এসে কাঁথা ধরে টানাটানি করে। আমার কোনো নড়াচড়া করতে ইচ্ছে করেনা। শন্তু তখন আমার পাশে এসে শুয়ে পড়ে। আমি মিটমিট চোখে ওর দিকে তাকাই। ও আমার মুখে হাত বুলাতে বুলাতে বলে 'আকাত ভাইয়া, আর একতা কমলালেবু খাবা?' 

আমি পলিব্যাগ থেকে একটা কমলা বের করে শন্তুর পকেটে রেখে দেই। তারপর ওর ছোট ছোট হাতদুটো আমার ফ্যাকাসে মুখের ওপর চেপে ধরে আবার চোখ বুজি। শন্তুর বয়স এবার আশ্বিনে ৬ বছর হলো। এখান থেকে চারবছর আগে একটা বাস অ্যাক্সিডেন্টে শন্তুর মা মারা যায় আর ওর বাবা চিরদিনের জন্য দুইটা পা হারিয়ে ফেলে। এর প্রায় এক সপ্তাহ পরে এক সন্ধ্যেবেলা আমার রমিজ আঙ্কেল আর তার স্ত্রী আছিয়া খালা এই মায়াবী বাচ্চাটাকে যখন দত্তক নিয়ে বাড়ি ফেরে তখন আমি চেয়ার নিয়ে জানালার সামনে বসে ছিলাম।

রমিজ আঙ্কেল আমার বাবাকে ডেকে বলে, 'আফজাল ভাই, আর আমাদের কোনো দুঃখ নাই। আল্লাহ আমাদের একটা পুলা দিছে। আপনি আমার পুলাডার মাথায় হাত রেখে একটু দোয়া করে দেন ভাই।'

আমি সেই সন্ধ্যার আলোয় রমিজ আঙ্কেলের চোখেমুখে এই ছেলেটার জন্য একটা অপার্থিক ভালবাসা দেখেছিলাম। জানালা দিয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকাতেই মনে হয়েছিল এই ভালোবাসার কোনো শেষ নেই, কোনো সীমানা নেই। শন্তুর বাবা এখন স্টেশনের ধারে হুইলচেয়ারে বসে ভিক্ষা করে। মাঝে সাঝে হাওয়াই মিঠায় নিয়ে শন্তুরে দেখতে আসে। শন্তুর গায়ে-মাথায় হাত বুলায়, চুমু খায়। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলে, 'বেঁচে থাকো বাজান, অনেক বড় হও বাজান।'

শন্তু তখন ছলছল চোখ নিয়ে ওর বাবার দাড়িতে হাত বুলায়, ছেড়া জামাতে হাত বুলায়। অসহায়ের মতো একবার আমার দিকে আর একবার রমিজ আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে বলে ' আব্বু, এই কাকুকে একটা নতুন জামা কিনে দিবা?' আমার দুচোখে তখন জল ভরে ওঠে। এটা ভেবে খুব খারাপ লাগে যে, এই ছোট্ট বাচ্চাটা হয়তো কখনো তার আসল বাবাকে 'আব্বু' বলে ডাকতে পারবেনা। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি শুধু এই কামনা করি, রমিজ আঙ্কেল আর আছিয়া খালা যে স্নেহমাখা ভালোবাসায় এই ছেলেটাকে আগলে রেখেছে তা যেন এর জীবনের আকাশ থেকে সবটুকু দুঃখময় অন্ধকার দুর করে আলোয় আলোকিত করে রাখে।

দুপুরের একটু পরেই আমার বড় বোন নিতু জাহান আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। ভেজা কাপড় দিয়ে হাতমুখ মুছে দিয়ে কপালে জলপট্টি দেয়। আমি তখন আমার মাথার কাছে শন্তুকে খুঁজতে থাকি। আপু চামচ দিয়ে আমাকে সুজি খাওয়াতে খাওয়াতে বলে 'রমিজ আঙ্কেল আর শন্তু দুই বাপ-বেটা মিলে মেলায় গেছে। নে হা কর। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে এখনো।'

শন্তুর ওপর আমার এত মায়া হওয়ার একটা কারণ আছে অবশ্য। কারণটা হলো ওর মতো আমারও মা নেই। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম। উত্তরী হাওয়া বদলের এক সন্ধ্যাবেলা মা আমাকে পড়াতে পড়াতে হটাৎ হাত-পা টানটান করে বারান্দায় বিছানো মাদুরের ওপর শুয়ে পড়ে। আমি তখন অঙ্ক কষছিলাম। মায়ের অবস্থা দেখে আমি যখন জোরে জোরে কাঁদতে থাকি তখন বাড়ির সকলে এসে মাকে উঠিয়ে বসায়, মুখে পানির ছিটা দেয়। কিন্তু মা আর চোখ খোলেনি, তারপরে মা আর কোনোদিন চোখ খোলেনি। মা

মারা যাওয়ার পর টানা দুসপ্তাহ আমি হাসপাতালে ছিলাম। সেসময় কখনো আমার জ্ঞান থাকত, কখনো থাকত না। অবচেতন মনে হঠাৎ হঠাৎ শুধু ' মাগো' ' মাগো' বলে চিৎকার করতাম। একদিন খুব ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর দেখি আপু আমার মাথার কাছে বসে আছে। আমি আপুর হাত জড়িয়ে ধরে বলি ' আপু, আমাদের মা আর নাই? মাকে আমরা আর কোনোদিন দেখতে পাবোনা?'

আপু আমার হাত দুটো মুখের সাথে চেপে ধরে কাঁদতে থাকে, আমিও কাঁদতে থাকি। সেই দুঃসহ দিনগুলো থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যে মানুষটা আমাদেরকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন তিনি আমার বাবা। তিনি যে ভালোবাসা আমাদেরকে দিয়েছেন তার তুলনায় এই ভূবনের সবকিছু আমার কাছে মূল্যহীন। বিকাল পাঁচটার একটু পরেই বাবা অফিস থেকে ফিরে আসেন। আমি তখন বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে আসি। বাবা আমার পাশে এসে জিজ্ঞেস করেন, 'জ্বর কেমন? ভার্সিটির ক্লাস কবে থেকে শুরু?'

আমি হাসিমুখে বলি ' মোটামুটি সুস্থ এখন। ক্লাস সামনের সপ্তাহে। দুইদিন পরেই চলে যাব।'

বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বলেন 'ভালো করে পড়, অনেক বড় মনের মানুষ হও।'

আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। বাবা ধীরে ধীরে আমার পাশ থেকে ঘরে চলে যায়। আমি চুপ করে বসে আকাশের দিকে তাকাই। আমি অনুভব করি, এই মানুষটার বুকের ভীতর যে মমতাময় ভালোবাসার নদীটা বয়ে গেছে তা পৃথিবীর সবগুলো নদীর চেয়ে গভীর, সবগুলো নদীর চেয়ে শীতল আর প্রশস্ত...।

 

**শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।


মন্তব্য