kalerkantho


বনা, তোমাকে হারিয়ে খুঁজি | বিহঙ্গ চৌধুরী

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২১:৫১



বনা, তোমাকে হারিয়ে খুঁজি | বিহঙ্গ চৌধুরী

মেয়েটি রূপে মাধুরী নয়। গুণে মাধুরী। গড়নে ঐশ্বরিয়া নয়। অন্তরে ঐশ্বরিয়া । তার ‘ভোরের-শিশির’ মুখ, ‘শ্রাবণ-মেঘ’ চুল, ‘কুসুম-কোমল’ ঠোঁট, টোল পরা গাল, বাঁশরী নাক, ‘বাবুইর বাসা’ চোখ, চিকচিক দাঁত, ঝর্ণাধারা হাসি সব ছাপিয়ে ওই ‘ শরৎ আকাশ’ মনটা আমার সমস্ত অনুভূতিকে অবশ করে দিয়েছিল, কল্পনার সমস্ত রং ছিনতাই করেছিল, বেদখল করেছিল ভাবনার সব অলিন্দ-নিলয়। কেড়েছিল দু’চোখের ঘুম দিনের পর দিন, রাতের পর রাত।

হ্যাঁ, বলছি বনার কথা। বনা আমার সহপাঠী। ৫ বছর আমরা এক সঙ্গে পড়েছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপরও মুখ ফুটে কিছু বলা দূরে থাক, খুব বেশি কাছে ঘেঁষার সুযোগও হয়নি। তার কারণ আরেক বান্ধবী, মিনা। মিনা ও বনা ছিল মানিক-জোড়। কোথাও তাদের একা পাওয়া দুষ্কর। টুকটাক লেখালেখির সূত্রে মিনার সাথে আমার দহরম-মহরম। একেবারে তুই-তুকারি সম্বোধন। আর বনার সাথে সর্বসাকুল্যে হাই-হ্যালো। কোথাও দেখামাত্রই বনা বলতো কী খবররর? (‘র’ সবসময় সে একাধিক উচ্চারণ করত। এজন্য তার নামই হয়ে গিয়েছিল, ‘কী খবরর..’)।  উত্তরে আমি বলতাম, ‘এইতো’। ব্যস ওটুকুই।

বাকিটা সময় মিনা আমাকে গ্রাস করে রাখত। অথচ মনে-প্রাণে চাইতাম বনাই আমার সাথে কথা বলুক। কাছে আসুক। ওর ঢেউ খেলানো শ্যাম্পুকরা চুলের সুঘ্রাণ আমাকে পাগল করে দিত। ওর টোল পরা হাসি আমাকে মাতাল করে দিত। অথচ ‘নো চান্স’। বেড়ীবাঁধটি মিনা! বনা-আমি দু’জনে মুখচোরা আর লাজুক। দু’জনের কারও যেচে কথা বলার অভ্যাস নেই। মিনা আবার খুবই মিশুক ও চটপটে। ফলে মনের বাসনা রয়ে যায় মনেই।

অবশেষে এক বৃষ্টিদিনে তা প্রকাশের সুযোগ আসল। সেদিন ছিল আকাশভাঙ্গা বৃষ্টি। ক্লাস শেষ। অথচ সবাই বৃষ্টি বন্দী। নবীন বরণে নিজের লেখা-সুরারোপিত গানের সুবাদে কপালে তখন আমার ‘গায়কের’ তকমা। ওই সময় ঘুরতে ঘুরতে বনা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। দেখি সে একা। আচমকা আমাকে গান শুনানোর আবদার করে বসল। তাকে একা পেয়ে ভেতরের ‘অস্ফুট দগদগে প্রেম’ সুর হয়ে আমার গলায় উঠে আসল। হৃদয়ের সমস্ত আবেগ কণ্ঠে ঢেলে গাইলাম-
‘যে কথাটি মনে, রেখেছি গোপনে; আজ মন শুনাতে চায় ভালোবাসি তোমায়। ভালবাসি তোমায়।.... কবে কোথায়, তোমায় একা পেয়ে বলব যে মনের কথা; সেই আশাতে, দিন গুণেছি সয়েছি নীরব ব্যথা। কাছে পেয়ে এ মন আমার আজ তোমাকে জানাতে চায় ভালোবাসি তোমায়, ভালোবাসি তোমায়।............

গান শেষ হতে দেখি আমার চোখে পানি। ওর চোখেও পানি। কারও মুখে কোনো কথা নেই। ওইদিন বুঝলাম, আমি ধরা পড়া গেছি। তাতে আমার অবস্থা আরও কাহিল হয়ে উঠল। বনা একদিন ক্যাম্পাসে না আসলে পৃথিবীর তাবৎ শূন্যতা আমার বুকে অবস্থান ধর্মঘটে বসত। কিন্তু তারপরও কথাবার্তা আগের মতোই ওই ‘কী খবররর’ পর্যন্ত। আমরা যখন মাস্টার্সে, তখন আমার ছোট বোন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। হলে সিট না পেয়ে ও তখন বনার সিটে উঠল। ডাবলিং।

যোগাযোগটা বাড়ল মূলত তখন। আর তখনি আবিষ্কার করলাম বনার ভেতরের অদ্ভুৎ সারল্য। আর আশ্চর্য সৌন্দর্য। তাতে দূর্বলতা বাড়ল দ্বিগুণ। অথচ মুখেরা নেই যথারীতি । উদ্ধারহীন লাজে তালাবদ্ধ সব অনুভূতি। ক্যাম্পাসের শেষ দিনটি, এখনো চোখে জ্বলজ্বলে। সারাদিন বনা, মিনা ও আমি চবির পাহাড়-পর্বত চষে বেড়ালাম। ছবি তুললাম। একসাথে খেলাম। সেই শেষ দেখা। রাতে বনা চলে গেল তাদের জামালপুর। আমি রয়ে গেলাম চট্টগ্রাম।
আমার তখন মোবাইল ছিল না। তাছাড়া ক্যারিয়ারের ভ‚ত তখন এমনভাবে আমার ঘাড়ে চেপে বসল, বনাকে প্রায় ভুলে গেলাম। কিন্তু বনা ভুলে নি। ভাইয়ের ফোনে যোগাযোগ রাখত। দেখা করার কথা বলত। বিপরীতে আমি অনুভ‚তিহীন। পায়ের তলায় মাটি জোগাড়ে আমি এতটা মরিয়া, হৃদয়ের বনা চ্যাপ্টারটা অনেকটা ক্লোজ করে দিলাম। সেই মাটি এখন জোগাড় হয়েছে। কিন্তু হারিয়ে গেছে বনা।

হারানো অনুভূতিগুলোও ফিরে এসেছে। কিন্তু বনা ফিরছে না। আর ফিরবেও না কোনোদিন অভিমানী বনা ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে অন্যমনে। শ্যাম্পু করা চুল দেখলেই নাসারন্ধ্র আমার এখনো আকুল হয়ে যায়, যদি ওই ঘ্রাণ পায়। টোল-পরা কোনো মেয়েকে হাসতে দেখলেই চোখ স্থির হয়ে যায়, যদি ওই টোল-পরা গালের দেখা পাই। একজন বনাকেই খুঁজছে আমার সমস্ত অস্তিত্ব। প্রতিদিন। প্রতি মুহুর্তে...........

শুধু নির্বাচিত গল্পগুলো ধারবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচিত গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা ৫ জনকে বেছে নেওয়া হবে।



মন্তব্য