kalerkantho

নারী দিবস

আরিফার 'বাতিঘর'

অমিতাভ অপু, দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা)   

৭ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৩৪



আরিফার 'বাতিঘর'

স্কুলে পড়াকালে শখের বশে সহপাঠীদের সঙ্গে বুননের কাজ শুরু করেন ঢাকার দোহার উপজেলার নারিশা এলাকার আরিফা আক্তার রানু। দিন দিন তাঁর আস্থা বাড়তে থাকে এ কাজের প্রতি। রানু স্বপ্ন দেখেন কীভাবে এ ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসার ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দারিদ্র্যমুক্ত নারীসমাজ গঠন করা যায়। এ লক্ষ্যে নিজের  মেধাশক্তিকে কাজে লাগাতে থাকেন।  

কিন্তু দুর্ভাগ্য! স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। কিন্তু তাতে কী, থেমে থাকেনি লালিত স্বপ্ন। এ কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি তাকে উদ্বুদ্ধ করেন তাঁর স্বামী আব্দুর জব্বার বেপারী।  

২০১৩ সালে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার থেকে পাটের বহুমুখী ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন করে উদ্যোগী হন আরিফা। পরে নিজ উদ্যোগে এ শিল্পের বিকাশের জন্য উপজেলার নদী ভাঙনকবলিত এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১৫০ জন নারীকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেন।  

বর্তমানে প্রশিক্ষিত ওই নারীরা প্রত্যেকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে, প্রশিক্ষিত নারীদের কাজে লাগিয়ে নিজ বাড়ির নিচতলায় পাট ও পুঁথিতে তৈরি নান্দনিক পণ্যের একটি শোরুম চালু করেন।

এটিই হচ্ছে আরিফার 'বাতিঘর'।  

দক্ষ ও নিপূণ হাতে তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। অর্ডার আসতে থাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে। চাহিদার যোগান দেন আরিফা। বর্তমানে এগুলো তৈরির মাধ্যমে দিন পার করছেন তিনি। স্বচ্ছল জীবনযাপন করছেন তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা।  

বাণিজ্যিকভাবে পাটের বহুমুখী ব্যবহারে ব্যাপক ভিত্তিতে উৎপাদন শুরু  করেছেন আরিফা। বাড়িতে বসেই তিনি তৈরি করছেন পাট ও পুঁথির তৈরি বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ, ওয়াল ম্যাট, পাপোশ, ফুলদানিসহ ঘর সাজানোর বিভিন্ন উপকরণ। দক্ষ হাতকে কাজে লাগিয়ে পাট ও পুঁথির তৈরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র তৈরি করে তা বাজারজাত করার  মাধ্যমে অল্প দিনেই সফলতার মুখ দেখেন। তাঁর এ সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।  

নারী  উদ্যোক্তা হিসেবে স্বীকৃতিস্বরুপ প্রথম ২০১৩ সালে দোহার  উপজেলার সেরা জয়িতার পুরস্কার পান। পরের বছর স্বীকৃতি পান ঢাকা জেলার জয়িতা হিসেবে। সবশেষ গত বছর মহিলা ও শিশু  বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তিনি একাধারে ঢাকা বিভাগীয়, ঢাকা জেলা এবং দোহার উপজেলার শ্রেষ্ঠ জয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন।  

স্বীকৃতি পাওয়ার পর নতুন করে এ কাজের প্রতি উদ্যমী হয়ে কাজ করছেন এই নারী। পাটের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সহজে বাজারজাত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। আরিফা বলেন, "নারীরা আজও সমাজে অবহেলিত। কোনওকিছু করতে গেলেই বিভিন্ন মহল থেকে বাধা আসে। " 

তিনি বলেন, "ক্ষুদ্র শিল্পের মাধ্যমে আমাদের যে কোনও নারী ঘরে বসেই কাজ করে স্বাবলম্বী হতে পারে। এতে লজ্জার কিছু নেই। " সরকারের কাছে তাঁর দাবি, যেসব নারী উদ্যোক্তা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে সরকারিভাবে সহায়তা প্রদান করলে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখতে পারে এ শিল্প। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাটপণ্যের অর্ডারগুলো নারী উদ্যোক্তাদের দিলে এ শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটবে বলে মনে করেন তিনি।  

দোহার উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম আরা নিপা সম্প্রতি গিয়েছিলেন আরিফার বাড়িতে। তাঁর এ উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতার পাশাপাশি প্রেরণা ছিল এই নারী কর্মকর্তার। এ প্রসঙ্গে নিপা বলেন, "জয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আরিফার শিল্পকর্ম দেখতে আমি গিয়েছিলাম। কেবল নিজের অদম্য ইচ্ছাকে সম্বল আর চরম প্রতিকূলতাকে জয় করে আরিফা তৃণমূল থেকে সবার অলক্ষ্যে  সমাজে নিজের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন। জয়িতারা বাংলাদেশের বাতিঘর। জয়িতাদের দেখে অন্য নারীরা অনুপ্রাণিত হলে ঘরে ঘরে জয়িতা সৃষ্টি হবে, বাংলাদেশ পৌঁছাবে এর গন্তব্যে। "


মন্তব্য