kalerkantho

নারী দিবস

জাগোনারী এবং একজন হোসনে আরা

সোহেল হাফিজ, বরগুনা    

৭ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৫৩



জাগোনারী এবং একজন হোসনে আরা

বরিশাল পুলিশ লাইনের ইন সার্ভিস ট্রেইনিং সেন্টারে তখন সভা চলছে। সভার একপর্যায়ে বক্তব্য দিতে উঠলেন উপকূলীয় জেলা বরগুনা থেকে আসা অখ্যাত এক নারী সংগঠক।

নাম হোসনে আরা হাসি।  

'আজকের সভায় প্রধান অতিথি বাংলাদেশ পুলিশ, বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান; উপস্থিত অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপারসহ বরিশাল শহরের ঊর্ধ্বতন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা,' এভাবেই শুরু করলেন তিনি।  

হলভর্তি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের অর্ধশত বিদগ্ধ গুণীজনের মাঝে হাসি বলে চলেন, 'দিন বদলের পাশাপাশি এখন বদলে যাচ্ছে নারী নির্যাতনের ধরনও। ' তিনি বলেন, 'ডিজিটাল বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় প্রযুক্তির অপব্যবহারের চিত্রও কম নয়। নারী নির্যাতন কিংবা নারীর প্রতি হিংস্রতায় এখন ব্যবহার হচ্ছে প্রযুক্তি। শুরুতেই এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে তা যে কোনও সময় ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে রাষ্ট্রের। ' 

উপস্থিত সবার মনোযোগ বাড়তে থাকে হাসির বক্তব্যের সাবলীল উপস্থাপনায়। তিনি বলেন, 'নারীর একান্ত ঘনিষ্ঠ ছবি, ব্যক্তিগত ছবি, আপত্তিকর ছবিকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার করে ব্লাকমেইলিং করে যাচ্ছে এক শ্রেণির হীনমনা মানুষ।

প্রযুক্তিগত অসচেতনতার কারণে এসব চক্রের শিকার হয়ে যৌন  হয়রানি, ধর্ষণ এমন কি চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন শত শত নারী। ভাঙছে সংসার। বাড়ছে আত্মহনন। '
 
অচেনা অখ্যাত এক নারীর এমন তথ্যে নড়ে চড়ে বসেন অতিথিরা। হাসি বলে চলেন, 'সাইবার ক্রাইম বাংলাদেশের জন্যে নতুন ধারার একটি অপরাধ। শুধু নারীই নয়। এ অপরাধের শিকার হচ্ছে নারী-পুরুষ সবাই। ' তিনি বলেন, 'সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়ে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গও। সর্বস্ব হারাচ্ছে বহু প্রতিষ্ঠান। অনেক ক্ষেত্রে এ অপরাধের মাশুল দিতে হচ্ছে খোদ সরকারকেও। ডিজিটাল বিপ্লবের পাশাপাশি প্রযুক্তির এসব অপব্যবহারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা। ' এ সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। ' 
  
হোসনে আরা হাসি জানান, তাঁর গড়া ক্ষুদ্র সংগঠন জাগোনারীর উদ্যোগে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার বিভিন্ন স্কুল কলেজসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মাঝে সাইবার ক্রাইম বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির অধীনে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্যে জাগোনারী মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সাইবার ক্রাইম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখায় কানাডিয়ান হাই কমিশনের সহযোগিতায় বরিশাল বিভাগের তিনজন গণমাধ্যমকর্মীকে জাগোনারী মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়ন সংগঠন জাগোনারীর এসব কর্মসূচির সঙ্গে একাত্ম হয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান হাসি।  

বরিশাল পুলিশ লাইনের ইনসার্ভিস টেনিং সেন্টারে হোসনে আরা হাসির এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে একে একে নিজ নিজ মতামত দেন উপস্থিত অতিথিরা। প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ পুলিশ, বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান জাগোনারী ও হোসনে আরা হাসির এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলেন, 'জাগোনারীর এ উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের সকল পুলিশ সদস্য একযোগে কাজ করবে। ' জাগোনারীর এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে সম্ভব সব ধরনের সহযোগিতারও আশ্বাস দেন তিনি।   

বাল্যবিয়ে, যৌতুক কিংবা যৌন হয়রানি এক কথায় যেখানেই নারীর প্রতি সহিংসতা সেখানেই উন্নয়ন সংগঠন জাগোনারীর প্রধান নির্বাহী হোসনে আরা হাসির উপস্থিতি। নারী অধিকার আদায়ে উপকূলীয় জেলা বরগুনা ও এর আশপাশের জনপদে একজন হোসনে আরা হাসির প্রচেষ্টা এখন স্থানীয়ভাবে সর্বজন স্বীকৃত।

সংসার জীবনের বাধ্যবাধকতা, সামাজিক বঞ্চনা, দারিদ্রের টানাপোড়েন ইত্যাদি নানা প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে একজন হোসনে আরা হাসি নারী অধিকার আদায়ের দাবি  নিয়ে বরগুনায় কাজ করে যাচ্ছেন দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ব্যক্তিজীবনেও হোসনে আরা হাসি প্রমাণ করেছেন পরিশ্রম, অধ্যাবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের ডানায় ভর করে যেকোনও নারীই দারিদ্র্যের অর্গল ছিড়ে বেরিয়ে আসতে পারে। পৌঁছাতে পারে কাঙ্খিত লক্ষ্যেও।  

নারী অধিকার আদায়ের আন্দোলন নিয়ে হোসনে আরা হাসি বরগুনায় কাজ শুরু  করেন ১৯৯৮ সালের শুরুর দিকে। স্থানীয় নারীদের সংগঠিত করে নারী অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে তিনি গঠন করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন। যার নামকরণ করা হয় জাগোনারী। শুরু থেকেই স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে উন্নয়ন সংগঠন জাগোনারী নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে বরগুনা জেলার বিভিন্ন শহর থেকে শহরতলীতে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে। শুধু নারী অধিকার নয় বরগুনার আর্থ সামাজিক উন্নয়নে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি ও তাঁর উন্নয়ন সংগঠন জাগোনারী।

একাকী একজন নারী ক্ষুদ্র পরিসরে সেদিন যে সংগঠনটি শুরু করেছিলেন, সেই জাগোনারী আজ বরগুনার অন্যতম প্রধান একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন হিসেবে স্বীকৃত। সমাজের পিছিয়ে থাকা নারীর প্রতি তাঁর নাড়ির টান, দেশের জন্য তাঁর মমত্ববোধ আর তাঁর দক্ষ নেতৃত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে দেশি বিদেশি বিভিন্ন দাতা সংস্থা আজ হোসনে আরা হাসি ও তাঁর উন্নয়ন সংগঠন জাগোনারীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।  

ইউনিসেফ, ডিএফআইডি, অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল, একশন এইড, আগাখান ফাউন্ডেশন এবং ঢাকা আহসানিয়া মিশনসহ দেশি বিদেশি বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহায়তায় উন্নয়ন সংগঠন জাগোনারী বরগুনার বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে উন্নয়ন সংগঠন জাগোনারীতে এখন সরাসরি কাজ করছেন ১১৭ জনেরও বেশি মাঠকর্মী ও কর্মকর্তা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জাগোনারীর উপকারভোগীর সংখ্যা সাত হাজারেরও বেশি।  

বরগুনার নারী নেতৃত্ব হোসনে আরা হাসির জন্ম ১৯৬৪ সালে বরগুনা সদর উপজেলার ১০ নম্বর নলটোনা ইউনিয়নের শিয়ালিয়া গ্রামে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাও তাঁর এই গ্রামে। ব্যক্তি জীবনে তিনিও হয়েছিলেন বাল্যবিয়ের শিকার। বরগুনার তৎকালীন স্বনামধন্য একজন আইনজীবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়ে অপ্রাপ্ত বয়সে। বাল্যবিয়ের নির্মম পরিণতি হিসেবে একসময় বিবাহ বিচ্ছেদেরও শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। জীবনের সিংহভাগ সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে একাকী ও অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে। সেই একাকীত্ব আর অসহায়ত্বকে জয় করেছেন তিনি। সমাজে বঞ্চিত অসহায় নারীদের মাঝে হাসির উৎস হয়েই থাকতে চান জীবনভর।
 


মন্তব্য